সারথি বিশ্বাস

প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক, পশ্চিম বঙ্গ।

ফুল ফুটুক আর না ফুটুক - বিয়ে

আমার জন্মক্ষণ কোনো খুশি বয়ে আনেনি পরিবারে। না, কানা-খোঁড়া হইনি, তবুও মেয়ে তো! আমার সমাজে পুত্রসন্তানের জন্য লোকে কড়া কড়া মানত করে। মানে দেব-দেবীদের লোভ দেখায়! আমাকে একটি পুত্রসন্তান দাও, আমি তোমাকে জোড়া পাঁঠা দেবো, জোড়া মায়ের পুজো দেবো, কপালের টিপ দেবো, নাকের নথ দেবো, বাংলাদেশের ইলিশ দেবো, নলেন গুড় দেবো, অমুক দেবো, তমুক দেবো......। ডি. আই. অফিসের ক্লার্কদের মতো এইসব খুচখাচ ঘুষে নাকি দেব-দেবীরাও কাজ করে দেয় চটপট, প্রত্যক্ষদর্শীদের অন্তত তেমনই দাবি। আমার মা-ও নিশ্চয়ই কিছু দিতে চেয়েছিলো, কিন্তু সে গরিব মানুষ, ঘুষটা হয়তো দেব অথবা দেবীর পছন্দ হয়নি, তাই কাজ করেনি।

যাই হোক, আমার মা এবং আমার মায়ের মতো আরও অনেক মা, বাবা, আত্মীয়-পরিজন যে পুত্রসন্তানের জন্য মাথা কুটে মরেন, এই ভালোবাসার পিছনে কিন্তু একটা অন্যতর স্বার্থচিন্তা কাজ করে। শেষ ঠিকানার চিন্তা। বুড়ো বয়সে দেখভালের চিন্তা। উপার্জনক্ষমতা হারানোর পর আশ্রয়ের চিন্তা, যার থেকে মুক্তি নাকি একমাত্র পুত্রসন্তানই দিতে পারে !

তাহলে যাঁরা আমার মায়ের মতো গরিব না, যাঁদের আশ্রয়ের দুশ্চিন্তা নেই, তাঁরা কি পুত্রসন্তান কামনা করেন না? করেন, তারাও করেন এবং সমপরিমাণেই করেন। কোনো প্রথা সমাজে দীর্ঘদিন চালু থাকলে একসময় সেটা সামাজিক নিয়মে পরিণত হয়। পুত্রসন্তান কামনা করাই আমাদের সমাজের নিয়ম। আমার মায়ের পুত্রসন্তান হয়নি। হলে কোন্ স্বর্গসুখ মা পেতো জানি না, কিন্তু আমি না জন্মালে আমার মা-বাবার কী হতো! তা ভেবেই আতঙ্ক লাগে আমার।

আমাদের ধারণা, মেয়েরা বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে পারে না। বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পারেও না। জন্মমাত্র যাকে সবাই বোঝা ভাবে, যাকে জীবনের বাকি পথেও একটু একটু করে বুঝিয়ে দেওয়া হবে, তুমি বোঝাই মাত্র! সে কী করে সন্তানের দায়িত্ব পালনে খাড়া হবে? সেই ভিত কি সমাজ তার পায়ের নিচে দেয়? সমাজ কি তাকে ঠিকমতো বড়ই হতে দেয়! কাগজ খুললেই নাবালিকা বিবাহের খরব পাওয়া যায় প্রতিদিন। প্রশাসনিক তৎপরতা কোনো কাজে আসে না। বাড়ির মেয়েটি যে কোনো দিন, যে কোনো ধরনের অপরাধের শিকার হতে পারে, এই উদ্বেগ নিয়েই প্রতিটা দিন কাটায় তার পরিবার। স্কুল থেকে টিউশন, সবসময় একজন বিশ্বস্ত অভিভাবকের কড়া পাহারায় যেতে হয় একটা মেয়েকে। মেয়েকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব এতো কঠিন মনে হয় যে, অনেকেই এই দায়িত্ব এড়াতে চান। নাবালিকা বিয়ের এটাও একটা বড়ো কারণ। এখন 'কন্যাশ্রী' প্রকল্পসহ আরও অনেক সুবিধা পাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মেয়েরা। নাবালিকা বিয়ে তবুও আটকানো যাচ্ছে না।

মেয়েকে সুরক্ষা দিতে কেবল সমাজবিরোধীদের সঙ্গেই লড়তে হয় না একজন বাবা-মাকে, একদিক থেকে দেখলে পুরো সমাজের বিরুদ্ধেই লড়তে হয়। কেননা, এখনও কোনো মেয়ের সঙ্গে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রাথমিকভাবে এবং শেষ বিচারেও মেয়েটাকেই দোষী ভাবা হয়। মেয়েরা ঘরের বাইরে বেরোলে নিগ্রহের শিকার হবেই, সমাজ এই ঘৃন্য ধারণাকে বুকে ধারণ করে আছে। এই কারণে যে কোনো ধরনের নারীনিগ্রহের প্রতি প্রতিবেশী থেকে পুলিশ-প্রশাসনের একটা আশ্চর্যরকম উদাসীনতা দেখা যায়। সমাজের সর্বস্তরের এই নীরব প্রশ্রয় থেকেই অপরাধী তার সাহস সঞ্চয় করে, স্পর্ধা জুগিয়ে নেয়। মেয়েদের সুরক্ষা দেওয়া তাই এতো কঠিন হয়ে যায়।

