আমার #MeToo : শামীম আরা নীপা

বুধবার, নভেম্বর ৭, ২০১৮ ১০:২১ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


আমি ছোটবেলায় (দেড়/দুই বছর বয়সে) প্যান্টে পটি করে দিলে দরজার পেছনে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কিছুক্ষণ আমাকে ঘরের ভেতর তুড় তুড় করতে না দেখলেই মা, ফুপু ও দাদীরা বুঝে যেতো যে আমি প্যান্ট ভরে পটি করে দিয়েছি এবং ঘরের কোন এক চিপায় ঘাপটি মেরে আছি। সেই বয়সের স্মৃতি আমার আছে। আমি পটি করে প্যান্ট ভরা ঝুলন্ত পটি নিয়ে দরজার পেছনে দেয়ালের দিকে মুখ করে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি -সেই স্মৃতি আজও আমার চোখে ভাসে এবং আমার হাসি পায়।

আমার মা-বাবা, দাদি ও ফুপু খুব সাবধানী ছিলেন, আমাদের ভাইবোনদেরকে কার সাথে কীভাবে কতটুকু মিশবো কিংবা মিশবো না, কোথায় যাবো কিংবা না যাবো -সব শিশুকাল থেকে পই পই করে শিখিয়েছেন, সাবধান করেছেন।

অনেক ছোটবেলা থেকেই একবার যে জায়গায় গিয়েছি সে জায়গা কখনো ভুলতাম না। এর অনেক সাক্ষী আছে, আমার স্মৃতিশক্তির কথা এজন্য বলতেছি যে, আমার স্মরণ ক্ষমতা সম্পর্কে একটা পরিস্কার ধারণা দিতে চাইলাম আর কি।

অনেক মানুষের বড় পরিবার ছিলো আমাদের। ছোট্ট দুইটা ঘরে আমরা অনেকগুলো মানুষ থাকতাম, অতিথি সমাগম হতো খুব। অনেক ব্যস্ততার ভেতরও আম্মা আমাদেরকে চোখে চোখে রাখতেন যেনো কোথাও কোনো বিপদ না হয়। ছোটবেলায় আমি আম্মা, ফুপু এবং দাদুর সঙ্গে ছাড়া কোথাও যেতাম না। বিল্ডিং এর কারো বাসায় একা কখনো যেতে পারতাম না। মুন্নী আন্টির কাছে আম্মা আমাকে দিতেন কারণ জানতেন আমি নিরাপদ আছি। আমার বড় ভাইকে একা কোথাওই কখনো রাখেননি। আমাদের সব ভাই বোনের বেলায়ই উনারা খুব সাবধান ছিলেন -যেনো কোনো বিপদ না হয়, যেন আমরা ভাই বোনেরা কোনো প্রকার যৌন নিপীড়নের শিকার  না হই। আমার বাবা, চাচা, মামা, নানা, ভাই -এদের কেউই যৌন নিপীড়ক ছিলো না -এ এক পরম কৃতজ্ঞতা আমার জীবনের প্রতি।

আমার বয়স তখন ৪/৫ বছর হবে, আব্বার গাড়ীতে করে আমরা বেড়াতে যাচ্ছিলাম কোন এক খানে, বাচ্চারা সামনে বসার বায়না করে যেমন তেমন আমিও করলাম, আব্বা ড্রাইভিং সীটে এবং আমার ফুপা তার পাশে। আম্মা, ফুপু এবং বাকীরা পেছনের সীটে। আম্মা দিতে রাজী নন তারপরও দিলেন।

৪/৫ বছরের কন্যা শিশুর আলাদা করে স্তন থাকে না। কিন্তু একজন কন্যা বলেই আমাকে আমার ফুপা যে দুই হাত দিয়ে ধরেছিলো সেই দুই হাতের তালু দিয়ে আমার বুকে চাপ দিচ্ছিলো যা ঐখানে বসে থাকা কারো পক্ষে বুঝা সম্ভব ছিলো না। আমি বুঝতে পারছিলাম চাপটা, কিন্তু কারণ কিংবা ইনটেনশনটা কি করে ৪/৫ বছরের শিশু বুঝবে? তারপর যেটা আমি করেছিলাম সেটা হলো আমি তার কোল থেকে নেমে দাঁড়িয়ে গেলাম এবং ফেরার পথে তার কোলে সামনের সিটে আর বসতে চাইনি। স্পর্শ কতটা নোংড়া হতে পারে তা ঐ ৪/৫ বছর বয়সেই অনুভব করলাম কিন্তু বুঝে উঠতে পারি নি তখনো, কাওকে যে বলবো কিংবা বলতে হবে তাও বুঝিনি, শুধু বুঝেছিলাম ঐ লোকের কাছে যাওয়া যাবে না এবং আমি তার কাছে আর ঘেষতাম না কখনো। আমার বুকের উপর ঐ চাপের অনুভূতিটাকে আমি খুব স্পষ্ট করে আজও বুঝতে পারি, উপলব্ধি করতে পারি। অনেক বছর পর আমি বুঝতে পারলাম যে ঐটা একটা যৌন নিপীড়ন ছিলো।

