শান্তির দূত নাদিয়া শেষ পর্যন্ত হারেন নি

রবিবার, অক্টোবর ৭, ২০১৮ ৬:৩৬ PM | বিভাগ : আলোচিত


নাদিয়া মুরাদে এখন বিশ্ব তোলপাড়। সারা পৃথিবী তাকে অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসিয়ে দিচ্ছে। নোবেল শান্তি পুরস্কারে এ বছর নির্বাচিত করা হয়েছে তাকে। ইরাকের মেয়ে নাদিয়ার বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে তিনি একজন ‘ইয়াজিদি’ সম্প্রদায়ের মানুষ। এই পরিচয় তাকে ইসলামিক খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা আইএসের কাছে যৌনদাসী করে তুলেছিলো।

নাদিয়া খ্রিস্টান বা ইহুদী হলে যতখানি অত্যাচারিত হতো ইয়াজিদি হবার কারণে সেই মাত্রা বেড়ে গিয়েছিলো শতগুণ। কারণ ইসলাম ধর্মমতে ইয়াজিদিরা শয়তানের উপাসক। অমুসলিমদের দু’টিভাগে ইসলাম ভাগ করেছে। যাদের নবী ও কিতাব আছে তারা হলো আহলে কিতাবী, এদের ইসলাম জিজিয়া কর দিয়ে ইসলামের অধীনে বাঁচার অধিকার দিয়েছে। বাকীরা যারা অগ্নি, মূর্তি, শয়তানের উপাসনা করবে তাদের প্রতি বিন্দু পরিমাণ কোনো ছাড় নেই। তাদের পুরুষদের মরতে হবে মুসলমানদের হাতে। আর নারীদের হতে হবে হেরেমের যৌনদাসী।

নাদিয়ার কথা বলতে গেলে ইয়াজিদি ধর্ম সম্পর্কে একটু ধারণা দিতে হয়। ইহুদী মিথ আদম ও ঈভের কাহিনীর অন্য এক মোড় থেকে এই ধর্মের জন্ম বলা যেতে পারে। জিহোবা মানুষ বানানোর জন্য পৃথিবী থেকে মাটি নিযে আদমকে তৈরি করলেন। তারপর সমস্ত ফেরেস্তাকে নির্দেশ দিলেন আদমকে সেজদা দিতে। সবাই এ কথা মান্য করলেও প্রধান ফেরেস্তা সেজদা করতে অস্বীকৃতি জানালো। এরকম গল্প ইহুদী খ্রিস্টান ইসলামে বর্ণিত আছে। তাদের মতে এই অস্বীকৃতিতে ঈশ্বর ক্ষিপ্ত হয়ে ফেরেস্তাকে শয়তান বানিয়ে দিলেন আর সে হলো মানব জাতির চিরকালীন শত্রু।

ইয়াজিদি ধর্মটা গড়ে উঠেছে ঠিক উল্টো কাহিনীতে। ফেরেস্তা (যাকে ইয়াজিদিরা মেলেক তাউস নামে ডাকে) আদমকে সেজদা করতে অস্বীকৃতি জানাতে ঈশ্বর খুশি হলেন। কারণ মেলেক তাউস ঈশ্বরের অংশ। ঈশ্বরের নিজের জ্যোতি থেকে মেলেক তাউসকে সৃষ্টি করেছিলেন কাজেই ঈশ্বরের অংশ কিছুতে একটা মাটির তৈরি মানুষের কাছে মাথা নত করতে পারে না। তারপরও মেলেক তাউসকে চল্লিশ হাজার বছর ধরে কাঁদালেন কারণ আদেশ অমান্য করার অভিযোগ তুলে ঈশ্বর তাউসকে পরীক্ষা করছিলেন। পরীক্ষায় খুশি হয়ে এরপর ঈশ্বর মেলেক তাউসকে মানবজাতির জন্য এক পথ প্রদর্শক করে নিয়োগ দিলেন। আদম যখন বংশ বিস্তার করে পৃথিবী ভরিয়ে ফেললো তখন চরম বিশৃঙ্খলা পাপ অনাচারে ভরে গেলো। মেলেক তাউস মানবজাতির মুক্তি দিতে পৃথিবীতে আসলেন। তিনি নবীদের মতো করেই সত্য পথের কথা বলতে লাগলেন। ইয়াজিদিরা হলো সেই ‘সত্য পথে’ চলা এক ধর্মীয় সম্প্রদায়।

ইয়াজিদিদের এ কারণেই ইহুদী খ্রিস্টান ইসলাম- এই তিন ধর্মে শয়তানের উপাসক বলে থাকে।

