ধর্ষণ : কে বা কী দায়ী? ভিকটিম? ভিকটিমের পোশাক? নাকি লুকিয়ে থাকা ‘সাপ’? নাকি একেবারেই অন্য কিছু? - ২য় অংশ

মঙ্গলবার, এপ্রিল ৩, ২০১৮ ২:৫০ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


(পূর্ব প্রকাশের পর)

ধর্ষকের মনস্তত্ব

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা দেখেছেন যে, ধর্ষণ প্রতিরোধে কেবল অপরাধ-বিচার ব্যবস্থা (criminal conviction system)-এর ওপর নির্ভরশীলতা, মানে অপরাধীকে কারাগারে প্রেরণ, যথেষ্ট নয়। সাথে প্রয়োজন রয়েছে অপরাধীর মনস্তত্বকে বোঝা ও সে-অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। যুক্তরাষ্ট্রের সাইকোলোজি অব ভায়োলেন্স সাময়িকীর সম্পাদক প্রফেসর শেরি হ্যামবি (Sherry Hamby) এ ব্যাপারে বলেন, “তুমি যদি অপরাধীকে না বুঝতে পার, তবে যৌন হিংস্রতাকে কখনোই বুঝতে পারবে না।“৪

এটা আয়রনিক যে সম্মতিসূচক যৌনাচরণ বিষয়ে প্রচুর গবেষণা হলেও ধর্ষণের মতো একটি জঘন্য অপরাধ নিয়ে মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা খুবই কম। অপরাধীর মনস্তত্ব বোঝার চেয়ে ধর্ষণকে প্রায়শই পরিস্থিতি-ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে নিস্পত্তি করা হয়। ফলে এটি একদিকে যেমন মানসিক চিকিৎসকের নজর কাড়েনি, তেমনি মানসিক চিকিৎসকগণও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা কোনটাই অর্জন করেননি।সৌভাগ্যক্রমে সম্প্রতি উন্নত বিশ্বে এ বিষয়ে কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ২০টি বিভিন্ন কর্মসূচী চালু আছে, যেগুলোতে অপরাধীর মনস্তত্ব নিয়ে গবেষণা করা হয় ও তাদের মানসিক পূনর্বাসন দেয়া হয়। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সেখানে পরীক্ষা করে দেখেন যে, অপরাধী মুক্তি পেয়ে ফিরে গেলে সে তার সমাজের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, অর্থাৎ তার দ্বারা একই অপরাধ পূনরায় সংঘঠিত করার সম্ভাবনা কতটুকু।অনেকে ধর্ষককে অতিকামী (oversexed) মনে করেন, যা কেবল অতিসরলীকরণই নয়, অসঠিকও। ধর্ষণের কেস স্টাডি থেকে দেখা গেছে, সত্যিকারার্থে ধর্ষকের খুব মারাত্মক রকমের মানসিক সমস্যা রয়েছে যার কারণে সে নারীকে সহজ-দৃষ্টিতে দেখতে পারে না। তাদের অনেকেই অন্য মানুষদের সাথে ভালবাসা, বিশ্বাস, সহানুভূতি বা সমবেদনা পাওয়ার মতো কোন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। যদি কোন সম্পর্ক থাকেও, সে সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদান বা আন্তরিক ভাগাভাগি (genuine sense of sharing) থাকে না। এক কথায়, প্রতিটা অপরাধীই এক প্রকার মানসিক অস্বাভাবিকতার (mental dysfunction) মধ্য দিয়ে যায়, যা কখনও সাময়িক, কখনও দীর্ঘস্থায়ী এবং পূনরাবৃত্তিমূলক।

