সারথি বিশ্বাস

প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক, পশ্চিম বঙ্গ।

অলৌকিক জীবন

টুনু ভরওয়ালি। তার লাস্ট নেমের পথে নামা এই বছর চারেক আগে। তনয় নতুন স্যান্ডোগেঞ্জি আর ধুতি পরে কম্বলের আসনে বসে, গলায় জড়ানো লাল গামছাখানার সুতো ধরে টানছে অস্থির গতিতে। হঠাৎ করে টুনুপিসি গোল গোল করে মাথা ঘুরিয়ে যাচ্ছে দেখে ঘাবড়ে আছে কিছুটা। এপাড়ার এক্কেবারে শেষ বাড়িটা টুনুদের। বিধবা। কবে থেকে বাপ-মার গলায় পড়ে আছে কে জানে ! মায়ের ভোগের জন্য দু‘টো ফল দিতে এসেছিলো, ভক্তি (প্রণাম) করে সেখানেই একটু বসেছিলো। তারপর হঠাৎই এই দুলুনি। এখন এলো চুলের ঝাঁকুনিতে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। দুই পা মুড়ে বসেছে, পরনের কাপড় গুছিয়ে শক্ত করে হাঁটুর মধ্যে গোঁজা। চোখ দুটো বন্ধ বলেই মনে হচ্ছে।

সামনেই জোড়া মা তার কুচকুচে কালো রং নিয়ে টুকটুকে লাল জিভ বের করে স্বামীর ধবধবে সাদা বুকের উপর পা তুলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। দেখলেই বুকের মধ্যেটা কেমন ছ্যাঁৎ করে ওঠে। এমনিতেই দেব-দেবীর মধ্যে মা কালীর বাজার বেশ গরম। রাজনৈতিক দাদা-দিদিদের মতো হট মেজাজের জন্য মানুষ ভয়ে ভক্তি করে, সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে তাকে। দেব-দেবীদের একটা বাড়তি সুবিধা আছে, এরা সবসময়েই রুলিং পার্টি। গদি হারানোর ভয় নেই। নিন্দুকেরা যেমন বলছে তনয় ছয় লক্ষ টাকার বিনিময়ে কোন দাদার আশীর্বাদে প্রাইমারী স্কুলে চাকরি পেয়েছে, আর তনয়ের মা বলছে মা কালীর দয়াতেই তার ছেলের চাকরি।অস্বীকার করে লাভ নেই, আমরা অনেকেই ডাবল সিকিউরিটির ব্যবস্থা করে সুরক্ষিত রাখি আমাদের জীবন। আমরা বসন্তের টিকাও নিই, আবার মা শীতলার থানেও গড় হই। এমনি কি আর করোনার টিকা আবিষ্কারের অনেক আগেই করোনা দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে ! এমনই ডাবল সিকিউরিটির ব্যবস্থা হয়তো এদেরও ছিলো। ওদিকটা আগেই মিটে গিয়েছে, এখন এদিকটা।

তাই জোড়া মায়ের পুজো। জোড়া ঢাক। জোড়া বামুন। জোড়া কাঁসর। ফুলে-ফলে-চালে-কলায় ছোট্ট উঠোনটা উপচে পড়ছে। এর মধ্যেই টুনুর মাথায় ভর ! মাথা দুলাতে দুলাতে টুনু কখনও বলল, আমি কালী। কখনও বলল, শিব। একবার মনসার নাম করল। শেষে নিল জিনপরির নাম। চার চারটি মহাশক্তির ভর একই সঙ্গে মানুষকে বিস্মিত এবং উতলা করে তুলল।
শ্যামলীর মা গিয়েছিল বহরমপুর, শ্যামলীকে ডাক্তার দেখাতে। ডাক্তার তাকে আশা কিছুই দিতে পারেনি। ফেরার পথে এই মহা গাটবন্ধনে আকৃষ্ট হয়ে ভিড় ঠেলে মেয়েকে ফেলল জোটশক্তির সামনে। ডাক্তার কী বলেছে টুনুর জানার কথা নয়, কিন্তু আশ্চর্যের আশ্চর্য! ডাক্তার যা বলেছে, সেও তাই বলল, 'জিনের বাতাস লেগেছে।' বহরমপুরের অত্তোবড় ডাক্তারও একই কথা বলেছে, 'জিনগত সমস্যা'। টুনুর মহা জোটশক্তির শাসন শুরু সেই।