অন্যরা মুখে বলে ঠাণ্ডা থাকলেও ইসলাম তলোয়ারের শক্তিতে বিশ্বাস করে। তাই নবী মুহাম্মদের ইসলামী খিলাফত চালু হবার পর হাজার বছর পর্যন্ত বিভিন্ন খলিফার শাসনে এই ইয়াজিদিরা কমবেশি দু:খ-কষ্টের সন্মুখীন হয়। তুরস্কে আর্মেনিয়ান খ্রিস্টানদের গণহত্যার সময় ইয়াজিদিরা খ্রিস্টানদের পাশে দাঁড়িয়েছিলো। ধর্মীয় দিক থেকে ইহুদী খ্রিস্টানদের সাথে তাদের নৈকট্য রয়েছে। নবী ইব্রাহিমকে ইয়াজিদিরাও নবী বলে এবং ইব্রাহিমের পুত্র কুরবানী দেয়ার ঘটনার স্মরণে তারাও কুরবানী দিয়ে থাকে। ইয়াজিদিরা দৈনিক ৫ বার প্রার্থনা করে। তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবের নাম ‘ঈদ আল জামা’। কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছে না? ভাববেন না তারা নকল করেছে। কারণ এই ইয়াজিদিদের ধর্মীয় ক্যালেন্ডারের বয়স ৬ হাজার বছর! ইয়াজিদিদের অস্তিত্ব এই সময়কালের প্রমাণ বিজ্ঞানীরাও পেয়েছেন।

নাদিয়ার কথা বলতে গিয়ে ইয়াজিদিদের বিস্তারিত বলার একটাই কারণ, আইএসের মতো অক্ষরে অক্ষরে কুরআন-হাদিস পালন করা দল ইয়াজিদিদের উপর চরম নিপীড়ন চালায় কারণ তারা ‘শয়তানের অনুসারী’। আপনি যদি ধর্ম বিশ্বাস করেন আর মুসলিম হয়ে থাকেন, নিরহ নির্বিবাদী শান্তিপ্রিয় একজন মানুষ- তবু ‘শয়তানের উপাসনা করে’ এটুকুতেই কি আপনার মনে ঘৃণা এনে দিচ্ছে না? আইএস সদস্যরা আপনার মতো কম জানা দুর্বল চিত্তের মুসলমান নয় তাই তারা ইয়াজিদি পুরুষদের প্রথম চান্সেই হত্যা করে তাদের নারীদের গণিমতের মাল করে নিজেদের মধ্যে বন্টন করে নেয়। তারপর অতিরিক্তদের নিলামে তুলে বিক্রি করে দেয়া হয় সৌদি কুয়েতের খাঁটি মুসলমানদের এজেন্টদের হাতে। নাদিয়া মুরাদ সেই হাজার হাজার ভাগ্যহত ইয়াজিদি নারীদের একজন যিনি আইএসদের হাতে গণিমতের মাল হয়েছিলেন। তাকে যে মুজাহিদ ভাগে পেয়েছিলো গণিমত হিসেবে সে একজন পাক্কা নামাজি জিহাদী মুজাহিদ। রীতিমত নামাজ পড়া শেষ করে তাকে বিছানায় টেনে নিতো। যেহেতু ডান হাতের অন্তর্ভূক্ত দাসীদের বিষয়ে মুমিনদের কোনো রূপ শংঙ্কচ দ্বিধা থাকার বালাই নেই, যেভাবে খুশি যৌন সুখ নিতে পারবে তাই এক ভয়াবহ নরক নেমে এসেছিলো নাদিয়ার জীবনে। একবার জীবনের সমস্ত আশা তার মরে গিয়েছিলো। ফের আবার নতুন করে বাঁচার আকুতি জন্মায়। চেষ্টা করে পালানোর। সুযোগ এসে যায় এবং পালাতে সক্ষম হয়। তারপর আন্তর্জাতিক সংস্থার হাত ধরে জার্মানিতে।

নাদিয়া জানে এখনো শত শত ইয়াজিদি খ্রিস্টান নারীরা আইএস মুজাহিদদের যৌনদাসী হয়ে আছে। ইসলামি খেলাফত যতদিন চলবে এই নারীদের ততদিন হেরেমখানায় মুজাহিদদের তৃপ্ত করে চলতে হবে। নাদিয়া মুরাদ সেই কথাই তার বইতে লিখেছেন। মানুষকে বার বার বাঁচার আশা দেখিয়েছেন। তিনি ধ্বংস হতে হতেও পরাজিত হন নি। এত কিছুর পরও শান্তির কথা শুনিয়েছেন। নাদিয়া শেষ পর্যন্ত হারে নি…


  • ১৫৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সুষুপ্ত পাঠক

বাংলা অন্তর্জালে পরিচিত "সুষুপ্ত পাঠক" একজন সমাজ সচেতন অনলাইন একটিভিস্ট ও ব্লগার।

ফেসবুকে আমরা