যদিও ধর্ষক তার মানসিক বিশৃঙ্খলার (psychiatric disorder) বিভিন্ন স্তরে অপরাধ সংঘটিত করে থাকে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে উন্মাদ (insane) নয়। উন্মাদেরা অন্যায় কাজ করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকে না, কিন্তু ধর্ষকেরা সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। অনেকক্ষেত্রেই কে তার শিকার হবে, সেটি সে নির্দিষ্ট করে নেয় এবং অপরাধটি (ধর্ষণ) করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। সে এটা ভেবে দেখে না যে, সে যা করতে যাচ্ছে তার ফল কী হবে। অপরাধ পরবর্তী শাস্তি, তার নিজ পরিবারের অসম্মান, ভিকটিমের শারীরিক আঘাত, ইত্যাদি কিছুই তার মাথায় থাকে না। Men Who Rape: The Psychology of the Offender বইয়ের একটি সাক্ষাৎকারে একজন অপরাধীর বক্তব্য এমনঃ “আমার মনে হয়েছিল আমাকে বাইরে যেতেই হবে এবং এটা করতেই হবে। আমি বুঝতে পারছিলাম যে একদিন না একদিন আমি ধরা পড়বোই। আমি এটাও বুঝতে পারছিলাম যে, এর ফলে আমার বিয়ে, আমার চাকুরি, আমার স্বাধীনতা, সবকিছু নষ্ট হবে। তবুও আমাকে বেরুতেই হলো, যেন এক অদম্য শক্তি আমাকে নিয়ন্ত্রন করছিল তখন।“৫

এতোক্ষণ আমি যে গবেষণাগুলোর উল্লেখ করলাম সেগুলোর প্রায় সবই করা হয়েছিলো বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়া অপরাধীদের ওপরে। সম্প্রতি ধর্ষণ করেও পার পেয়ে যাওয়া ‘স্পেশালিস্টদের’ ওপরে গবেষণা করেন ওয়েন (Wayne) স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক মনোবিজ্ঞানী Antonia Abbey। তিনি দেখেছেন, যারা ধর্ষণ করে, তারা প্রথম যৌবন থেকেই দু’একটা যৌন অপরাধ (sexual assault) করতে শুরু করে, বিশেষ করে হাইস্কুল (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কলেজ) অথবা কলেজের (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়) প্রথম দুই-এক বছরের মধ্যে, এবং তারা এটা শুরু করে পরিচিত কারো সাথে কিছুটা সীমা অতিক্রম (line crossing)-এর মাধ্যমে। এদের মধ্যে কিছুসংখ্যক একটা দু’টো অপরাধ করেই থেমে যায়। কিন্তু বাকিদের (কত শতাংশ তা জানা নেই) আচরণে হয় কোন পরিবর্তন ঘটে না, অথবা অপরাধ করার হার বেড়ে যায়।

উপরোক্ত গবেষণায় Antonia Abbey একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যবেক্ষণ করেছেন, যে সকল পুরুষ প্রথমবার যৌন অপরাধ করার পরে অনুতপ্ত হয়েছে, তারা এটা বন্ধ করে দিতে পেরেছে। কিন্তু যারা উল্টো ভিকটিমকে দোষারোপ করেছে, তারা বন্ধ করতে পারেনি। পূনরায় অপরাধ করা এরকম একজনের উক্তি: “আমার মনে হয়েছে আমাকে যৌন উত্তেজিত করার শোধ তুলছি।“

Antonia Abbey-এর গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফল বাংলাদেশে ধর্ষণ বৃদ্ধির কারণটাকে খুব স্পষ্ট করে তোলে। যারা ধর্ষণের দায় ভিকটিমের ওপর চাপাচ্ছে, তারা খুব সহজেই, কোন রকম অনুতাপ বা ভিকটিমের প্রতি সহানুভূতি ব্যতীত, ধর্ষণ করতে পারে। যেহেতু আমাদের সমাজে ভিকটিমের ওপর দোষ-চাপানো মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তাই ধর্ষকও বাড়ছে। এ ব্যাপারে আগেই বলেছি, এ ধরণের দোষারোপকারী প্রত্যেকেই একেকজন সম্ভাব্য ধর্ষক।ধর্ষণ প্রতিরোধ সম্পর্কিত ভুল ধারণা ও করণীয়

