নারীবাদ পরিবার প্রথাকে খারিজ করে না

মঙ্গলবার, জুন ২৫, ২০১৯ ৪:৫৫ AM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


এটা কোনো জবাবদিহিতা না, এটা শুধুমাত্র নিজের অবস্হান পরিস্কার করার প্রয়াস। আমার পরিচিত লোকজনই বলে তুমি কি দ্বিতীয় তসলিমা হতে চাও, তুমি লেজ কাটা শেয়াল বাকীদের ও কাটতে উৎসাহ দিচ্ছো। সমালোচনা করার অনেক গঠনমূলক উপায় আছে আঘাত না করেও।

প্রথমত, আমি কোনোভাবেই নিজেকে তসলিমা নাসরিনের ধারে কাছের ভাবি না। এতো বছর পরে এসে এতো গুলো পোর্টাল নিয়েও এতো গুলো মানুষ এক হয়েও কতো গালি খাচ্ছে, খাই আর সেই সময় সে একা অতো স্পর্ধিত উচ্চারণ করেছিলো। তাঁর মাথার দাম হাঁকা হয়েছিলো। তাঁর কবিতা আমার বেশ লাগে, তার নির্বাচিত কলাম আমার ছেলেবেলার মানস জগতে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলো। আর একটি বই, পাল এস বাকের লিখা "টু ওয়ার্ল্ডস" নারী হিসেবে নিজেকে ছোট না ভাবার জন্যে আমার প্রথম জীবনের মোরাল সাপোর্ট ছিলো।

আমার মামারা বাম রাজনীতি করতো, আমার মা নিজে সমাজতত্ত্বে স্নাত্বকোত্তর। মা'র বই পড়ার, টুকটাক কবিতা লিখার, চিঠি লিখার অভ্যেস ছিলো। আমার নানী কোরআনে হাফেজ ছিলেন, তিনিও সরকারি চাকুরী করতেন, ট্রেইনড মিডওয়াইফ ছিলেন। আমার বড় মামা, আমার মা তাঁদের গ্রামের প্রথম মাস্টার্স, এবং এস এস সি পাশ। আমার নানী পুঁথি পড়তেন, যুদ্ধের পর এক রকম আমার নানাকেসহ উনি পুরো পরিবারের ভরনপোষণ করেছেন। উনি ছন্দে ছন্দে কথা বলতে পারতেন। আমার ছোট মামার আঁকার হাত খুব ভালো। লালন, রবীন্দ্রনাথ বা ভূপেন হাজারিকা দারুন শোনায় মামার গলায়।

সেই তুলনায় বাবার বাড়ির চিত্র একদম উল্টো। সব প্রবাসী চাচা-জ্যাঠারা রের্কড করা ক্যাসেট পাঠাতো। আর আমার ধারনা জীনগত কারনে আমি স্বাধীনচেতা, নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে আমি ঠিক মানাতে পারি না। আমি বনের পাখি হতে চেয়েছি, পাখিরাও কিন্তু আকাশে বন্দী। যাক এসবই ভূমিকা।

আমার শৈশবে চারপাশে প্রচুর বই ছিলো, স্কুলে লাইব্রেরি ছিলো, মামার বাড়ীতে পার্টি অফিস ছিলো, বিদ্যুৎহীন নোয়াখালীর ঐ চরাঞ্চলে আমার ছোটো মামা শিকল পড়া শ্রমিকের বন্ধ হাত আঁকতো, আমি বড় হয়েছি তিন কবির গান শুনে, দেয়ালে লেনিন, ফেডরিক এঙ্গেলস, মার্কস এদের ছবি দেখে। রাদুগা আর প্রগতি প্রকাশনীর বইতে ঘর ভর্তি ছিলো। আমার মা'র নাম আমার বড় মামা তানিয়া রেখেছিলো এক রুশ নারী যোদ্ধার নামে, বইটির বাংলা অনুবাদ করেছিলেন আহমেদ ছফা।

একি সাথে আমার পরিবার খুবই রক্ষনশীলও। আমার যে সব বাঁধ ভেংগে উড়তে ইচ্ছে করতো সে ইচ্ছে ডানায় হাওয়া দিয়েছিলো বইয়েরা। আমি খুব ছোট বেলায় প্রীতিলতা আর জোয়ান অব আর্কদের গল্প শুনেছি। আমার মা বলতো তোমার সফলতাই তোমার সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ।  আমাদের কোনো ভাই নেই, সে গল্প অন্য একদিন করবো।

