শাকিল মাহমুদ

সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাংবাদিক

ধর্ষক সমাজের জন্য ক্ষতিকর

আমাদের দেশে ধর্ষণ নিয়ে সোচ্চার না হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো, মিডিয়া ট্রায়াল। আপনার মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে? ল্যাঠা চুকে গেলো! কে ধর্ষক তা না খুঁজে আপনার মেয়েকে খুঁজে বের করে, বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ছবি তুলে, ভিডিও নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে মিডিয়ায় এমন সব গপ্পো উপস্থাপন করা হবে- যার ফলে পুনরায় মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হবে। কীভাবে ধর্ষণ করা হলো, কতোজন ছিলো, কাপড় খুলেছিলো কিনা, এসবসহ ধর্ষণমূখী আরো নানা প্রশ্নে জর্জরিত হওয়ার ভয়ে বাবা-মা তার ধর্ষণের শিকার মেয়েকে নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। এছাড়াও মধ্যবিত্ত মানসিকতার সম্মান নামক বস্তুটির কারণেও আমাদের দেশে ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে উঠে না।

এমনিতেই মেয়েটি ধর্ষণের শিকার, তার উপর সমাজে জানাজানি হলে শেষমেশ সমাজে মুখ দেখানো দায়! অথচ যারা ধর্ষণ করলো তারা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে! এর জন্য অবশ্য সামাজিক মূল্যবোধের যে অবক্ষয় মারাত্মকভাবে দায়ী, সে সঙ্গে পরিবার তো বটেই। সম্প্রতি আমি একটি লেখায় লিখেছিলাম ধর্ষণের মানসিকতা পরিবার থেকে গড়ে উঠে। কিন্তু সে লেখার বিপরীতে দশজন দাঁড়িয়ে বললো, আমি ভুল! কিন্তু কী কারণে ভুল তার কোনো ব্যাখ্যা তারা না দিয়ে সে লেখা শেয়ার করা একজনের কমেন্ট বক্সে লিখছে, আপনি যে ধরণের পোষাক পরেন তা কি আপনার পরিবারের শিক্ষা? আশ্চর্য হলাম এই ভেবে যে, কে কি পোষাক পরলো বা পরবে তা দিয়ে এরা মানবিক মূল্যবোধ বিচার করে! অথচ এই কয়দিন আগেই বোরখা পরিহিত মহিলার এক ছবি নিয়ে কতো বোদ্ধা চামে কতো জ্ঞান দিয়ে গেলো। পোষাক যার যার ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়! এই যে যারা কমেন্ট বক্সে, পোষাক পরা নিয়ে পরিবারের বিষয়টিকে জড়াচ্ছেন, তারা পর্যন্ত বলেছেন বোরখায় সমস্যা কী? ওটা যার যার ইচ্ছার বিষয়! আমি তো তাই বলি, কিন্তু সমস্যা তো ভিন্ন জায়গায়, ওই মহিলা বোরখা পরে বাহবা পেলেও জয়া আহসান, বাঁধন, মিথিলা শাড়ী পরে, শার্ট-প্যান্ট পরে ছবি দিলেই গণধর্ষণ শুরু হয় কমেন্টে! সুতরাং পোষাক, কে কী পরবে বা পরবে না, তা পরিবারের শিক্ষা নয়। বরং কে কী পরলো বা পরলো না তা নিয়ে আপনাদের যাতে মাথা ব্যথা না হয় তার শিক্ষাটা পরিবার থেকেই দেয়া উচিত।

আজকে নতুন করে আবার পুরনো কাসুন্দি না ঘেটে ভিন্ন একটি বিষয়ে আলাপ করার জন্য এ লেখা। সেটা হলো, পরিবার কিভাবে ধর্ষণের মানসিকতা গড়তে ভূমিকা পালন করে। আমার নিজের একটি কথা দিয়েই শুরু করি। আমাদের সমাজে নারীর কিছু সামগ্রী, খেলা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। অবশ্য সেগুলোর তোয়াক্কা আমি কখনোই করি নি। তবুও আপনাদের বোঝার উদ্দেশ্যে বলা আরকি!