যেহেতু ধর্ষণ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা যৌনতার সাথে সম্পর্কিত, এর প্রতিরোধে যে সকল ব্যবস্থা সুপারিশ করা হয় তার বেশিরভাগই যৌনতাকে ঘিরে। অনেকে পতিতালয় বাড়ানোর কথা বলেন। বেশিরভাগ দেশেই পতিতালয় আছে, কিন্তু এটা কোন সমাধান দিচ্ছে না, কারণ আক্রমণকারী যৌন সন্তুষ্টির জন্য ধর্ষণ করছে না। অনেকসময় পতিতারাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন।

ধর্ষণের সাথে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতাকেও দায়ী করা হয়। ধর্ষণের পিছনে রয়েছে ক্রোধ ও প্রতিহিংসা। পর্নোগ্রাফি যৌন উত্তেজক হতে পারে, কিন্তু নিশ্চয়ই তা ক্রোধ উত্তেজক নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্ষকরা স্বাভাবিক পুরুষদের চেয়ে কম পর্নোগ্রাফি দেখে থাকে। (অবশ্য পর্নোগ্রাফিকেও উৎসাহ দেয়া উচিত না। সাংস্কৃতিক দৃষ্টিতে পর্নোগ্রাফি কেবল নারীর জন্য অপমানজনকই নয়, এটা পুরুষের সেক্সিস্ট দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রমাণ।)ধর্ষণ সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলো ধর্ষণের দায়কে ধর্ষক থেকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। ধর্ষকও আসলে তাই চায়। সে নিজের দোষকে ঢাকতে মদ, মাদক, পোশাক, পর্নোগ্রাফি এবং ভিকটিমের আচরণের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়। সে স্বীকার করতে চায় না যে তার নিজের খুব বড় ধরণের মানসিক সমস্যা আছে।

ধর্ষণের প্রতিকার হিসেবে ধর্ষকের কারাবাসও কোন ভাল ফল দিচ্ছে না। কারাবাসের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে। ধর্ষণের সাথে হত্যা জড়িত না থাকলে অপরাধীকে সাধারণত আজীবন কারাবাস দেয়া হয় না। আর আজীবন কারাবাস হলেও তারা যে আমৃত্যু কারাগারে থাকে, এমন না; একটা নির্দিষ্ট মেয়াদের পরে আবেদনের মাধ্যমে সাজা মওকুফ পেয়ে বেরিয়ে আসে। বাংলাদেশের কারাগারগুলো কোন সংশোধনাগার নয়, বরং ওখানেই অপরাধীরা নতুন নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাই কারাগার থেকে বের হয়ে তারা যে আবার এ ধরণের অপরাধ করবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই।

আমেরিকার কিছু প্রদেশে এ ধরণের অপরাধীদের কারামুক্তির পরেও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কনসালটেশন দেয়া হয়, যেখানে তারা যতদিন ইচ্ছে পরামর্শ নিতে পারে। এই প্রোগ্রামগুলোতে যদি কোন অপরাধীকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করা হয়, তবে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং যতদিন পর্যন্ত সে সমাজের জন্য নিরাপদ বিবেচিত না হচ্ছে, ততদিন ওখানে রাখা হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের দেশে তেমন কোন ব্যবস্থাই নেই। বেশিরভাগ অপরাধী সাজাই পায় না, আর যারা পায় তারাও আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসে এবং পরবর্তীতে আবার এ ধরণের অপরাধ করে।

ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রথম ও প্রধান কাজ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত ভিকটিম দোষারোপ ও ভিকটিম শেমিং বন্ধ করা। আমাদের দেশে ধর্ষনসহ অন্যান্য যৌন অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বিচারহীনতা। জাতিসংঘের Multi-country Study on Men and Violence এর ২০১৩ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যন অনুযায়ী বাংলাদেশে ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধের ৯৫.১ শতাংশেরই কোন বিচার হয় না। বিচারহীনতার প্রধাণ কারণ অপরাধ প্রকাশ্যে না আসা। আর অপরাধ অপ্রকাশ্য থাকার প্রথম কারণ যে ভিকটিম দোষারোপ ও ভিকটিম শেমিং তা বলার অপেক্ষা রাখে না।ভিকটিম দোষারোপ ও ভিকটিম শেমিং বন্ধ করতে এ জাতীয় প্রচার বন্ধ করতে হবে। মোশাররফ করিমের অনুষ্ঠানটির পরপরই আমরা অনলাইনে আরেকটি ভিডিও দেখতে পাচ্ছি, যেখানে এক ইসলামী বক্তা ওয়াজ মাহফিলে মোশাররফ করিমের উল্লেখিত সাত বছরের শিশু ধর্ষণের সাফাই গাইছে এই বলে যে, ঐ ধর্ষক অন্য নারীদের দেখে যৌন উত্তেজিত হয়ে তা দমন করতে না পেরে শিশু ধর্ষণ করেছে। এ ধরণের ইসলামী বক্তা একজন দু’জন নয়, হাজার হাজার। আর তাদের কথা তাদের অনুসারীরা অক্ষরে অক্ষরে মানে। আইন করে হলেও এ ধরণের অপপ্রচার থামাতে হবে। এ ধরণের অডিও, ভিডিও, লেখালেখি নিষিদ্ধ করতে হবে এবং অনলাইন ও অফলাইন থেকে তা সরিয়ে ফেলতে হবে। ইউটিউব ও অন্যান্য সাইটের সাথে যোগাযোগ করে যাতে এ জাতীয় প্রচারের ভিডিওগুলো বাংলাদেশে প্রদর্শন না হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। টেলিভিশনে এ ধরণের কোন বক্তব্য প্রচার আইন করে বন্ধ করতে হবে। আমরা এর আগে দেখেছি জঙ্গিবাদের প্রচারক হিসেবে জাকির নায়েকের প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। ধর্ষণের প্রচারও জঙ্গিবাদের মতো শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে।

বিশ্বের অনেক দেশেই ‘যৌনাচরণে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি আইন (Sexually Dangerous Persons Act)’ নামে একটি আইন আছে। যারা কোন যৌন অপরাধে একবার দণ্ডিত হয়েছে, তাদেরকে এই আইনের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে নজরদারিতে রাখা হয়। প্রয়োজনে যারা অনলাইন ও অফলাইনে ভিকটিম দোষারোপ ও ভিকটিম শেমিং-এর অপপ্রচার চালায়, তাদেরকেও এই আইনে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ধর্ষক ও ধর্ষণে প্ররোচনা দেয়া ব্যক্তিদের আইনি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।ধর্ষণ কমাতে সবচেয়ে বেশি জরুরী ভিকটিমদের এগিয়ে আসা। কিন্তু তারা এমনি এমনি আসবেন না, কারণ তাঁদের শেমিং-এর ভয় আছে। তাঁদেরকে বুঝাতে হবে যে, অপরাধ তাঁরা করেননি, অপরাধ করেছে ধর্ষক, এবং অপরাধীকে শাস্তি দিতে হলে তাঁদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। পারিবারিক যৌন নিগ্রহের ব্যাপারে মুখ খুললে অনেক ভিকটিমের পরিবার-ত্যাগ প্রয়োজন হতে পারে। সেক্ষেত্রে তাঁদের পূনর্বাসনের জন্য সরকার ও এনজিওদের এগিয়ে আসতে হবে।

এমনিতেই বেশিরভাগ যৌন অপরাধ অপ্রকাশিত থেকে যায়, তার ওপর আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া ও বিচারে বিলম্ব এই অপরাধকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। বাংলাদেশে যৌন অপরাধ বিষয়ক আইনে কোন ঘাটতি নেই, কিন্তু অন্য অনেক আইনের মতো এরও নেই সঠিক প্রয়োগ। আইনানুযায়ী ধর্ষণের বিচার হয় দ্রুত বিচার আইনে, যাতে মামলা হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে মামলাটি নিস্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মামলাগুলো বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে, আর অপরাধীরা বিভিন্ন অজুহাতে আইনের ফাঁক গলে জামিনে বেরিয়ে আসে। প্রথম আলো পত্রিকার ২০১৭ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের আওতায় ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, রংপুর ও ফরিদপুর জেলায় যে ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) চালু করা হয়েছে, ষোল বছরে তার অনিস্পত্ত মামলার সংখ্যা ৩,৩১২টি, যা ঐ সময়ের মোট মামলা সংখ্যার ৭৩%। আরো ভয়াবহ পরিসংখ্যন হলো নিস্পত্তি হওয়া ১,২২৯টি মামলার মধ্যে মাত্র ৬০টিতে অপরাধীদের শাস্তি হয়েছে।৬

সারা বাংলাদেশের চিত্র আরো ভয়াবহ। বিচারহীনতার পাশাপাশি রয়েছে পুলিশি হয়রানী, সময়মতো ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট না পাওয়া, ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের ‘টু-ফিঙ্গারস টেস্ট’-এর লাঞ্চনা, আলামত সংরক্ষণ ও সাক্ষ্যের অভাব, ইত্যাদি। ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে থানায় আসা ভিকটিমের অভিযোগ নেয়ার জন্য একজন নারী পুলিশের থাকার কথা থাকলেও সবসময় তা থাকে না। পুরুষ পুলিশরা অভিযোগ নিতে গিয়ে বিভিন্ন অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য করেন। ‘টু-ফিঙ্গারস টেস্ট’ নামক পরীক্ষাটি করা হয় ভিকটিম যৌনকার্যে অভ্যস্ত কিনা তা জানার জন্যে। ভিকটিম যৌনকার্যে অভ্যস্ত কী অনভ্যস্ত তার সাথে ধর্ষণের যোগসূত্র খোঁজা যদি কোন রাষ্ট্রীয় আইন হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের আইন-প্রণেতাদের মানসিক চিকিৎসা নেয়া জরুরী।

ধর্ষণের মামলার বিচারে আলামত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বাংলাদেশে একটি ন্যাশনাল হেল্পলাইন আছে। ১০৯ ডায়াল করে যে কেউ এ ব্যাপারে সাহায্য চাইতে পারেন। অপরাধ ঘটার পর ভিকটিম বা অন্য কেউ যদি ১০৯-এ ডায়াল করে, তবে আলামত নষ্ট হয়ে যাবার পূর্বেই পুলিশ তা সংগ্রহ করতে পারে। বর্তমানে জরুরী হেল্পলাইন ৯৯৯ ডায়াল করেও সাহায্য নেয়া যায়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ এই সেবাগুলোর খবরই রাখেন না। এছাড়া আরো যেসব সামাজিক সমস্যা রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধর্ষক বা ধর্ষকের পরিবার তুলনামূলক প্রভাবশালী হলে ভিকটিম বা ভিকটিমের পরিবারকে হুমকি ও ভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করা, সাক্ষীকে মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা এবং প্রভাব খাটিয়ে বা ঘুষ খাইয়ে পুলিশের তদন্তকে প্রভাবিত করা, ডাক্তারি রিপোর্টে পরিবর্তন আনা, আলামত নষ্ট করে ফেলা, ইত্যাদি।

পরিশেষঃ

ধর্ষণ একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যধি। এটাকে দূর করতে হলে এ সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোকে দূর করতে হবে। প্রচলিত ধারণাগুলো খুব সরল, কিন্তু ধর্ষণ কোন সরল অপরাধ নয়। একটি বহুমাত্রিক ও সমন্বিত প্রতিরোধ ও প্রতিকার ব্যবস্থাই আমাদেরকে এ ব্যধি থেকে উপশম দিতে পারে। ধর্ষণ এমন একটি সমস্যা যার সমাধান করতে ব্যক্তিক, সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, আইনগত এবং রাজনৈতিক পর্যায়ে কাজ করে যেতে হবে।


  • ৩৯৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সন্ন্যাসী রতন

সন্যাসী রতন নামে পরিচিত বাংলাদেশী ব্লগার আইকর্নের একজন অতিথি লেখক হিসেবে নরওয়েতে আছেন।

ফেসবুকে আমরা