প্রসঙ্গ: নেপটিজম, সমাজ, আয়না ও আমাদের প্রতিচ্ছবি

রবিবার, জুলাই ১২, ২০২০ ৩:২২ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


একটি মৃত্যু। অনেকগুলো প্রশ্ন। আমাদের সভ্যতার অহংকারটা একটু দূরে সরিয়ে রাখতে পারলে শিক্ষাটা নিতে সুবিধা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার জুলু জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষরা বহিরাগতদের স্বাগত জানান 'সইবোনা' বলে। এর অর্থ 'তোমার ভালোমন্দ সবকিছুসহ তুমি যেমনটি, আমি ঠিক তেমনভাবেই তোমাকে গ্রহণ করলাম, আমার কাছে তুমি আদরণীয়, আমি তোমার কদর করি। উত্তরে কৃতজ্ঞ বহিরাগত বুকে হাত দিয়ে ঝুঁকে বলবেন, 'শিকোবা'। যার অর্থ 'আমি জেনে নিশ্চিন্ত হলাম যে আমি তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য ও আদরণীয়'।

প্রশ্নের শুরুটা এখান থেকেই এবং প্রশ্নগুলো কেবলই তারকা খচিত বলিউড বা টলিপাড়ার জন্য নয়। আমার আপনার পাড়াটাও এ প্রশ্নের মুখোমুখি। বলিউডে জুলু জনজাতির কেউ বাস করে না, ওদের শিক্ষা-সংস্কৃতি গ্রহণেরও কোনো প্রয়োজন হয় নি বলিউডের। সুশান্ত সিং রাজপুত এমন অভ্যর্থনাও পান নি নিশ্চয়ই। তাঁর কাজ কেড়ে নেওয়া হয়েছিলো, তাঁকে কোনো পার্টিতে ডাকা হতো না, ইত্যাদি যাই তাঁর সাথে ঘটে থাকুক; নেপোটিজম্ বা ফেভারিটিজম্ যার শিকারই তিনি হোন না কেনো তা অপরাধ, অপরাধ এবং অপরাধ। আমরা সেইসব বলি-তারকাদের আশির দশকের হিন্দি সিনেমার অদ্ভুত হেয়ারকাট আর পোশাক পরা, কুমির পোষা ভিলেন প্রমাণ করে ছেড়েছি সোশ্যাল মিডিয়ায়। এমন ভাব দেখিয়েছি যেনো এরা কেবল বলিউডেই থাকে! আমাদের সঙ্গে এদের রক্ত-মাংসের কোনোও সম্পর্ক নেই!

কিন্তু ঠিক নেপোটিজম্ না হলেও ইগনোরিজম্ অথবা ইন্সাল্টিজম্ অথবা আন্ডার এস্টিমেটিজম্ ইত্যাদি ইত্যাদি আর যা যা ইজম আছে সেসব জীবাণুর বাহক কি আমাদের পাড়ায় নেই? আমাদের মধ্যে তারা কি অনুপস্থিত? প্রায় সব ক্ষেত্রেই তো দেখা যায় সাধারণ ঘরের ছেলে-মেয়েরা নিজের যোগ্যতায় উচ্চপদে বা সমপদে পৌঁছালেও অনেকেরই তা মেনে নিতে খুব অসুবিধা হয়। নিজের মনের দীনতা চেপে রাখতে পারেন না। আভাসে ইঙ্গিতে অসম্মান প্রকাশ করে ফেলেন।

চলুন আয়নার সামনে দাঁড়াই। কতগুলো ছায়াছবি দেখাই আপনাদের। এমন নয় যে আপনারা এগুলো দেখেন নি কখনো। জাস্ট রিপিট টেলিকাস্ট।

এপিসোড নাম্বার ওয়ানঃ একটি বিদ্যালয়। একটি স্টুডেন্ট কাগজপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ। অনেকটা সয়ম নিয়ে একটুখানি সাহস জোগাড় করে হেডমাস্টারের দোরে যায়। হেডমাস্টার আরো খানিকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখে তারপর কাগজপত্র দেখে এবং অতি অবশ্যই স্টুডেন্টের লুক দেখে বলেন, 'আমি অ্যাটেস্টেড করবো কেনো? যেখান থেকে মাধ্যমিক পাশ করেছিস সেখানে যা'। স্টুডেন্টটির বলার ইচ্ছা হয়েছিলো, কিন্তু স্যার আমি তো উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ আপনার স্কুল থেকেই করেছি। সাহস হয় নি। সে বুঝেছিলো স্যার যখন বলছেন তখন এমনই নিয়ম নিশ্চয়। তাই সে খুব কষ্টের টাকা এবং সময় খরচ করে করিমপুর থেকে ছুটে যায় রানাঘাটে। স্রেফ একটা সই আর সিল-ছাপ্পড়ের জন্যে !

এপিসোড নাম্বার টুঃ দুর্গাপুজোর মণ্ডপ। সাইডে চেয়ার পেতে পাড়ার মধ্যমণিরা চমক দিচ্ছেন। কাছে আসার ইচ্ছে ছিলো না তাই দূর থেকেই মণ্ডপ দর্শন করে চলে যাচ্ছিলেন স্থানীয় এক নারী শিক্ষক। দু'জন গার্জেন ছুটে গিয়ে সৌজন্য বিনিময় করে আসেন। পাশে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন ঐ স্কুলেরই এক প্যারাটিচার। গ্রাম থেকে আসা সাধারণ ঘরের। চেয়ার ছেড়ে দেওয়া দূরে থাক, নিজের সন্তানকে ঐ টিচারের সাথে কথা বলতেও শেখান না সেই গার্জেনরা। জীবাণু সংক্রমিত করে ফেলে সন্তানকে। স্কুলে 'আমাদের বিদ্যালয়' রচনা লেখার সময় রোগ প্রকাশ পায়। শিক্ষককে জিজ্ঞাসা করে বসে, 'দিদিমণির সংখ্যা লিখবো রচনায়, প্যারাটিচারদের গুনতে হবে?'

এপিসোড নাম্বার থ্রিঃ আবারও পুজো মণ্ডপ। এক ভদ্রমহিলা সুন্দর রুচিসম্মত সাজগোজ করে অনেকটা সময় কাটালেন সবার মাঝে। তার ফেলে আসা গ্রামে এমন ঝলমলে পুজো হয় না তো কোনো কালে! সে উঠে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আদিকাল ধরে এ শহরবাসী এক ভদ্রমহিলা বললেন, সাজ দেখেছো! এসেছে তো কলাবাড়িয়া থেকে!

এপিসোড নাম্বার ফোরঃ এক সময় কলিগ ছিল দু'জনে। ক আর খ। ক পদোন্নতি পেয়ে চলে যায় অন্য অফিসে। কিন্তু বসবাস একই পাড়ায়। ক এপাড়ার আদি বাসিন্দা । খ গ্রাম থেকে আসা, সাধারণ ঘরের। ক- এর ছেলের উপনয়নে পাড়ার সবাই নিমন্ত্রিত হয়। এমনকি ক-এর পুরনো অফিসের কিছু কলিগও। কিন্তু পুরনো কলিগ এবং বর্তমান প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও নিমন্ত্রিতের তালিকা থেকে নাম বাদ যায় খ-এর। খ-এর মনে পড়ে যায়, চালভাজা খেতে ভালো লাগে বলেছিলো, তাই মায়ের হাতের চালভাজা খাইয়েছিলো ক-কে। তবে শুধু ক -এর কথা নয়, এপাড়ার অনেক আয়োজনেই ডাক পায় না খ-এর পরিবার।

এপিসোড নাম্বার ফাইভঃ নতুন তোলা একটা একতলা ছোট্ট বাড়ি। স্বামী স্ত্রী দু'জনেই সম্মানজনক সরকারি চাকুরী। তাদের যাতায়াতের রাস্তাটা পঞ্চায়েতের দাক্ষিণ্য পায় নি এখনো। তাই কাঁচা। মাটির রাস্তায় প্রতিবেশী গোডাউনের চালের জলের তোড়ে গর্ত হয়ে যায় প্রতি বর্ষায়। জল জমে। বলতে গেলে ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না মালিকের। বলে, 'আমি আগে প্র্যাক্টিক্যালি দেখবো।' ঠিক আছে। আবার বৃষ্টির অপেক্ষা। এলোও একদিন। ডেকে আনা হলো পয়সাওয়ালা শহুরে প্রতিবেশীকে। প্র্যাক্টিক্যালি প্রমাণিত হলো গর্ত। জমা জলও। এবার ঠিকঠাক বানান করে বললেন,' হ্যা, ঠিক আছে। আপনারা গ্রামের মানুষ কষ্ট করেন।'

এখান থেকে সংক্রমিত হয়ে কিনা জানি না, আর এক প্রতিবেশী রিটায়ার্ড মাস্টারমশাইয়ের সিড়ি ধোয়া জল নেমে এসে রাস্তা কাদা করতে থাকল নিয়ম করে। একদিন বলতে গেলে অস্বীকার করলেন। বললেন, 'বিশাল কিছু হয়ে গেছো নাকি? এইটুকু কাদা দিয়ে হাঁটা যাবে না?' শুরু হয় কথা কাটাকাটি। আর তারপর ক্যারেক্টর সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন 'অসামাজিক! এ পাড়ায় বাস করার যোগ্য নও তোমরা।'

বোর হচ্ছেন নিশ্চয়ই? রিপিট টেলিকাস্ট আর কাহাতক দেখা যায়! থাক তবে আজ। আয়নাটা ছোট্ট। তবুও নিজের মুখটা দেখতে পেলেন কি কেউ? জীবাণুর বাহক হলে বলবেন না জানি। কিন্তু এইসব ইত্যাদি ইত্যাদি ইজমের শিকার হয়েছেন যারা কখনও, কোনোও সময়, তারা বলুন, আপনার জীবন আর জীবিকা যদি এইসব ইজম বাহকদের ক্ষমতার নাগালে থাকতো, বাঁচতে দিতো আপনাকে সুস্থভাবে?

এবার বলুন, বলিউড-টলিউড থেকে আমার আপনার পাড়াটা কি খুব বেশি দূরে? বলিউডকে নাহয় ছেড়েই দিন! নিজের পাড়ার এইসব শহুরে তারকাদের নিয়ে একটা ঝড় তুলুন না সোশ্যাল মিডিয়ায়! অনেক সুশান্ত সিং রাজপুত বেঁচে যাবে। মৃত্যুর হাত থেকে, না হলেও মন খারাপের হাত থেকে তো বটেই! কে বলতে পারে এই মন খারাপটুকুই কোনো সাধারণ ঘরের গাঁইয়া ভুতের মনে অবসাদের জন্ম দেয় কিনা!

পুনশ্চঃ আরো হেনস্তা হওয়ার চূড়ান্ত সম্ভাবনা আছে জেনেও একটা ছোট্ট স্বীকারোক্তি। এখনও যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য। আমিও অতি অতি সাধারণ অথবা হা-ঘরের এক গাঁইয়া ভুত।


  • ৪৮৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সারথি বিশ্বাস

প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক, পশ্চিম বঙ্গ।

ফেসবুকে আমরা