কেন নাহি চিনে লবো সার্থকের পথ?

শুক্রবার, এপ্রিল ১৯, ২০১৯ ২:৫৮ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


পুরুষ ব্যক্তিগত ভাবে যতই অকেজো অপদার্থই হোক, প্রচলিত প্রথার দ্বারা মেয়েদের শাসন করে আটকে রাখে নিজের স্বরূপ ঢেকে রাখার জন্যই’, এমনটি করেই অবয়বপত্রে গতকাল সাঁটা একটি তীক্ষ্ন যুক্তিপূর্ণ লেখার ইতি টেনেছে সতীর্থ বন্ধু কবি শামীম আজাদ। ওর ওই জোরালো লেখাটি আমাকে বারে বারেই ভাবিয়েছে সারাদিন। একটা প্রশ্নই অষ্টপ্রহর ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে কথা কয়েছে’ আমার সঙ্গে - ‘কেনো পুরুষ প্রতিনিয়ত নারীকে শাসন করে, কেনো অনবরত ভোগ দখল করতে চায়, কেনো বন্দী করতে চেয়েছে চিরায়ত কাল ধরে?’ কেনো? কই, একজন পুরুষ তো আরেকজন পুরুষকে সে ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না, যেভাবে সে একজন নারীকে নিয়ন্ত্রন করতে চায়। তাহলে?

শামীম তার লেখায় কিছু কিছু কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। এই যেমন, নিজের জন্যে গৃহদাসী প্রাপ্তি ও নিজ যৌনতা নিশ্চিত করার জন্যে পুরুষ নারীকে শাসন করতে চায়। কিংবা নিজের স্বরূপ ঢেকে রাখার জন্যেও পুরুষ নারীকে শাসন করতে চায়। অথবা নারী-পুরুষের সম্পর্কটিকে নারী যেখানে সম্পূরক হিসেবে দেখে, পুরুষ সেটাকে সে ভাবে দেখে না।

আমি এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নই, জ্ঞানও আমার সীমিত। আমার মতামতকেও হয়তো একটি সাধারন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী বলে গ্রহন করতে হবে। তবু আমার সীমিত বুদ্ধিতে মনে হয়, অন্তর্নিহিতভাবেই পুরুষের দেহজ গঠন, মন-মানসিকতা, অভিজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক ক্রমধারার কারনেই পুরুষ নারীর প্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক ও নির্যাতক হয়ে ওঠে।

প্রথমত: নারী যেখানে মনোবলে বলীয়ান, পুরুষ সেখানে দেহবলে বলীয়ান। এটাতো জানা কথা যে দেহবলে বলীয়ান মানুষ তার পেশীশক্তি ব্যবহার করবেই এবং পুরুষ সেটা প্রতিনিয়ত করে। দেহবলই পুরুষকে উন্মত্ত করে, যুক্তি-বিবর্জিত করে, সংঘাতের দিকে টেনে নিয়ে যায়। দেহবলকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে পুরুষের মনে একটি অহংবোধের জন্ম নেয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে, নারীর মনোবল শক্তিশালী হওয়ার কারণে এ অহংবোধ ঠুনকো, ভঙ্গুর এবং খুব স্পর্শকাতর হয়। খুব অল্প কারণেই সে অহংবোধে আঘাত লাগে এবং তখন নারীকে শাসন করার সুতীব্র ইচ্ছা পুরুষ সামলাতে পারে না।

দ্বিতীয়ত: পুরুষ বহির্মুখী ও অস্থির, যেখানে নারী অন্তর্মুখীন ও স্থির। পুরুষ ভাঙ্গতে চায়, নারী গড়তে চায়। পুরুষ ছুটে যেতে চায়, নারী ধরে রাখতে চায়। নারী যেখানে সবার কথা ভাবে, পুরুষ সেখানে বড় বেশী নিজের কথা ভাবে। স্বাভাবিকভাবেই সংঘাত সেখানে অনিবার্য। এ পুরো দ্বন্দ্বে পুরুষ নারীকে তার ইচ্ছে পূরণের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখে। অতএব এমন বাধাকে তো শৃঙ্খলিত করতেই হবে পুরুষকে।