মোস্তফা জব্বারের কন্যা শিশুদের বুকের উপরে হাত রেখে জড়িয়ে ধরা ছবি দেখে আমার মাথায় রক্ত উঠে গেছে এবং আমার সেই ঘটনার কথা মনে পরে গেছে, আক্রোশ ক্ষোভ জেদ হয়েছে, আমি নিতে পারি না। আমার ফুপুকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ফুপার চরিত্র সম্পর্কে, ফুপু দুঃখের সাথে অবলীলায় বলেছিলেন -লোকটা কাজের মেয়েদের শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখতো! আমার মনে হইছে যে -আল্লাহ'র রহমত যে ঐ লোক তাদের ধর্ষণ করার চেষ্টা করে নি কখনো, ঐ পরিস্থিতি ফেইস করতে হলে আমার ফুপুর কি অবস্থা দাঁড়াতো সেইটা ভেবে আমি শিউড়ে উঠি আজও।

আমি আমার ছেলে মেয়েদের কে এজন্যে কখনোই কারো কোলে দিই নি এবং এখনো দিই না। বিশেষ কিছু বিশ্বস্ত মানুষ ছাড়া কারো সাথে একা ছাড়ি না। আমি কোনো সুযোগ দিতে চাই না। আমার মা বাবা এত সাবধান থাকার পরও তাদের উপস্থিতিতেই আমার সাথে সেই ঘটনা ঘটে গেছে -কেউ টেরও পায় নি কিন্তু আমার স্মৃতিতে প্রথমে এক বিস্ময় এবং পরে ঘেন্না হয়ে তা থেকে গেছে।

আমার ছোট ভাই ঘুমের ভেতর কথা বলতো, হাঁটতো, দরজা খুলে বের হয়ে যেতো। তখন ভাইটার বয়স ৯/১০ হবে, আমরা একসাথে ঘুমাতাম -একদিন ঘুমের ভেতরই দেখি ভাই আঙুল দিয়ে আমার স্তনে গুতা দিচ্ছে, ধরে দেখতেছে -আমি নড়েচড়ে উঠায় ভাইয়েরও ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে ও খুব ভয় পেয়েছিলো। কিন্তু আমি ওকে কিছুই বুঝতে দেই নি। ভাই এর জায়গায় বোন হলেও আমি এই ঘটনাটা বলতাম। এটা যৌন নিপীড়ন ছিলো না কিন্তু আমি প্রচন্ড চমকে উঠেছিলাম যদিও ভয় পাই নি। আমার তিন ভাই এর একজনকেও কখনো যৌন বিকৃতির ধারক বাহক মনে হয় নি এবং এখন পর্যন্ত আমি নিশ্চিন্তে বলতে পারি -আমার কোন ভাইই যৌন নিপীড়ক এবং ধর্ষক না। এই ঘটনাটা এজন্য উল্লেখ করলাম যে, শরীর নিয়ে আমি তিনবার চমকে উঠেছি তারমধ্যে এটাও একটা। যদিও সেখানে আমার ভাইয়ের কোনো যৌনানুভুতি ছিলো না এবং আমার জীবনে ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনায় আমি যে রিডিং পেয়েছিলাম তা এইক্ষেত্রে অনুভুত হয়নি। তবুও স্পর্শ কথা বলে -এটা বুঝাতেই আমি এই প্রসঙ্গটা লিখলাম।

তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, তখনো আমার পিরিয়ড শুরু হয় নি, মোটা ছিলাম, এজন্য বয়সের তুলনায় বেশী বড় লাগতো। আমার সিল্কের হলুদ একটা জামা ছিলো, প্রিয় জামা। সেই জামা পরে আমি আব্বা আম্মার সাথে গাউসিয়া মার্কেটে গেছিলাম একবার। গাউসিয়ার একতলায় ভেতরে ঢুকতে গেটের কাছে আম্মা সেফটিপিন কিনতে দাঁড়িয়েছেন, আমি আম্মা এবং আব্বার মাঝখানে দাঁড়ানো। আম্মা আব্বা বিক্রেতার সাথে কথা বলছিলেন আর আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। মুহূর্তের ভেতর কোনো এক কুৎসিত হাত আমার বাম স্তনে চাপ দিয়ে চলে গেলো -আব্বা আম্মা টেরও পায় নি। আমি ঝট করে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম একটা কালো খাটো পশু চোখের নিমিষে ভীড়ের ভেতর মিলিয়ে গেলো, আমি তার পেছনে যেতে চাইলাম, কিন্তু মুহূর্তেই সেই পশু উধাও হয়ে গেলো আর আম্মাও আমাকে পেছন থেকে ধরে ফেললেন -আমি কাওকে কিছুই বললাম না, ভেতরে একটা জেদ হতে থাকলো। আমার শরীরটা পচে যায় নি কিন্তু আমি সেই জেদ মাথা থেকে কখনো ঝেড়ে ফেলতে পারি নি। অনেক অল্পের ভেতর দিয়ে আমি বেঁচে গেছি জানি। আমার বাবা মা এত সাবধান থেকেও আমার সাথে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর এই ঘটনাগুলোকে এড়াতে পারেন নি এবং ভয়ংকর ঘটনাগুলো উনাদের উপস্থিতিতেই ঘটেছে। আমি ভাবতে পারি না -অসাবধান মা-বাবার সন্তানদের তবে কেমন ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়!

আমার দুইজন কাজিন। তারা আমার থেকে বয়সে বেশ খানিকটা বড়। তাদের কত ছোক-ছোকানি যে দেখেছি, তাদের লোলুপ দৃষ্টি, ভালগার কথাবার্তা -সুযোগ পেলে তারা আমাকে ছেড়ে দিতো না নিশ্চয়ই। কিন্তু তারা সেই সুযোগ কখনো পায় নি মা বাবার এবং আমার সাবধানতার জন্য।

খুব অল্পের উপর দিয়ে আমি বেঁচে গেছি বলেই হয়তো কখনো ট্রমাটাইজড হই নি তবে অস্বস্তি বোধ তো ছিলোই, ভাবিয়েছে অনেক, স্মৃতিতে থেকে গেছে খুব প্রকট ভাবে। আমি খুব ডানপিটে এবং সাহসী ছোটবেলা থেকেই। কোনো মানুষকে কিংবা কোনো কিছুকেই ভয় পেতাম না, কথা বলতে সঙ্কোচ হতো না, অকারণে নিজেকে কোনো বিষয়ে দোষারোপ করি নি, অপরের অন্যায়ের দায়ে নিজেকে কখনো দায়ী করিনি। নিজের দোষ জানার এবং বুঝার এবং শুধরানোর চেষ্টা করে গেছি সবসময়। ট্রমাটাইজড হওয়ার মতো ভয়ংকর পরিস্থিতিতে আসলে পরিই নি হয়তো।

বিচ্ছিন্ন দুই দিনের দুইটা ঘটনা যার পুনরাবৃত্তি আর কখনোই ঘটেনি। এজন্যেই ট্রমাটাইজড না বরং অস্বস্তি এবং রাগ ক্ষোভ জন্মেছে, আরো বেশী সাবধান হয়েছি। আমার মা-বাবা আমাকে অনেক শক্তি এবং সাহস যুগিয়েছেন। এজন্যেই আজ আমি মানুষ হতে চেষ্টা করি এবং যেকোনো বিষয়কে সঠিক অর্থে বুঝার চেষ্টা করি। আম্মা আব্বার কাছে থেকে আমাদেরকে বলাই ছিলো, যেকোনো সুবিধা-অসুবিধা তাদের সাথে নিঃসঙ্কোচে নির্ভয়ে শেয়ার করার জন্য। আমাদের কথা উনারা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। আমাদেরকে অন্যায় করতে যেমন নিষেধ করতেন, ঠিক সেইভাবেই শিখিয়েছেন যেনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি, সাহস করে এগিয়ে যাই। 

আমার সন্তানদেরকে অনেক সাবধানে রাখি, আমার বাবা মা'র থেকে যেই অভয় ও শক্তি পেয়েছি সবসময় সেই অভয় ও শক্তি আমার বাচ্চাদেরকে দিতে চেষ্টা করি -জানিনা আমি শেষ পর্যন্ত আমার বাচ্চাদেরকে রক্ষা করতে পারবো কিনা তবে জ্ঞানত এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা থেকে আমার ছেলে মেয়েদেরকে রক্ষা করতে প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছি এবং করবো। 

সকল বাবা মা'র জন্য আমার এই অনুরোধ থাকবে যে সন্তানদেরকে সময় দিন, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন, বাচ্চাদেরকে সাবধানতা শেখান এবং নিজেরাও সাবধান থাকেন। কোন শিশু যেনো কোনো প্রকার নিপীড়নের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সকলের।


  • ৪৩৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শামীম আরা নীপা

এক্টিভিস্ট

ফেসবুকে আমরা