তারপর থেকে ভরের সময় টুনু যত মাথা ঘুরিয়েছে, যত কথা বলেছে তার প্রায় সবই সত্যি! এখন টুনু ভরওয়ালি বাঁজার ছেলেপুলে হওয়াতে পারে, ধ্বজভঙ্গ সারাতে পারে, পড়াশোনায় মন বসাতে পারে, বেকারের চাকরি জুটাতে পারে, বেচাল মানুষকে বশ করতে পারে, ভালোবাসা গড়তে পারে, চাইলে সেটা ভাঙতেও পারে, মানুষের ভাগ্য ফেরাতে পারে, প্রতিবেশীর ঝগড়া থামাতে পারে। যদিও গীতাঞ্জলি যোজনার দৌলতে তার একমাত্র ঘরখান পাটকাটির বেড়া ত্যাগ করে ইটের দেওয়ালে টিন-টালি এখন।

এই পর্যন্ত পড়ে যাঁরা এটাকে অশিক্ষিত, গরিব গুর্বোদের কেচ্ছা ভেবে নাক সিটকাচ্ছেন, তাঁদের বলি, তথাকথিত অনেক শিক্ষিত এবং ধনী লোকজনের গল্পও আদালা কিছু না। তাঁরা হয়তো টুনু ভরওয়ালির কাছে যান না, সবাই তো আর হাতুড়ের কাছে যাবে না, পয়সাওয়ালা পেশেন্টদের জন্য নামীদামী ব্যবস্থা তো থাকবেই। তাই তারা কেনও নামজাদা বাবা বা জাগ্রত মাতাশ্রীর দাম মেটান, কিন্তু শরীরে তাবিজ-কবচ ঠিকই ঝোলান, হাতে লাল-নীল আংটি ঠিকই ধারণ করেন। না হলে খবরের কাগজে বাবাজী, মাতাজীরা এত বড় বড় বিজ্ঞাপন দেন কীভাবে? বিজ্ঞাপনের বহরই বলে দেয় এঁদের বাজার কত্তো গরম, কারবার কত্তো বড়! আর হবে নাই বা কেনো, সংসারে অশান্তি, সন্তানহীনতা, ব্যবসায় মন্দা, চাকরি না পাওয়া, বিয়ে না হওয়া, বিয়ে ভাঙা, বাস্তুদোষ, গ্রহদোষ, গোপন শত্রুতা, প্রেম-ভালোবাসা, পরকীয়া, মামলা-মোকদ্দমা থেকে পড়াশোনাসহ সতীন শত্রু মুক্তি, স্বপ্নপূরণ এবং অসাধ্য সাধনে সিদ্ধহস্ত এঁরা। সব সমস্যার গ্যারান্টিসহ সমাধান। সমস্যা লৌকিক, কিন্তু সমাধান অলৌকিক! লিখিত চুক্তিতে কাজ এবং বিফলে মূল্য ফেরত ।

এখানেই শেষ নয়, মানুষকে বশ করতেও সিদ্ধহস্ত এঁরা, মার্কেটে সবচেয়ে বেশি চাহিদা এই পোডাক্টির। বাজারে ভ্যারাইটিস কোয়ালিটির বশীকরণ আছে, যেটা যার পকেটের মাপে আসে। আদিবাসী বিদ্যায় বশীকরণ, নাগা সন্নাসীর মন্ত্রপূত যন্ত্রম ধারণে বশীকরণ, কামাক্ষ্যা তন্ত্রে তীব্র বশীকরণ, শ্মশানতন্ত্রে বশীকরণ, মোহিনী বশীকরণ, চিরস্থায়ী মায়াবী বশীকরণ.....। কেউ বলেন ১১ মিনিট, কেউ চাইছেন পাঁচ মিনিট, তো কেউ সময় নেন মাত্র এক মিনিট ! ঘরে বসে A-Z সমস্যার গ্যারান্টিসহ নিশ্চিত ও স্থায়ী সমাধান !