আমার আজকের এই আমি হয়তো কোনোদিনই এক্সসিস্ট করতো না, যদি না আমার ওরকম চমৎকার একটা নানা বাড়ীর শৈশব না থাকতো। সে শৈশবে ও কালিমা আছে, কালু গাজীর গল্প শোনাতে শোনাতে বাচ্চা একটা মেয়েকে মলেস্ট করছে এক বৃদ্ধ, তা আজো দুঃস্বপ্ন হয়ে তাড়া করে আমাকে। আলোর মাঝে খানিকটা কালোতো থাকেই। এখন মূল কথায় আসি।

১. আমি ভীষণ ভাবে পরিবার প্রথায় বিশ্বাস করি, তাঁর জন্যে কাগজ করেই বিয়ে করতে হবে এ নিয়ে চরমপন্থী না। বিয়ে, কমিটমেন্ট, ভালোবাসা অন্তরের সম্পর্ক। কাগজ বা দেনমোহর দিয়ে সংসার টিকানো যেতে পারে কিন্তু ভালোবাসা না। সুরভীর একটা কথা লিখছি এখানে প্রেম মরে গেলে বিয়ে তামাদি হয়ে যায়। সুতরাং আমি ডির্ভোসী বলে, নিজের লেজ কাটা গেছে বলে সবার লেজ কাটার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছি এটা ভুল চিন্তা। আমার প্রিয় অনেক নারী অধিকার নিয়ে সোচ্চার মানুষের ইর্ষনীয় প্রেমময় সুন্দর দাম্পত্য আছে। দুটো মানুষকে পিউর ভালোবাসায় দেখার চেয়ে সুন্দর আর কী আছে এ জগতে। মুনমুন শারমীন, বৈশালী, পুস্পিতা, তিয়ান, জেসমিন আপা এরকম ভুরি ভুরি সুখী দাম্পত্যের অধিকারী নারীবাদি আছে।

২. আপনি বিয়ে করবেন কি করবেন না, আপনি মা হবেন কি হবেন না, বা আপনি রান্না করবেন কি করবেন না, তা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যপার। আপনি নিম্পোম্যানিয়াক, অ্যাসেক্সুয়াল, পলিগেমাস, মনোগেমাস, বাই সেক্সুয়াল, লেসবিয়ান সবই হতে পারেন। এগুলো সবই ব্যক্তিগত ব্যপার, কিন্তু আপনার রান্না করতে ভালো লাগে না এটাকে হালাল করার জন্যে নারীবাদী হওয়ার দরকার নাই। দুনিয়াতে অনেক ছেলে ভালো রান্না করে, রাঁধতে ভালোও বাসে, অনেকে করে না, এটা ব্যক্তিগত অভিরুচি। মা হওয়া বিরাট ঝক্কি আর দায়িত্বের ব্যাপার। আপনি না চাইলে হবেন না, কেউ যদি আপনি শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে আপনার উপর চাপাতে চায় আমি আপনার পাশে দাঁড়াবো। কিন্ত আপনি যদি বলেন মা হওয়া, সংসার করা, একাগামী হওয়া মানে নারীবান্ধব না, দাস্যত্ব, এবং এটাকে আপনি নিয়ম বানাতে চান তখনও আমি আপনারে ছেড়ে কথা বলবো না।

৩. ধর্ম ও আমার কাছে খুব ব্যক্তিগত বিষয়, এবং যতোক্ষণ আপনি আপনার ধর্মের জন্যে নিজেকে শ্রেষ্ঠ এবং অন্যদের অসম্মান না করছেন আমার কোন বিরোধ নেই। কিন্তু ধর্ম যখন আমার রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক অধিকার নির্ধারন করে দেয়। যখন আমার পোশাক, আমার পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার নির্ধারণ করে দেয়, আমার মাতৃত্বের সীমানা ঠিক করে দেয়, আমি এর সমালোচনা করবোই।

৪. নারীর যৌনতা নিয়ে কথা বলা উচিৎ। এটা ট্যাবু, সেটা ভাংগা উচিৎ। এর সাথে নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য জড়িত, কিন্তু সেটা অপ্রাসংগিক ভাবে না।


  • ১২৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শায়লা হক তানজু

প্রবাসী লেখক, এক্টিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা