শীলা চক্রবর্তী

পেশায় আইনজীবী শীলা চক্রবর্তীর জন্ম খুলনায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক আর মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা শীলার নেশা রবীন্দ্র সঙ্গীত, ধ্রুপদী সঙ্গীত, কবিতা, অভিনয় এবং লেখালেখি। মঞ্চ নাটকেও তিনি নিয়মিত।

ডাইনিপ্রথা : এক জ্বলন্ত সমস‍্যার নাম

ডাইনিপ্রথা নামক ভয়াবহ কুসংস্কারের বিষে এখন‌ও জর্জরিত ভারতবর্ষের প্রত‍্যন্ত অঞ্চলগুলো  , বিশেষত আদিবাসী অধ‍্যুষিত অঞ্চল - যেখানে শিক্ষা স্বাস্থ‍্য বিজ্ঞানচেতনার আলো পৌঁছতে পারেনি এখন‌ও ঠিকঠাক । ডাইনিপ্রথা কেবল ভারতে নয় , বিশ্বের অনেক দেশ অঞ্চল বা সংস্কৃতিতে এখনো অস্তিত্বশীল । এখন‌ও ডাইনি অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে , গলা কেটে , গাছে বেঁধে খুঁচিয়ে , পিটিয়ে মেরে ফেলার ভুরি ভুরি উদাহরণ আমাদের সমাজে বিদ‍্যমান । অতীতের সতীদাহ প্রথা নামক কুপ্রথার মতোই , এই ডাইনিপ্রথার পেছনেও রয়েছে কদর্য সব কূট অভিসন্ধি , কোথাও অনাথ বিধবা অসহায় অশক্ত  নারীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সমাজের অপেক্ষাকৃত সবল অংশ দ্বারা অন‍্যায়ভাবে সেসব  ভোগদখল করার লালসা , কোথাও শরীর দখলের অভিসন্ধি প্রত‍্যাখ‍্যাত হলে তার প্রতিশোধ নেবার বাসনা , কোথাও জমিজায়গা ইত‍্যাদি নিয়ে গণ্ডগোল বা অন‍্যান‍্য বিষয়ে ঝামেলার বদলা , আবার অনেক ক্ষেত্রে স্রেফ কুসংস্কারের বশে অলৌকিক কালা জাদু ইত‍্যাদিতে বিশ্বাস করার ফল । আমরা আলো ঝলমল শহরের বিলাসী জীবনে সেসব ভাবতেও পারিনে , খবরের কাগজে মাঝেমাঝে দেখি শুধু ।


ডাইনিপ্রথার শিকার মূলত নারীরাই । ডাইনি শব্দটির ব‍্যঞ্জনা অতীতে আজকের মতো নঞর্থক ছিলোনা । ইংরেজির "Witch" শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ "Wicca" থেকে , যার অর্থ বুদ্ধিমতী নারী । অতীতে ইওরোপিয়ান সমাজে এই উইক্কারা হেলাফেলা বা অসম্মানের পাত্র তো ছিলেন‌ই না , বরং ছিলেন যথেষ্ট সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র । এই উইক্কারা ছিলেন মডার্ন পেগানিজম বা আধুনিক মূর্তিউপাসনার প্রবক্তা । সম্ভবত এখান থেকেই পিউরিটান প্রটেস্ট‍্যান্টদের চক্ষুশূল হন উইক্কারা । তাঁদের ধর্ম অবমাননাকারী , শয়তানের উপাসক তকমা দিয়ে অপরাধী সাব‍্যস্ত করে পুড়িয়ে বা ফাঁসি দিয়ে হত‍্যা করা শুরু হয় । উইক্কানরা ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী , তাঁরা প্রকৃতিকে নিজেদের ধর্ম বলতে ভালবাসতেন । Nature religion এর একটি ধারা হিসেবে এঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠা চেয়েছিলেন , যা ছিলো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক । এঁরা নানা ভেষজ ওষুধের গুণ জানতেন । ভিষগ হিসেবে কাজ‌ও করতেন , সাফল‍্য‌ও পেতেন ।  এইজন‍্যেই ম‍্যাজিক‍্যাল প্র‍্যাকটিসের ধারণাটি এঁদের নামের সাথে জুড়ে যায় যা পরে এঁদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব‍্যবহার করা হয় । এঁরা সংস্কৃতিমনা ছিলেন , নাচ গান সহ নানা গুণে গুণান্বিত ছিলেন তাঁরা । প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের নিয়মকানুন মেনে চলতে চাইতেননা এবং সমান্তরাল একটি ধর্ম অর্থাৎ natute religion প্রচলনের স্বপক্ষে ছিলেন বলেই গীর্জার রোষের মুখে পড়তে হয়েছিলো উইক্কানদের । এই বিরোধ বা বিদ্রোহের কারণেই Witch বা ডাইনি তকমা পান তাঁরা , যার জের চলে বহুকাল অবধি এবং আজ‌ও তা বিলুপ্ত হয়নি । প্রচলিত প্রথা বা অন‍্যায়ের বিরোধ করলেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে ডাইনি আখ‍্যা দিয়ে হত‍্যা করা হয়েছে অসংখ্য নারীকে । 


খ্রীস্টিয় সপ্তম শতকের শেষভাগ থেকে ইওরোপে ডাইনিপ্রথা নিষিদ্ধ করা হয় ।  সারা পৃথিবীর বহু দেশে ডাইনিবিদ‍্যাজনিত অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার এক জঘন‍্য ব‍্যাধি হিসেবে ছড়িয়ে গিয়েছে এবং এখন‌ও তা বিলুপ্ত হয়নি , এখন‌ও বর্তমান । ডাইনি শিকার প্রথা এতোটাই ব‍্যাপক রূপে ছড়িয়েছিলো যে এটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল - প্রাথমিক যুগ , মধ‍্যযুগ এবং আধুনিক যুগ । ১৪৮০ সাল থেকে ১৭০০ সালকে মোটামুটি প্রাথমিক যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় । ডাইনিবিদ‍্যা গুপ্তবিদ‍্যারূপে চর্চিত হয় এই গুজব ছড়িয়ে প্রাথমিকভাবে প্রচুর নারীকে সন্দেহের আওতায় আনা হয়েছিলো । ধর্মীয় মূল‍্যবোধ ডাইনিবিদ‍্যার চর্চা সমর্থন করেনা - প্রথমত এখান থেকেই ডাইনিবিদ‍্যা চর্চা নিষেধ এবং ডাইনিশিকার প্রথা শুরু হয় । প্রাথমিকভাবে গীর্জাগুলো সরাসরি ডাইনি বিচার প্রক্রিয়ায় যেতোনা , যদিও বিচার গীর্জার আদর্শেই  হতো । মানুষ প্রধানত কুসংস্কার দ্বারা আচ্ছন্ন ও ভীত হয়ে যুক্তিবোধরহিত হয়ে যায় , ফলে ডাকিনীবিদ‍্যা গুপ্তবিদ‍্যা সম্পর্কে আতঙ্ক কাজ করে । এইসব কারণেই ডাইনিশিকার প্রথা ব‍্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে । আফ্রিকায়‌ও কালা জাদু ইত‍্যাদির চল ছিলো যাকে আমরা ভুডু নামে জানি ।