সবাইকে বশে রাখার সবার-ই খুব প্রয়োজন! শত ইচ্ছা এবং হাজারো চেষ্টাতেও আমরা নিজের চামড়া কুঁচকিয়ে যাওয়া ঠেকাতে পারি না, চুলগুলো চাঁদিতে ধরে রাখতে পারি না, যে ক-পিস পড়ে থাকে তার সাদা হওয়া আটকাতে পারি না, বেড়ে যাওয়া বয়সটা রুখতে পারি না; কিছুই বশ হয় না, অথচ মানুষকে বশ করা চাই-ই চাই। নেতা ভোটারকে বশ করতে চায়, মা ছেলেকে বশে রাখতে চায়, স্ত্রী স্বামীটিকে। স্বামীর প্রয়োজন স্ত্রীকে বশে রাখা।

সুপ্রাচীন অথর্ব বেদেও দেখা যায় শুধুমাত্র আলিঙ্গন-সান্নিধ্য লাভের জন্য পুরুষটি স্ত্রীর প্রতি বশীকরণ মন্ত্র পড়ছে। আমরা অথর্বের প্রাচীনত্ব গা থেকে মুছে ফেলেছি, কিন্তু বশীকরণের নেশা এবং পেশা নয়। আজকাল, অনেক সময় ঝাকড়া চুল, বিশালাকৃতি সিঁদুরের টিপ, রুদ্রাক্ষমালায় বিশেষ কাজ হয় না, তখন ল্যাপটপ সামনে নিয়ে বসতে হয়। ভাগ্যগণনা আসলে বিজ্ঞান, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা আসলে একজন বিজ্ঞানী, সামনে ল্যাপটপ দেখে বিশ্বাস করে ফেলি আমরা। টিভিতে বেশ কয়েকটা চ্যানেলে এইসব বিজ্ঞানের চর্চা হয় সারাক্ষণ আর ভবিষ্যৎ বজ্রপাতের মতো মুহুর্মুহ আছড়ে পড়ে বর্তমানের হাতে !

মহিলা হওয়ার সুবাদে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের ও বয়সের মহিলাদের সঙ্গে মেশার সুযোগ হওয়ায় দেখেছি, বুঝেছি, বশীকরণ শুধুই একটা বিশ্বাস নয়, আমার মতে এটা ক্রাইমও। মা ছেলেকে নিজের বশে রাখতে 'গাছ' খাওয়াচ্ছে, স্ত্রী স্বামীকে বশ করতে পাল্টা 'গাছ' খাওয়াচ্ছে। অথবা প্রতিপক্ষের বশীকরণের জাদু নষ্ট করতে শিয়ালের গু খাওয়াচ্ছে। আর যে বেচারা নিশ্চিন্তে, গো-গ্রাসে গিলছে মায়ের হাতের রান্না, স্ত্রীর হাতের খাবার, সে কী জানলো কোন গন্ধমাদন সে গিলে খেয়েছে ! সেইসব বিশল্যকরণীর গুণে অনেকে পাগল হয়েছে, কারও শরীর খারাপ হয়েছে, কেউ ধকল সহ্য করতে পারেনি, মরে বেঁচেছে। কারোর মতামত না নিয়ে, তার অজান্তে চুরি করে কিছু খাওয়ানো ক্রাইম নয়?

অন্যদের কথা ছেড়ে দিলাম, যে শিক্ষক বাহুতে তাবিজ ঝুলিয়ে, আঙুলে পাথর গলিয়ে ক্লাসে যান, কোন শিক্ষার ইশারা দেন তিনি ছাত্রদের? স্বামীকে বশে রাখতে যে শিক্ষকরা আর একজন শিক্ষককে মন্ত্রপূত সন্দেশ খাওয়ানোর শলাপরামর্শ দেন, আগামী প্রজন্মের জন্য কোন শিক্ষার হাতছানি ফেলে রাখেন তাঁরা? আসলে ঠিক কত কেলাস পড়লে আমরা শিক্ষিত হব? চলন-গমনের মতো মননেও আধুনিক হব? আমরা সত্যিকে সন্দেহ করি, বাস্তবকে অস্বীকার করি, লৌকিককে অবিশ্বাস করি, অলৌকিক জীবনের প্রতি এতখানি বিশ্বাস রাখি বলেই কি!

557 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।