ছোটবেলায় লেইস ফিতা বিক্রি করা লোক এলে মা যখন টিপ, চুড়ি কেনার জন্য লেইস ফিতাওয়ালাকে ডাকতেন তখন আমিও মায়ের সঙ্গে গিয়ে নেইল পলিস, চুড়ি ইত্যাদি কেনার বায়না ধরতাম। সে সময় বুঝতাম না এগুলো নারীরা ব্যবহার করে কিনা! মাও তখন এ নিয়ে কিছু বলতো না। এরপর যখন বড়ো হলাম, নারী-পুরুষ বিষয়টা বুঝতে শুরু করলাম তখনো মেয়েদের মতো সাজুগুজু করা আমার নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিলো। আর সেসবে সমর্থন দিতো বাবা। ঢাকা থেকে বাড়ী ফেরার কথা শুনলেই বলতাম মেহেদী নিয়ে যেতে। মা অবশ্য তখন বলতো, ছেলে হয়ে মেয়েদের মতো সাজা! আর তাতে সেও (বাবা) সমর্থন দেয়! এসব বলেও মা নিজেই হাতে মেহেদী লাগিয়ে দিতেন কিংবা পাড়ার চাচাতো বোনদের ডেকে বলতেন একটু নকশা করে দিতে। অর্থাৎ আমার পরিবারে আমি কখনো নারীকে অবজ্ঞা করার শিক্ষা পাই নি৷ কখনো আমাকে বলা হয় নি, ও মেয়ে ওর সঙ্গে এভাবে মেশা উচিৎ না। ফলে নারী আর আমি যে আলাদা কেউ তা পরিবার থেকে শিখি নাই।

এ বিষয়টা সাধারণ বিষয়। এরচেয়ে আরো গভীরভাবে সন্তানকে শিক্ষা দেয়ার উপায় রয়েছে। যেমন একটা বয়সে এসে সন্তান ঘনিষ্ঠ বন্ধু খোঁজে। যার সঙ্গে মনের কথাগুলো অনায়াসে বলতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের পরিবারগুলোতে সে বয়সে সন্তানকে একা করে দেয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা বাবা-মা বা বড় ভাই-বোন এতই ব্যস্ত থাকেন যে সন্তানকে সময় দেয়ার মতো সময় তাদের হয় না৷ ফলে ওই বয়সে তারা বাইরে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। খোলামেলা আলাপ করতে শুরু করলে সে বন্ধুকে তারা বিশ্বস্ত মনে করে এবং বন্ধুদের সব কথাই পজেটিভ মনে হয়। ফলে মাদকাসক্ত হওয়া থেকে শুরু করে নারীর প্রতি যৌন আকাঙ্খা পাশবিকভাবে বেড়ে উঠে। এক পর্যায়ে তা চূড়ান্ত মাত্রা অতিক্রম করে অন্যান্য সামাজিক অপরাধসহ ধর্ষণের মতো অপরাধ সংগঠিত হয়৷ সুতরাং পুরো চক্রটায় পরিবারের গাফেলতিই একমাত্র কারণ। সুতরাং আপনারা যারা পরিবারকে এ অপরাধের আতুড়ঘর ভাবতে পারছেন না তাদের জন্য সমবেদনা বৈ আর কিছু রইলো না।

ধর্ষণ রোধে ধর্ষকের শাস্তি দাবি করে দেশে এক প্রতিবাদের ঢল নামিয়ে আনা যেমন প্রয়োজন তেমনই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধর্ষক প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলতে না চাইলে পরিবারকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। নচেৎ আমরা একটি ভয়ংকর ধর্ষক প্রজন্মের জন্য অপেক্ষা করছি৷ যেখানে নারী মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। সুতরাং একটি মানবিক মূল্যবোধহীন সমাজকে গড়ে তুলতে এখনই সচেতন হওয়া জরুরি। ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং এ সামাজিক ব্যাধিকে প্রতিরোধ করতে প্রত্যেকে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে এগিয়ে আসুন৷ সেই সঙ্গে ধর্ষিতাকে নিয়ে মিডিয়া ট্রায়াল নামক ধর্ষণ বন্ধ করা জরুরি৷ নচেৎ ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়বে।