পেডেরবর্ন গীর্জা সপ্তম শতকের শেষভাগে ডাইনিবিদ‍্যা নিষিদ্ধ করে । ১৩০০ শতকে  পোপ দ্বাদশ জন ডাকিনীবিদ‍্যা দমনমূলক নীতি প্রণয়ন করেন । সেই সময়কার ধর্মভিত্তিক সমাজ মনে করতো  মূলত নগ্ননৃত‍্য , বহুজন একত্রিত হয়ে যৌনতা / group sex , orgy sex , cannibalism বা নরমাংসভোজন ইত‍্যাদি আচরণের মাধ‍্যমে শয়তান বা ইভিলের সাহায‍্যে ডাকিনীবিদ‍্যার চর্চা করা হতো । দক্ষিণ পশ্চিম জার্মানিতে ডাইনি শিকার ১৫-১৬ শতকে ব‍্যাপক আকার ধারণ করেছিলো । সমগ্র ইওরোপে প্রায় বারো হাজার ডাইনি বিচারের ঘটনা ঘটেছিলো । এসব বিচার কোনো কোনো ক্ষেত্রে গণ আদালতেও সম্পন্ন হয়েছিলো । ডাইনি সন্দেহে কয়েক হাজার নারীকে  পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো । অষ্টাদশ শতকে এধরনের ঘটনা ঘটা কমতে থাকে ।


ডাইনিপ্রথা নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে আইন পাশ হয়েছে , তার অভিঘাত‌ও হয়েছে ভিন্নমুখী । ইংল‍্যাণ্ড , স্কটল‍্যাণ্ড , আয়ারল‍্যাণ্ড , ওয়েলস প্রভৃতি দেশ ডাইনিবিদ‍্যা চর্চার জন‍্য ধারাবাহিকভাবে  শাস্তিবিধান করেছে । ১৫৪২ সালে প্রণীত ডাইনিপ্রথা বিরোধী আইনে ডাইনিবিদ‍্যা চর্চাকে ঘোর অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয় । এই আইনে অপরাধ প্রমাণ হলে অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা থেকে মৃত‍্যুদণ্ড পর্যন্ত দেয়া হতো । ১৫৬৩ সালের ডাইনিপ্রথা বিরোধী আইনে যাবতীয় জাদুটোনা জাতীয় কার্যকলাপসহ ডাইনিপ্রথাকে নিষিদ্ধ আচরণের তালিকায় ফেলা হয় । দুটিই রাণী প্রথম এলিজাবেথের রাজত্বকালে ।  এই আইনটি তুলনামূলক কম নিষ্ঠুর বলে উল্লেখ করা হয় , এই আইন অনুযায়ী মৃত‍্যুদণ্ড কেবল তখন‌ই দেয়া হতো,  যখন বিচারকরা মনে করতেন ডাইনিবিদ‍্যার বা ব্ল‍্যাক ম‍্যাজিকের প্রয়োগের ফলে কারো কোন‌ও বাস্তবিক ক্ষতিসাধন হয়েছে । ১৬০৪  সালে প্রণীত আইন ডাইনিবিদ‍্যা চর্চায় অভিযুক্তদের বিচার ব্রিটিশ কমন ল এর আওতায় হ‌ওয়া সুনিশ্চিত করলো ।  এর আগে এধরনের বিচারগুলো হতো গীর্জার পাদ্রীদের তত্ত্বাবধানে । এই আইনে আরো বলা হলো , অভিযুক্তের অপরাধ যদি লঘু  হয় এবং "অপরাধ" প্রথমবার হয় , তাহলে তাকে মৃত‍্যুদণ্ড থেকে অব‍্যহতি দেয়া হবে । একবছরের কারাবাস দেয়া হবে তাকে । পুড়িয়ে মারার পরিবর্তে সর্বসমক্ষে ফাঁসি দেয়ার প্রথার ওপর জোর দেয়া হয় ।  ১৬৪৯ সালে প্রণীত আইন অনুযায়ী Witchcraft শব্দটির আওতা প্রশস্ত করা হয় । এই আইন অনুযায়ী পশু এবং মানুষরূপী শয়তানি আত্মাকে বশীভূত করাও ডাইনিবিদ‍্যার অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং শাস্তির আওতায় আনা হয় । এই নতুন আইনে ঈশ্বর ব‍্যতীত অন‍্য কারোর উপাসনা অর্থাৎ শয়তানের উপাসনাকে ধর্ম অবমাননা তথা ব্লাসফেমি বলে অভিহিত করা হয় এবং এধরনের কাজকে শাস্তিযোগ‍্য অপরাধ বলে ঘোষণা করা হয় । 


১৭৩৫ সালের ডাইনিপ্রথা বিরোধী আইনটি ছিলো চরিত্রের দিক থেকে পূর্বতন আইনগুলির সম্পূর্ণ বিপরীত । এই আইনে বলা হলো , এখন থেকে যে ব‍্যক্তি কারোর নামে ডাইনিবিদ‍্যা চর্চার অভিযোগ করবেন , অর্থাৎ যিনিই দাবি করবেন কোনো ব‍্যক্তির আত্মা টাত্মা ডেকে আনার বা লোকের ক্ষতি করার ক্ষমতা আছে ,  ভবিষ‍্যৎ বলে দেবার অথবা অলৌকিক উপায়ে  চুরি যাওয়া জিনিসপত্র খুঁজে দেয়ার ক্ষমতা আছে , সেই ব‍্যক্তিই অপরাধী হিসেবে গণ‍্য হবেন ,  জেল জরিমানার হকদার হবেন । এই আইন প্রযোজ‍্য হবে সমগ্র গ্রেটব্রিটেন জুড়ে , এতাবৎকালের এসংক্রান্ত সমস্ত অ্যাক্ট বা আইন বাতিল করে । অর্থাৎ ডাইনিবিদ‍্যা চর্চার অভিযোগে মৃত‍্যুদণ্ডের‌ও এখানেই ইতি ঘটলো ।  সময়টা প্রায় তিনশো বছর আগের , কুসংস্কারকে একটি তুড়িতে কার্যত উড়িয়ে দেয়ার আইন পাশ  হলো । একটি অন্ধকার অধ‍্যায়ের সমাপ্তিতে আইনি সীলমোহর পড়লো ।  ষোড়শ - সপ্তদশ শতকের ইওরোপে যে ধর্মীয় অস্থিরতার  পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিলো , তার ফলেই মূলত ডাইনিবিদ‍্যা চর্চার "অপরাধে"  মৃত‍্যুদণ্ড দেয়ার আইন পাশ হয়েছিলো বলে মনে করা হয় ।