ছোট গন্ডিতে হলেও নাবালিকা বিয়ের আরও একটা কারণ আছে, জাতপাতের বৈষম্য। এখনও গ্রাম-গঞ্জে অশিক্ষিত, এমনকী, তথাকথিত শিক্ষিত পরিবারেও আদার কাস্টে বিয়ে না-পছন্দ। বাড়ির মেয়েটি যদি ভুলক্রমে প্রেমে পড়ে 'অন্য জাতে' বিয়ে করে ফেলে, শুধুমাত্র এই ভয়ে অনেক নাবালিকা বিয়ে হতে আমি দেখেছি। বিষয়টিতে আরও একটি ব্যাপার জড়িয়ে থাকে প্রায়শই, পারিবারিক সম্মান। এখনও প্রেম করে, নিজের পছন্দে ছেলেমেয়েরা বিয়ে করলে তা অসম্মানের মনে করা হয়, পরিবারের নাক কাটা যায় তাতে। ফলে, সব মিলিয়ে নাক বাঁচানোর সেই তাগিদে, হয়তো যে মেয়েটা প্রেম করে বিয়ে করতোই না কোনোদিন, শুধুমাত্র সন্দেহের বশে তারও বিয়ে হয়ে যায় প্রয়োজনের আগেই। প্রেমপ্রীতি-ভালোবাসা যা আসার বিয়ের পরেই আসুক, মনের সব বেল-তুলসীপাতা পতিদেবতাটির উপরেই ঝরে পড়ুক। তাই ফুল ফুটুক, না ফুটুক, বিয়ে হয়ে যায় মেয়েটির। তারপর কঙ্কালসার চেহারায় সন্তান কোলে সে একদিন বুঝে যায়, সে আসলে মেয়েই, অন্য আর কিছু না। ঠিক যতোটা পথ হাঁটলে একটা মেয়েও মানুষ হয়, হাঁটা হয়নি তার।

মেয়েদের উপার্জনের অনিশ্চয়তাও এর একটা কারণ। উপার্জনের নিশ্চয়তা বলতে এখানে কেবল সরকারি চাকরিই বোঝায়, যেটা সবার পাওয়া সম্ভব নয়। তাই অনেকেই মেয়েদের উচ্চশিক্ষিত করতে বিমুখ হন। আর করলেও, ভালো কাজের থেকে ভালো বর পাওয়ার উদ্দেশ্যই বেশি। সরকারি চাকরির বাইরে যে একটা মেয়ে অন্য কোনো কাজও করতে পারে, সম্মানের সঙ্গেই পারে, আমাদের সমাজ সে শিক্ষা দেয় না। অথচ, পাশ্চাত্যের অনেক দেশেই ছেলেমেয়েরা সবরকম কাজ, সে বাড়ি বাড়ি পেপার দেওয়া হোক বা রেস্টুরেন্টে বাসন মাজা, দিব্যি করে যাচ্ছেন। এমনকী, ধনী ঘরের ছেলেমেয়েরাও। এতে কিন্তু ওঁদের মান-সম্মান বা চরিত্রের কোনো অবনতি হয়নি, কোনও কাজ ওঁদের ছোট করেনি। আর, আমাদের সমাজে তিনটেই একসঙ্গে ঘটে, এক ঝটকায়। মান-সম্মান আর চরিত্র যেন ক্ষেতের মিষ্টিকুমড়ো এখানে, খুব সহজেই নষ্ট হয়ে যায় !

কাজের প্রশ্নে এসে আমরা খুব বেশি স্বদেশী হয়ে যায়! ৩১ শে ডিসেম্বরের মিড-নাইট পার্টি, হ্যাপি নিউ ইয়ারের হুল্লোড় এখন আমাদের নিজের! ছেঁড়া জিন্স, হটপ্যান্টে আর লজ্জা লাগে না, আমাদের লজ্জা শুধু কাজে! পাশ্চাত্যের পোশাক শরীরে গ্রহণ করতে পারছি, তাদের কর্মের দীক্ষা অন্তরে ধারণ করতে পারছি না কেনো? আলোর রোশনাই পছন্দ, আলোটুকুই ব্রাত্য!

আমরা যে বলি আমাদের সমাজ অনেকদূর এগিয়েছে, এগিয়েছেও অবশ্যই, তবে বাইরে থেকে যতোটা দেখি, ভেতরে ততোটা নয়। শহরের কথা বাদ দিলাম, বাইরে থেকে দেখলে তো গ্রামের মেয়েরাও জিন্স-টপস পরে ঘোরে। আবার সেই মেয়েটাই নাবালিকা বিয়ের খপ্পরে পড়ে। পোশাক তাহলে আধুনিকতা বয়ে আনে না, আধুনিকতা থাকে মানুষের মনে, মননে, মনীষায়। সেখানে কিন্তু আমরা ছেঁড়া জিন্সের মতোই ফাঁকা। মেয়েকে স্কিনটাইট ড্রেস পরিয়ে ভাবছি আমরা আধুনিক শিক্ষায় আলোকিত। আসলে আলো নয়, তার ছটাটুকু নিয়েই আপ্লুত আমরা। এবং এর বিপদ অনেক। আমরা সেই অন্ধকারের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি। আলো আসলে এখনও আলোকবর্ষ দূরে।

643 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।