আজকে ধর্ষণ আমাদের দেশে যে হারে বেড়ে গিয়েছে তার মূলে আমাদের নিরবতা অন্যতম একটি কারণ। সম্প্রতি মুম্বাইয়ের একরাজ্যে ধর্ষণ নিয়ে সোচ্চার হয়েছে বলিউড৷ অভিনয়শিল্পীদের জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ অনুসরণ করে৷ ফলে ধর্ষণের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার হলে প্রবল ধাক্কা দেয়া সম্ভব৷ কিন্তু হতাশার বিষয় হলো ধর্ষণ নিয়ে হাতে গোনা কয়েকজন অভিনয়শিল্পী ছাড়া বেশির ভাগের কোনো ভূমিকা নেই। সাংবাদিকতা করার সুবাদে মাঝে মধ্যে এ নিয়ে তাদের প্রশ্ন করলে নীতিবাক্য শোনালেও ব্যক্তিগতভাবে এর বিরুদ্ধে তারা কোনো ভিডিও বার্তা দেন না। ফেসবুকে নানা বিষয়ে তাদের পোস্ট অহরহ চোখে পড়লেও ধর্ষণের বিরুদ্ধে তারা নিশ্চুপ!

কিছুদিন আগেই এক নারীর সঙ্গে কমেন্টে আলাপ হচ্ছিলো। সেখানে তিনি বললেন, নিরাপদে তিনি ঘরে যেতে চান। এর প্রেক্ষিতে তাকে প্রশ্ন করলাম, ঘরেও কি আপনি নিরাপদ? জবাবে তিনি জানান, এখনো তিনি বিয়ে করেন নি। ফলে এখনো তিনি ঘরে নিপীড়নের শিকার হন নি। আমাদের আজকে ভাবনা হয়ে গেছে, অমুক মেয়ে ধর্ষনের হয়েছে- 'আমি তো হই নি৷ আমার হয়তো হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই ভালোভাবে, নিরাপদে ঘরে যেতে পারলেই বাঁচি।' যেখানে ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রত্যেকটা নারীর এখন প্রতিবাদ করা উচিৎ সেখানে তারা 'চাচা আপন প্রাণ বাঁচা' বলে ঘরে ফিরতে চায়। কিন্তু এই আপন প্রাণ বাঁচিয়ে তারা ঘরে ফিরলে হয়তো আজকের মতো বেঁচে যাবেন। কিন্তু কাল? ধর্ষণ মরণ ব্যাধি ক্যান্সারের মতো একটু একটু করে আজকে সমাজের অনেকটা অংশ খেয়ে নিয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো নির্বাক। কেবল মাত্র মোমবাতি হাতে দাঁড়ানোর দায়!

এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে 'চাচা আপন প্রাণ বাঁচা' ভেবে ঘরে নিরাপদে যাওয়ার সময় নয়। এখন প্রতিবাদ করার সময়, প্রতিরোধ গড়ার সময়। সর্বসাধারণেরই ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সময়।

গতকালকে নাট্য, সিনেমা নির্মাতাদের কাছে দাবি করেছিলাম, আপনারা সিনেমার শুরুতে যেমন ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রচার করে সচেতনতা তৈরি করেন তেমনই ধর্ষক সমাজের জন্য ক্ষতিকর লিখে সচেতন করুন। প্রতিবাদ নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রবলভাবে গড়ে তোলাই এখন একমাত্র পথ। যেটা সমাজে এক বিস্ফোরণ ঘটাবে এবং সমস্ত ধর্ষকদের বিরুদ্ধে ভয়ংকর হয়ে উঠবে।

939 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।