ডাইনিশিকার পৃথিবীর ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ‍্যায় । মানুষ কীভাবে কুসংস্কারে , অশিক্ষায় , অন্ধবিশ্বাসে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতো বা থাকে , তার জ্বলন্ত উদাহরণ ডাইনিশিকারের ঘটনাগুলো । সারা পৃথিবীর মানুষের বিবেকবোধকে সজোরে ধরে নাড়িয়ে দিয়েছিলো যে ঘটনা , তার নাম SALEM WITCH TRIAL .....  যুক্তরাষ্ট্রের ম‍্যাসাচুসেটস প্রদেশে , ডেনভার শহরের অদূরে ছোট একটি গ্রাম সেলেম , ১৬৯২ সালে ডাইনিশিকারের নামে এক বীভৎস হত‍্যাযজ্ঞের সাক্ষী থেকেছিলো এখানকার মানুষ । সেবছরের গোড়ার দিকে সেলেম গ্রামের দুটি মেয়ে - বারো বছর বয়সী অ্যাবিগেল উইলিয়ামস এবং তার খুড়তুতো বোন বেটি প‍্যারিস , দুজন অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে । মৃগী রোগীর মতো আচরণ করতে থাকে তারা , কারণ ছাড়াই একা একা কথা বলা , হাত দুপাশে ছড়িয়ে ওড়ার চেষ্টা করা , ফায়ারপ্লেসের ভেতর ঢুকতে চেষ্টা করা , রান্নাঘরের চিমনি বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা , অকারণে চীৎকার চেঁচামেচি কান্নাকাটি করা , মেঝেতে গড়াগড়ি দেয়া ইত‍্যাদি । এর কিছুদিন পর‌ই ওই এক‌ইরকম অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে আরো ছয়টি মেয়ে । এই ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়ার পর গ্রামবাসীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন । বেটির বাবা শরণাপন্ন হন গ্রাম‍্য ডাক্তারের ‌ । "ডাক্তার" দেখেশুনে রায় দেন যে এদের ওপর কোনো অদৃশ‍্য শয়তানী শক্তি ভর করেছে । 


ষোড়শ শতকের শেষদিকের এই সময়টাতে সেলেম ছিলো ব্রিটিশ উপনিবেশের অংশ । এই অঞ্চলে প্রোটেস্ট‍্যান্টদের সংখ‍্যা ছিলো বেশি । এই প্রটেস্ট‍্যান্টরা ছিলো অতিমাত্রায় পিউরিটান । এরা মূলত প্রাচীনপন্থী ও হতাশাবাদী । এদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো , পাপের ফলেই মানুষের জন্ম হয় । অত‌এব ঈশ্বরের পাশাপাশি মানুষের ভেতরে শয়তানের অবস্থান এদের মতে অনিবার্য । তাই এরা সহজেই ডাক্তারের কথায় সায় দেন । ফলে বিপুল অংকের মানুষের সমর্থন পায় কথিত ওই ডাক্তারের সিদ্ধান্ত । এরপর ডেকে আনা হয় গ্রামের গুণিনকে । তার কাছে ওই মেয়েরা সবাই জানায় ,  গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধা হলেন ডাইনি আর তাদের তুকতাকের ফলেই  মেয়েগুলোর এই অবস্থা । দুই বোন অ্যাবিগেল আর বেটি সরাসরি গ্রামের  তিনজন বৃদ্ধাকে ডাইনি বলে আঙুল তোলে , লক্ষ‍্যণীয় , এরা সবাই ছিলেন সমাজের নীচুতলার , অপেক্ষাকৃত দুর্বল শ্রেণীর নারী । টিটুবা নামের বৃদ্ধাটি ছিলেন ক্রীতদাস , সারাহ্ গুড ছিলেন গৃহহীন ভিখারি এবং সারাহ্ অসবোর্ন - যার সাথে গ্রামের কয়েকজনের সম্পত্তি নিয়ে গোলমাল লেগেই ছিলো , এছাড়াও তাঁর বিবাহিত ও ব‍্যক্তিগত জীবন নিয়েও ছিলো নানা ধরনের কেচ্ছা । তো গ্রামবাসীরা সহজেই মেনে নিলেন এই আরোপ । অত‌এব সাক্ষ‍্যের ভিত্তিতে ধরে আনা হলো তিন নারীকে । শুরু হলো বিচারের তোড়জোড় । 


ম‍্যাজিস্ট্রেট জোনাথন কর‌উইন এবং জন হ‍্যাথর্নের বিচারালয়ে তিন অভিযুক্ত‌ই প্রথমে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করলেন ‌। কিন্তু পরে টিটুবা তাঁর জবানবন্দী পরিবর্তন করেন এবং বলেন যে দুজন পুরুষ শয়তানের দ্বারা তিনি প্রভাবিত , তাদের কথাতেই কিশোরীদের ওপর জাদুটোনা করেছেন । তিনি গ্রামের আরো কিছু মানুষের নাম বলেন , যারা নাকি শয়তানের অনুচর এবং তার সহ-অপরাধী । এই স্বীকারোক্তির পর সেলেমের পরিবেশ পরিস্থিতি ভয়াবহ অশান্ত রূপ ধারণ করলো । সবাই সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখতে লাগলো । এরপর যখন মার্থা ক‍্যুরি নামে গীর্জার এক নানকে ডাইনি অভিযোগে গ্রেফতার করা হলো , সেলেমের পরিবেশে অস্থিরতা দ্বিগুণ বেড়ে গেলো । শয়তানের কথিত অনুচর বলে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছিলো তাদের সবাইকেই ধরে এনে কারারুদ্ধ করা হলো । সব মিলিয়ে প্রায় ২০০ জন নারীকে ধরে আনা হয় ডাইনি সন্দেহে ,এর মধ‍্যে সারাহ্ অসবোর্নের চার বছরের শিশুকন‍্যাও ছিলো ‌। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিলো যে মানুষ বেড়াল কুকুর দেখলেও ছদ্মবেশি ডাইনি ভাবতে শুরু করেছিলো । সন্ধ‍্যের পর ডাইনির ভয়ে ঘরের বাইরে বেরোনো কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিলো তারা । এক তীব্র আতঙ্ক গ্রাস করেছিলো সমগ্র সেলেমকে । 