তৃতীয়ত: প্রথাগত ধারণার বিপরীতে বহু মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এটা প্রমানিত হয়েছে যে, নারী অনেক বাস্তববাদী ও যুক্তিনির্ভর, যেখানে পুরুষ অনেক বেশী স্বাপ্নিক ও আবেগপ্রবন। সুতরাং পুরুষের অনেক অবাস্তব স্বপ্ন ও অপ্রয়োজনীয় আবেগ নারীর বাস্তববাদী যুক্তির ছুড়িতে প্রায়শ:ই খন্ড-বিখন্ড হয়। এটা পুরুষকে ক্ষিপ্ত করে এবং তখন সে নারীকে বন্দী করার জন্যে ব্রতী হয়।

চতুর্থত: জীবনধারায় নারী পুরুষকে পরিপূরক হিসেবে দেখে, কিন্তু পুরুষ নারীকে দেখে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। পুরুষের সমস্যা হচ্ছে যে সে মনে করে যে সে সর্ববিষয়ে নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠতরো এবং তার অসাধ্য কিছু নেই। অন্যদিকে নারী জানে, কোথায় তার শক্তি, কোথায় তার দূর্বলতা। নারীর দূর্বলতা পুরুষের পরিহাসের বিষয়, আর তার শক্তি পুরুষের অস্বস্তির কারণ। সুতরাং সম্পূরক হতে পুরুষের প্রবল আপত্তি।

পঞ্চমত: নারী শান্তির পক্ষে, অথচ পুরুষের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, তারা সংঘাত সৃষ্টি করে অবিরত। পুরুষই যুদ্ধের দায়িত্বে থাকে, পুরুষই আমাদের সন্তানদের যুদ্ধের মাঠে পাঠায়। নারীর যদি সিদ্ধান্ত গ্রহনের শীর্ষে থাকত, তা’হলে হয়তো যুদ্ধ-বিগ্রহ ন্যূনতমে নেমে আসতো, কারণ প্রানে ধরে কোনো নারী তার সন্তানদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতে পারতো না। তাই শান্তির দূতকে আটকাতে না পারলে পুরুষ সংঘাত সৃষ্টি করবে কি ভাবে?

একটি ভীতির সংস্কৃতি ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে নারীকে শৃঙ্খলিত করার জন্যে পুরুষ যে সব পন্থা অবলম্বন করে, তার মধ্যে ধর্ষণ অন্যতম। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে দেহগত ধর্ষণই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, কিন্তু নারীকে শৃঙ্খলিত করার ক্ষেত্রে এক ধরনের মানসিক ধর্ষণও অবিরত ব্যবহৃত হয়।

ঘরের মধ্যে, কর্মক্ষেত্রে, রাস্তা-ঘাটে, এক কথায় ঘরে-বাইরে, নারীকে উত্যক্ত করা হচ্ছে পরিহাসমূলক কথার মাধ্যমে, ঈঙ্গিতময় তথাকথিত ঠাট্টার দ্বারা, তাদের শক্তিকে অবজ্ঞা করে এবং তাদের দূর্বলতাকে আঘাতের কেন্দ্র করে, কথার মাধ্যমে তাদেরকে প্রতিনিয়ত খাটো করে। উচ্চকিত স্বরে তাদের বলা হয় যে, নারী বুদ্ধি-বিবেচনাহীন, তাদের কাজ মূল্যহীন, তারা দূর্বল ও সদা ক্রন্দসী। এ অসম্মানের ভার নারী বহন করে প্রতিক্ষেত্রে, প্রতিনিয়ত।

শেষের কথা বলি। নারীকে অসম্মান করে পুরুষ বড় হয় না, সে আরো ছোট হয়ে যায়। নারীকে শৃঙ্খলিত করে পুরুষ বীর হয় না, তাকে মুক্ত করেই পুরুষ নমস্য হয়। নারীর অধিকার বিনষ্ট করে পুরুষ জয়ী হয় না, সে অধিকারকে নিশ্চিত করেই পুরুষ সম্মানিত হয়। তাই, পুরুষ হিসেবে আমাদের কাছে আমাদেরই জিজ্ঞাস্য, ‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার, কেনো নাহি দিবে অধিকার, হে পুরুষ?’ পুরুষ যদি সেটা না করে, তাহলে সে নিশ্চিত থাকতে পারে যে, নারীর কণ্ঠে সবলে উচ্চারিত হবে, ‘ শুধু শূণ্যে চেয়ে রবো, কেনো নাহি চিনে লবো নিজে, সার্থকের পথ?’


  • ১৭৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সেলিম জাহান

অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক

ফেসবুকে আমরা