মোট ৩৪ জনকে ডাইনি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয় । অধিকাংশ‌ই ছিলেন নারী । জুলাই , অগাস্ট , সেপ্টেম্বর - এই তিন মাসে ধাপে ধাপে ১৮ জনকে ফাঁসি দেয়া হয় । ইতোমধ‍্যেই সাতজন বন্দীর মৃত‍্যু ঘটে । মূল সাক্ষী টিটুবাকে ছেড়ে দেয়া হয় , শর্ত এটাই ছিলো । স্বীকার করলে মুক্তি , অস্বীকার করলে সর্বসমক্ষে ফাঁসি । দুটি কুকুরকেও হত‍্যা করা হয় ডাইনিবিদ‍্যা চর্চায় সহযোগিতার অভিযোগে । এই ঘটনার পর সেলেম ক্রমে জনবিরল হতে শুরু করে । অনেকেই অন‍্যত্র চলে যান । এরপর বেশি সময় লাগেনি প্রশাসনিক কর্তাদের বোধোদয় হতে । গভর্ণর উইলিয়াম ফিলিপ প্রকাশ‍্যে ক্ষমা চান । শুধুমাত্র ভিত্তিহীন অন্ধবিশ্বাসে ভর করে এতোগুলো মানুষের অহেতুক প্রাণদণ্ড মানুষের সভ‍্যতার ওপর এক চরম কুঠারাঘাত হয়ে র‌ইলো । পরবর্তীতে অনুসন্ধানের ফলে দেখা গেলো , রাই জাতীয় শস‍্যের মধ‍্যে জন্মানো "Ergot" নামে একধরণের ফাঙ্গাস ওই মেয়েদের অমন অস্বাভাবিক আচরণের জন‍্য দায়ী । গবেষণায় দেখা যায় যে এই ফাঙ্গাস আক্রান্ত শস‍্য খেলে মানুষের ওপর তার প্রভাব হয় ড্রাগের মতো , যার ফলে মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে , যেটাকে গ্রামবাসীরা ডাইনির তুকতাক বলে বিশ্বাস করেছিলেন । টিটুবা যেহেতু ক্রীতদাস ছিলেন , তাঁর ওপর হওয়া  অত‍্যাচারের প্রতিশোধ নিতেই তিনি অত‍্যাচারীদের তার সহচর বা শয়তানের অনুচর বলে দাগিয়ে দেন , যার পরিণতি হয় মারাত্মক । ডাইনি অপবাদে বহু জীবন চলে যায়। ম‍্যাসাচুসেটসের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ক্ষমা প্রার্থনা করে নিহতদের নাম আদালতকক্ষে এনগ্রেভ করানোর নির্দেশ দেন এবং প্রত‍্যেকের পরিবারকে ৬০০ ইউরো করে ক্ষতিপূরণ দেবার নির্দেশ দেন ।  সেলেম উইচ ট্রায়ালের সাক্ষী হিসেবে আজ‍‌ও রয়ে গিয়েছে কথিত সেই ডাইনিদের বাড়িটি । এখন‌ও মানুষ সেখানে যান বাড়িটি দেখতে । সেখানে একটি জাদুঘর হয়েছে । যেখানে বিচার হয়েছিলো সেটি হয়েছে উইচ ট্রায়াল মেমোরিয়াল পার্ক । অন্ধবিশ্বাস আর অহেতুক আতঙ্কের ফল কতো মারাত্মক হতে পারে , তার জ্বাজ্বল‍্যমান নিদর্শন হয়ে আছে সেলেম ।


ভারতীয় সংস্কৃতিতে ডাইনি শব্দটির উৎপত্তি ডাকিনী থেকে । মহাদেবের বিভিন্ন অনুচরদের মধ‍্যে ডাক অন‍্যতম , এই ডাকের স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দ‌ই ডাকিনী ,  ডাকিনীর অপভ্রংশ ডাইনি । কথিত আছে ডাক একধরণের পিশাচ । তন্ত্রবিদ‍্যার সাথে ডাকিনীবিদ‍্যার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গী । ভারতীয় উপমহাদেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন বাতাবরণে তুকতাক , বাণমারা, বশীকরণ ইত‍্যাদি অন্ধবিশ্বাসের রমরমার কারণে ডাইনিবিদ‍্যা বিপুল অংকের মানুষের কাছে বেশ নির্ভরযোগ্য । 


মূলত আদিবাসী অধ‍্যুষিত সমাজ , যেখানে এখন‌ও শিক্ষার আলো , বিজ্ঞান চেতনার আলো পৌঁছয়নি , সেইসব অঞ্চলগুলোতেই ডাইনিপ্রথা এবং ডাইনিশিকার এখন‌ও চলে আসছে । National Crime Bureau এর রেকর্ড অনুযায়ী , ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ‍্যে এদেশে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে হত‍্যা করা হয়েছে যার অধিকাংশ‌ই নারী , বলাবাহুল্য । তবে বাস্তব সংখ‍্যাটা আরো বেশি কারণ এসব হত‍্যাকাণ্ডের বেশিরভাগের‌ই অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়নি । আমাদের দেশে আজ‌ও ডাইনিশিকারের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই । তাছাড়া সাধারণত এসব হত‍্যাকাণ্ড ঘটানো হয় দলবদ্ধভাবে , তাই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের জন‍্য প্রমাণ জোটানোও কঠিন হয়ে পড়ে । আর এসবের সুযোগ নিয়ে সমাজের একশ্রেণীর লোক অত‍্যাচার করে চলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শ্রেণীর মানুষ, বিশেষত নারীর ওপর । 


ডাইনি অপবাদ দেয়া বা হত‍্যা করার জন‍্য অনেকক্ষেত্রে  ঘটনা ঘটানো হয় সুপরিকল্পিত ভাবে । সাধারণত সহায় সম্বলহীন দরিদ্র যুবতী বা বৃদ্ধারা এর শিকার হন । অর্থনীতিবীদদের মতে ,  মহামারী বা আর্থ সামাজিক অস্থিতাবস্থার সাথেও এর সম্পর্ক রয়েছে । খ্রীষ্টপূর্ব ৩৩১ -এ রোমে মহামারী দেখা দেওয়ায় মহামারীর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে ১৭০ জন নারীকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে হত‍্যা করা হয় । ভারতেও অনুরূপ ঘটনা ঘটানো হয় যা নিষ্ঠুরতায় ইওরোপকে পেছনে ফেলে দেয় । বিহার , রাজস্থান , ঝাড়খণ্ড , আসাম , ছত্রিশগড় , উত্তর প্রদেশ , মধ‍্যপ্রদেশ , অন্ধ্রপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায় ।


ন‍্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব‍্যুরোর তথ‍্য অনুযায়ী , ২০১৬- ১৭ সালে উড়িষ‍্যায় ৯৯ টি এবং রাজস্থানে ১২৭ টি ডাইনি হত‍্যার অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছে । ২০২০ সালে উড়িষ‍্যায় এক গুণিনের  নিদানে এক মহিলাকে ডাইনি অপবাদে ত্রিশূল দিয়ে খুঁচিয়ে হত‍্যা করা হয়। ছত্তিশগড়ে ২০০১ থেকে ২০১৩ সালের মধ‍্যে ডাইনি অপবাদ দিয়ে বিচার হয় ১৫০০ জনের ,  হত‍্যা করা হয় ২১০ জনকে । ২০২০ সালেও ছত্তিশগড়ে ২২ জনকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে হত‍্যা করা হয় । ২০০২ সালে আসামে ডাইনি অপবাদে হত‍্যা করা হয় ১৩০ জনকে ,যার অধিকাংশ‌ই নারী । ২০১৯ সালে আসামে চারজন নাবালককে ডাইনি  অপবাদ দিয়ে বলি দেবার জন‍্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো , পুলিশ শেষমুহূর্তের তৎপরতায় তাদের উদ্ধার করে ।  ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে ২০১০ সালে ২৫০ জনের মতো নারীকে ডাইনি অপবাদে হত‍্যা করা হয় । ২০১২- ১৩ সালে ২৭০ জন নারীকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে লাঠিপেটা করে , চাবুক মেরে , পাথর ছুঁড়ে হত‍্যা করা হয় । ঝাড়খণ্ডে ডাইনি অপবাদ দিয়ে হত‍্যা এবং নির্যাতনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি । ২০১৫ সালে ৩২ জন মহিলাকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে খুন করা হয়েছে । ২০০১ থেকে ২০১৯ সালের মধ‍্যে মোট ৫৭৫ জন নারীকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে , মারধর করা হয়েছে । ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসেও ঝাড়খণ্ডে এক ৬৫ বছরের বৃদ্ধাকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে মারা হয়েছে । বলাবাহুল‍্য সব অত‍্যাচারের ঘটনা অভিযোগ আকারে লিপিবদ্ধ হয়না, বাস্তব সংখ‍্যাটা তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি । 


ডাইনিপ্রথা নামক কুসংস্কারের প্রধান শিকার নারীরা , আবার নারীরা‌ও ডাইনি সন্দেহে নারীর হেনস্থায় জড়িয়ে থাকার মতো ন‍্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে । ২০১৪ সালে আসামে ৬৩ বছরের বৃদ্ধা পনি ওরাংকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে খুন করা হয় । গ্রামের কিছু লোক অসুস্থ হয়ে পড়লে গ্রামের ওঝা নিদান দেন যে পনি ওরাং ডাইনি এবং তাঁর কুদৃষ্টিতেই লোকজন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন । এরপর এক মধ‍্যরাত্রে গ্রামের প্রায় শদেড়েক লোক মিলে পনি ওরাংয়ের বাড়িতে চড়াও হয়ে তাঁকে মারধর করে , এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে পনিকে খুন করা হয় । এই হত‍্যাকাণ্ডের অভিযোগে মোট ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয় ,যার মধ‍্যে নজন ছিলেন নারী । 


২০১৪ সালে এক নভেম্বরের দুপুরে দলবদ্ধ আক্রমণ হয় রাজস্থানের বাসিন্দা মধ‍্য চল্লিশের কেশী চন্দনার ওপর । আক্রমণকারীদের দলের মধ‍্যে ছিলেন চন্দনার কিছু আত্মীয়‌ও । চীৎকার করে তারা চন্দনাকে ডাইনি বলে ডাকতে থাকে ।  ঘিরে ধরে মারতে মারতে নগ্ন করা হয় তাঁকে । এরপর জুতোর মালা পরিয়ে , গাধার পিঠে বসিয়ে মাথায় ভারি পাথর চাপিয়ে পুরো গ্রাম ঘোরানো হয় । এরপর সর্বসমক্ষে পুড়িয়ে মারার আগমুহূর্তে পুলিশ খবর পেয়ে চলে আসে এবং উদ্ধার করে চন্দনাকে । কেন চন্দনার ওপর ওভাবে আক্রমণ করা হলো , তার কোনো উত্তর অবশ‍্য পাওয়া যায়নি গ্রামবাসীদের কাছে । 


২০১৫ সালের আগস্ট মাসে ঝাড়খণ্ডের এক আদিবাসী গ্রামে  একটি ছেলে জণ্ডিসে মারা যায় । গ্রামের ওঝা ওই গ্রামের পাঁচজন নারীকে ডাইনি বলে দাগিয়ে দেন , বলেন ছেলেটিকে ওই পাঁচজন‌ই খেয়েছে । এরপর গ্রামের লোক ক্ষিপ্ত হয়ে ওই পাঁচজনকে তাদের ঘরে ঢুকে চুলের মুঠি ধরে ধরে বাইরে বের করে এনে নগ্ন করে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ও টাঙ্গি দিয়ে কুপিয়ে খুন করে ।


প্রত‍্যন্ত গ্রামগুলিতে যেকোনো সমস‍্যা হলেই  নারীদের দায়ী করা হয় - দুর্ভিক্ষ বন‍্যা খরাই হোক বা ভূমিকম্প অথবা কুয়োয় জল শুকিয়ে যাওয়া , সবকিছুর সহজ সমাধান মেয়েদের ডাইনি বলে দাগিয়ে দেয়া । কেউ  অসুস্থ হলে , দীর্ঘদিন দুরারোগ‍্য ব‍্যাধিতে ভুগলে , মারা গেলে , কারো দীর্ঘদিন সন্তান না হলে ,  কারো গর্ভস্থ ভ্রূণ নষ্ট হয়ে গেলে , দুর্ঘটনায় জখম হলে , এমনকী একটা গাছ‌ও যদি  শুকিয়ে মারা যায় , ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয় , পশুপাখি মারা যায় , তার পেছনেও কোনো নারীকে দায়ী করে ডাইনি অপবাদ দিয়ে দেবার ঘটনা ঘটে । জনজাতিপ্রধান প্রত‍্যন্ত গ্রামগুলোতে আইন আদালতের হাত প্রায় পৌঁছয়না বললেই চলে । এসব জায়গায় সালিসি সভা বসিয়ে  অথবা গ্রাম‍্য ওঝা , গুণিন , বৈদ‍্য বা জানগুরু দ্বারা নিদান হেঁকে মেয়েদের ডাইনি বলে চিহ্নিত করা হয় । চলে অকথ‍্য অত‍্যাচার , শোষণ , এমনকী হত‍্যা । দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে , ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে , শিরশ্ছেদ করে , ফাঁসিতে ঝুলিয়ে , জীবন্ত পুড়িয়ে হত‍্যা করার প্রচুর উদাহরণ রয়েছে ।  এছাড়াও রয়েছে জরিমানা করা । টাকাপয়সা , ক্ষেতের ফসল , জমিজায়গা বা অন‍্যান‍্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা । এসব‌ও ইওরোপীয় ডাইনিশিকারের আদলেই চলে আসছে । রয়েছে ভিক্টিমকে গণধর্ষণের‌ও নিদান দেয়ার উদাহরণ । রয়েছে নগ্ন করে গ্রাম ঘোরানোর উদাহরণ ।  রয়েছে সামাজিকভাবে বয়কট বা একঘরে করে দেয়ার উদাহরণ । এমন সব আচরণ এদের সাথে করা হয় তা জানলে বিস্মিত হ‌ওয়াও ভুলে যেতে হয় । বাংলায় ভূত ছাড়ানোর কুসংস্কারের মতোই এদের ঝাঁটাপেটা জুতোপেটা করা , বাঁশ বা লাঠি দিয়ে পেটানো , বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো , জুতোর মালা পরানো , নাকখত দেয়ানো , চুল কেটে মুখে কালি মাখিয়ে দেয়া,  নাকেমুখে শুকনোলংকা পুড়িয়ে ধোঁয়া দেয়া , বলপূর্বক মানুষের ও শূকরের বিষ্ঠাসহ নানা অখাদ‍্য কুখাদ‍্য খাওয়ানো ইত্যাদি অমানুষিক ব‍্যবহার করা হয় । এই জরিমানার টাকা দিতে না পারলে ভিটেমাটি কেড়ে নেয়া থেকে শুরু করে গ্রাম থেকে সমূলে উচ্ছেদ করে তাড়িয়ে দেয়ার উদাহরণ প্রচুর । এইজাতীয় জরিমানার টাকা থেকেই গ্রামের মাতব্বরদের একটা বিশাল অংকের টাকা আয় হয় বলে জানা যায় । এই টাকায় গ্রামের মাতব্বররা অনেকক্ষেত্রে ভোজ‌ও খেয়ে থাকেন । 


ডাইনিপ্রথা  অনেকক্ষেত্রেই গ্রামীণ নারী নির্যাতনের একটি কার্যকর হাতিয়ার । পারিবারিক বা ব‍্যক্তিগত হিংসের বলিও হতে হতো অনেক নারীকে ,ডাইনি অপবাদ মাথায় নিয়ে , এগুলো বহু প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় সংস্কৃতিতে বিদ‍্যমান ছিলো । কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্ত্তীর  চণ্ডীমঙ্গল কাব‍্যে ধনপতি সদাগরের প্রথম স্ত্রী লহনা তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী খুল্লনা সম্পর্কে স্বামীকে বলছেন , " তোমার মোহিনীবালা , শিখয়ে ডাইনিকলা , নিত‍্য পূজে ডাকিনীদেবতা" । অর্থাৎ অপছন্দের নারীটিকে ডাইনি বলে দাগিয়ে দেয়ার প্রচলন অনায়াস ছিলো । ডাইনিপ্রথার মতো কুসংস্কারে বিশ্বাসীরা মনে করেন , অপদেবতা শয়তান ভূতপ্রেতের আরাধনা করে তাদের বশে এনে মানুষ অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন এবং ওই ক্ষমতার বলে লোকের উপকার অপকার দুইই করতে পারেন । মানুষের নিজস্ব সত্ত্বা গ্রাস করে তাকে বশ করা বা তার চেতনাকে গ্রাস করে নিতে পারেন । এই বিশ্বাস থেকে শত্রুপক্ষের ক্ষতি করতে ডান বা তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতাধরদের লেলিয়ে দেয়া বা নিয়োগ করার মতো ঘটনাও প্রচুর পরিমাণে ঘটে থাকে । এমন‌ও ঘটে , কোনো নারীকে ডাইনি বলে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা করলে তাকে মাদকজাতীয় কিছু বা বিষাক্ত  শেকড়বাকড় জোর করে খাইয়ে তাকে অসুস্থ ও তন্দ্রাচ্ছন্ন করে ফেলা হয় , তার বাহ‍্যজ্ঞান লুপ্তপ্রায় হয়ে যায় , তখন তাকে দিয়ে ইচ্ছেমতো অসংলগ্ন কথাবার্তা বলিয়ে নেয়া হয় যাতে তাকে ডাইনি বলে চিহ্নিত করার পথ নিষ্কন্টক হয় ।


এর পেছনে কারণ হিসেবে বিভিন্ন বিষয় থাকে । কখনো ব‍্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা , পারিবারিক হিংসা ,  প্রেমপ্রস্তাব বা যৌনপ্রস্তাব দিয়ে ব‍্যর্থ হ‌ওয়া , সম্পত্তি দখল করবার চাল । যদি কোনো নারীর মানসিক স্বাস্থ‍্য বিঘ্নিত হয়, অথবা কোনোরকম hormonal imbalance এর ফলে সে কোনো অস্বাভাবিক আচরণ করে , সেক্ষেত্রেও তাকে ডাইনি আখ‍্যা দিয়ে দাগিয়ে দেয়া হয় ।   এছাড়াও দেখা যায় তথাকথিত নীচুজাত বা সম্প্রদায়ের মানুষকে তাঁবে রাখতে উচ্চবর্ণের লোকেরা এই অস্ত্রটি ব‍্যবহার করেন । অর্থনৈতিক ভাবে যারা নীচুতলায় বিরাজ করেন তাঁদের ক্ষেত্রেও এক‌ই কথা খাটে । এমনকী ভিন্ন রাজনৈতিক মতের অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষকে ঘায়ের করার অস্ত্র হিসেবেও তাকে ডাইনি বলে দাগিয়ে দেয়া হয় । এছাড়া সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি , নিয়মকানুন যদি কোনো মেয়ে মানতে না চায় বা প্রতিবাদ করে , বিদ্রোহ করে , শক্তিমানদের অসুবিধে বা স্বার্থহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায় ,  তাকে দাগিয়ে দেয়া হয় ডাইনি বলে । চাবুক মেরে ,  ফাঁসি দিয়ে বা পুড়িয়ে মেরে সমাজের অন‍্যান‍্য অবাধ‍্য মেয়েদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয় ।  


প্রসঙ্গত ফ্রান্সের অগ্নিকন‍্যা জোয়ান বা জোন অফ আর্কের সাথে ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছিলো ‌। জোন ফরাসী সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে ইংরেজ সেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত করে একের পর এক জয় এনে দেন দেশকে , দেশের স্বাধীনতার কারিগর হয়ে ওঠেন । ইংরেজরা এরপর ছলাকলার আশ্রয় নিয়ে জোনকে আটক করেন । জোনের সাজানো বিচারসভা বসে , বিচারক ইংরেজ চার্চের পাদ্রী । সেই বিচার নামক প্রহসনে জোনের আচ‍রণকে ধর্মমত বিরোধী আখ‍্যা দিয়ে তাঁকে ডাইনি সাব‍্যস্ত  করে তারপর জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় । সালটা ছিলো ১৪৩১ , এইসময়ে ইওরোপ জুড়ে ডাইনি অপবাদ দিয়ে একের পর এক নারীহত‍্যা চলছিলো ।


ঝাড়খণ্ডের ছুটনি মাহাতো এবং আসামের বীরুবালা রাভার নাম ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে । এঁরা দুজনেই একসময়ে ডাইনি অপবাদের শিকার হয়েছিলেন । এই জঘন‍্য প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে মোট ৩২৫ জন ডাইনি অপবাদে  নির্যাতিতকে বাঁচিয়ে উদ্ধার করেছেন দুজন । ছুটনি ১২৫ জন এবং বীরুবালা ২০০ জনকে । ২০২১ সালে দুজনেই ভূষিত হয়েছেন ভারত সরকারের পদ্মশ্রী সম্মানে । 


ঝাড়খণ্ডের ভূমিকন‍্যা  ছুটনি গণধর্ষণের শিকার হতে হতে বেঁচেছেন , নির্মমভাবে নিহত হতে হতে বেঁচেছেন , এই জঘন‍্য প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন ১২৫ জনকে যাদের জুটেছিলো তাঁর মতোই ডাইনি অপবাদ । আজ ৬২ বছরের ছুটনি দায়িত্ব নিয়েছেন রোজ ১৫ - ২০ জন নারীর ভরণপোষণের , যারা ডাইনি অপবাদে সমাজ সংসার দ্বারা পরিত‍্যক্ত । ঝাড়খণ্ডের সরাইকেল্লার এক গ্রামের ভূমিকন‍্যা ছুটনি , ১৯৭৮ সালে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াকালীন‌ই বিয়ে হয়ে যায় তাঁর । ১৯৯৫ সালে প্রতিবেশি একটি মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে ছুটনিকে কালা জাদু এবং মন্ত্রতন্ত্র চর্চার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় গ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে । বাড়িতে চড়াও হয়ে মারধর করা হয় ছুটনিকে , পঞ্চায়েতের তরফে হাঁকা হয় জরিমানা ,  গণধর্ষণের চেষ্টা করা হয় । এর কিছুদিন পর ছুটনিকে তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মারার চেষ্টাও করা হয় । কোনোমতে নিজেকে বাঁচিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান ছুটনি । স্থানীয় বিধায়কের কাছে সাহায‍্য চেয়েও মেলেনি সাড়া । পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে গেলে দশহাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয় । এ অবস্থায় ছুটনিকে সাহায‍্য করতে  এগিয়ে আসেন সরাইকেল্লার এসডিও নিধি খারে । জামশেদপুরের একটি এনজিওর আইনি সেলে সহায়তার জন‍্য পাঠানো হয় ছুটনিকে । এরপর ডাইনি প্রথার বিরুদ্ধে সচেতনতার লড়াইয়ে সরাসরি শামিল হলেন ছুটনি । গড়ে তোলেন ডাইনিপ্রথা বিরোধী সচেতনতা কেন্দ্র । ডাইনির ধারণাটি যে একটি কুসংস্কার মাত্র , বাস্তবে এর কোনো  অস্তিত্ব নেই , এই বার্তা প্রচার করাকেই লড়াইয়ের হাতিয়ার করে তোলেন ছুটনি মাহাতো । তাঁর সংগ্রাম নিয়ে ১৯৯৬ সালে একটি তথ‍্যচিত্র তৈরি হয় । তাঁর জীবনকাহিনীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে দুটি চলচ্চিত্র - "অউর কব তক" এবং "কালা সচ্ - The Black Truth".


আসামের ৭২ বছর বয়সী বীরুবালা রাভার কাহিনীও অনেকটা এরকম‌ই । আসাম মেঘালয় সীমান্তবর্তী  এক গ্রামের মেয়ে বীরুবালার বিয়ে হয় পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময়েই । একের পর এক প্রতিবেশির মৃত‍্যুর জন‍্য বীরুবালাকে ডাইনি সাব‍্যস্ত করে গ্রামবাসী । পঞ্চায়েত চাপায় মোটা জরিমানা । এখানেই শেষ নয় , একঘরে করা হয় বীরুবালাকে । বহু অত‍্যাচার সহ‍্য করেও ভেঙে পড়েননি বীরুবালা , জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজের চেষ্টায় একটি ডাইনিপ্রথা বিরোধী মিশন গঠন করেছেন , কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন , ডাইনি অপবাদে আক্রান্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন , তাঁদের উদ্ধার করেছেন । সাথে রয়েছেন সহযোগীরা । এক দশক আগেও যেখানে আসামে গড়ে প্রতি বছর ১০-১৫ জনকে হত‍্যা করা হতো ডাইনি অপবাদ দিয়ে , সেই সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে বীরুবালার এই মিশনের কারণে । বর্তমানে ৬০০ সদস‍্য কাজ করছেন এই মিশনে ,  এঁদের সাহায‍্যে ২০০ মানুষকে বাঁচিয়েছেন বীরুবালা ,যাঁরা তাঁর মতোই ডাইনি অপবাদের শিকার হয়েছিলেন । 


অত‍্যাচারিত হয়েও , ডাইনি অপবাদের শিকার হয়েও যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কাজ করে পদ্মশ্রী সম্মান ছিনিয়ে নিয়েছেন এই দুই  সাহসিকা , তাতে তাঁদের জীবন এক উদাহরণ হয়ে থাকবে ।


এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে , ঝাড়খণ্ডের উপজাতি তরুণীর চোখের সামনে তাঁর শৈশবে তাঁর ঠাকুমাকে ডাইনি অপবাদ দেয়া হয় । ক্ষিপ্ত উন্মত্ত গ্রামবাসী , যার মধ‍্যে তাঁর আত্মীয়রাও ছিলেন , ওই নারীকে ঘর থেকে টেনে বের করে নগ্ন করে জোর করে বিষ্ঠা খাওয়ায় । এরপর তাঁকে পিটিয়ে খুন করা হয় পরিবারের লোকজনের সামনেই । বয়স বাড়ার সাথে সাথে শৈশবের সেই  ঘটনার অভিঘাত সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠে তরুণী উপলব্ধি করেন , এই কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়তে হবে , এটাই একমাত্র পথ । আত্মবিশ্বাসী তরুণী এখন ঝাড়খণ্ডের প্রত‍্যন্ত গ্রামগুলিতে গিয়ে কুসংস্কার বিরোধী প্রচার চালাচ্ছেন । একশ্রেণীর অসাধু ব‍্যক্তি যে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন‍্যেই এই ডাইনিপ্রথা নামক অন্ধবিশ্বাসে ইন্ধন জোগাচ্ছে এই কথা প্রচার করে সচেতনতা অভিযানে শামিল হচ্ছেন । সহায় সম্পত্তি হাতানো , যৌনশোষণ ইত‍্যাদি ডাইনি অপবাদ দেয়ার পেছনের  কারণগুলোও জনমানসে তুলে ধরছেন । আসামের ডাইনিশিকারে দোষী প্রমাণিত ব‍্যক্তিদের শাস্তির দাবিতেও সরব হয়েছেন তরুণী , শামিল হয়েছেন আন্দোলনে । ছুটনি বীরুবালাদের ব‍্যাটন হাতে , আলোর মশাল হাতে ছুটে চলেছেন এই তরুণীরাও । এই আলোর মালা ভারতবর্ষের আত্মার গভীর থেকে অন্ধবিশ্বাসের অন্ধকারের শেকড় উপড়ে ফেলবেই , এই প্রত‍্যয়েই নতুন দিনের ভারতবর্ষ প্রত‍্যয়ী ।


ডাইনিপ্রথা একটি সভ‍্য দেশ ও জাতির অগ্রগতির পথে অন্তরায় । এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও  আমাদের দেশে এই জঘন‍্য কুসংস্কারের চর্চা হয় ,ডাইনি অপবাদে মানুষ নির্যাতনের শিকার হন , তাঁদের হত‍্যা করা হয় , একথা আমাদের পক্ষে অত‍্যন্ত লজ্জাজনক । অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল ভালোভাবে পৌঁছয়নি দেশের প্রত‍্যন্ত অঞ্চলে , পৌঁছয়নি শিক্ষার আলো , বিজ্ঞানচেতনার আশীর্বাদ । পিতৃতন্ত্রের  কূটচাল , লিঙ্গবৈষম‍্য , পশ্চাদপসারী ধ‍্যানধারণার সাথে যুক্ত হয়েছে দারিদ্র‍্য , সামাজিক সচেতনতার অভাব , পুলিশ প্রশাসন ও সরকারের উপেক্ষা নির্লিপ্তি নিষ্ক্রিয়তা ।  অনেক অঞ্চলেই আইনের শাসন বলে কিছু নেই , ন‍্যূনতম শিক্ষা পরিকাঠামো নেই  , গুণিন জানগুরু শেকড় বাকড় ছাড়া ন‍্যূনতম চিকিৎসা পরিকাঠামো নেই । সব মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যা আমরা শহরের  পরিবেশে বসে চিন্তাও করতে পারিনা ।


সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী , আইন বিশেষজ্ঞ ইন্দিরা জয়সিংহ ডয়েচে ভেলেকে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বলেন ,  ভারতে এখনো ডাইনিশিকারের মতো ঘটনা ঘটে চলেছে , এর কারণ অজ্ঞতা , কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতা , অশিক্ষা দারিদ্র্য ইত‍্যাদির পাশাপাশি , ডাইনিশিকারের বিরুদ্ধে ভারতে সুনির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় আইন নেই । একেক রাজ‍্যের আইন একেক রকম , সব রাজ‍্যে ডাইনিশিকারের বিরুদ্ধে  আইন নেইও । এসব কারণে একশ্রেণীর সুযোগসন্ধানী লোক এখন‌ও ডাইনিশিকারের মতো জঘন‍্য কাজ করে বা ইন্ধন জুগিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে । যদিও ভারতীয় সংবিধানের 51A(h) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিজ্ঞানচেতনার প্রচার ও প্রসার ঘটানো এবং সেইসাথে কুসংস্কার ছড়ানো ও চর্চার বিরোধ করা নাগরিকদের অবশ‍্যকর্তব‍্য , তবু এটা যথেষ্ট নয় । ডাইনিশিকার রুখতে কঠোর কেন্দ্রীয় আইন একান্ত প্রয়োজন এইমুহূর্তে ।


ডাইনিশিকারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি রাজ‍্যে আইন রয়েছে । সবচেয়ে কঠোর আইন রয়েছে আসামে । ২০০৮ সাল থেকে আসামে ডাইনিশিকার সংক্রান্ত অনেক মামলার কোনো সুরাহাই হয়নি । দীর্ঘ সাতবছর সলতে পাকানোর পর ২০১৫ সালে আসাম সরকার ডাইনিপ্রথা বিরোধী বিল পাশ করেন । এই আইন অনুযায়ী কারোকে ডাইনি বলে অপবাদ দেয়া আইনবিরুদ্ধ  ,  এজাতীয় অপবাদ দেয়া হলে , যিনি বা যারা অপবাদ দেবেন , সেই অভিযুক্তকে তিন থেকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ হাজার থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ধার্য করা যেতে পারে । ডাইনি অপবাদ দিয়ে হত‍্যা করা হলে তার বিচার হবে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী । এক‌ই অপবাদে কারোকে আত্মহত‍্যায় প্ররোচিত করা অথবা বাধ‍্য করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বিধান করা হতে পারে । অভিযুক্তকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার করা যাবে এবং বিচার হবে জামিন অযোগ‍্য ধারায় । 


মহারাষ্ট্রে কুসংস্কার ও কালাজাদু বিরোধী আইন পাশ হয় ২০১৩ সালে । মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূল কমিটি (MANS) এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. নরেন্দ্র দাভোলকর ২০০৩ সাল থেকে এই মর্মে আইন করার জন‍্য লড়াই করছিলেন । ২০১০ সালে বিলের খসড়া তৈরি করা হয় । দক্ষিণপন্থী উগ্র ধর্মান্ধ সংগঠন তাঁর এ কাজকে ধর্মবিরোধী আখ‍্যা দিয়ে বিরোধ করে আসছিলো , কিন্তু বাধার মুখে দমে না গিয়ে ডা. দাভোলকর তাঁর কাজ করে যাচ্ছিলেন । সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করে মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার এই লড়াইয়ের মূল‍্য জীবন দিয়ে চোকাতে হয়েছে বিজ্ঞানযোদ্ধা ডা. দাভোলকরকে । ২০১৩ সালের ২০শে আগস্ট  তাঁকে গুলি করে হত‍্যা করা হয় । এর চারদিন পরেই পাশ হয় অর্ডিন‍্যান্স ।  ডা. নরেন্দ্র দাভোলকরের হত‍্যা কেবল হত‍্যা নয় , বিজ্ঞানাশ্রয়ী চিন্তাভাবনাকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভাবধারার একটি সরাসরি হুমকি , অর্থাৎ কুসংস্কারের জাল ছিঁড়ে বেরোতে চাইলে , মানুষকে আলোর পথে নিয়ে যেতে চাইলে সে পথ রুদ্ধ করে দিতে যথাসম্ভব চেষ্টা করা হবে । সভ‍্যতার অগ্রগতির পথে একটি কলঙ্কজনক দাগ , ডা. দাভোলকরের হত‍্যা । বিজ্ঞানমনস্কতার অগ্রগতির জয়যাত্রার ইতিহাসে ডা. নরেন্দ্র দাভোলকরের নাম , তাঁর আত্মত‍্যাগের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে । ২০১৪ সালে সমাজে তাঁর কালজয়ী অবদানের কারণে ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেন । তাঁর প্রয়াণ দিবস ২০শে আগস্ট National Science Temper Day হিসেবে পালন করা হয় । 


মহারাষ্ট্রের এই আইন অনুযায়ী , অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বলে নিজেকে কেউ দাবী করলে ( ভূত নামানো , গর্ভস্থ শিশুর লিঙ্গ পরিবর্তন , অলৌকিক উপায়ে বন্ধ‍্যাত্ব দূরীকরণ ইত্যাদি ) অথবা কারোকে ডাইনি অপবাদ দিলে , মানসিক অসুস্থ কোনো ব‍্যক্তিকে ব‍্যক্তিগত স্বার্থে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বলে দাবি করলে , ডাইনি অপবাদ দিয়ে শারীরিক মানসিক নির্যাতন করলে ইত‍্যাদি - অভিযুক্ত ব‍্যক্তি বা ব‍্যক্তিবর্গের ছ'মাস থেকে সাত বছর পর্যন্ত কারাবাস এবং পাঁচ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে । অভিযুক্তকে ওয়ারেন্ট ছাড়াও গ্রেফতার করা যাবে (Cognizable offence)  এবং অভিযোগের বিচার হবে জামিন অযোগ‍্য ধারায় (Non - bailable )।


ঝাড়খণ্ডে ডাইনিশিকার বিরোধী আইন পাশ হয়েছে সবচেয়ে আগে , ঝাড়খণ্ডেই ডাইনিশিকারের ঘটনা বা ডাইনি অপবাদ দিয়ে হত‍্যা করার ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি । ঝাড়খণ্ডে ডাইনিশিকার বিরোধী আইন পাশ হয় ২০০১ সালে । এই আইনে কারোকে ডাইনি অপবাদ দিলে শাস্তি তিনমাস কারাদণ্ড ও একহাজার টাকা জরিমানা ।  ডাইনি অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করলে শাস্তি ছ'মাসের কারাদণ্ড এবং দুহাজার টাকা জরিমানা ।   নিজেকে গুনিন হিসেবে দাবি করে , কোনো মানুষের ঘাড় থেকে ভূত নামানো বা ডাইনি ভর করেছে বলে দাবি করে তাকে সারানোর নামে কোনোধরনের শারীরিক অত‍্যাচার করলে শাস্তি একবছরের কারাবাস এবং দুহাজার টাকা জরিমানা ।


ছত্তিশগড় এবং উড়িষ‍্যাতেও  ডাইনিশিকার বিরোধী আইন বা Anti Witchcraft Law রয়েছে ।  পশ্চিমবঙ্গেও ডাইনিশিকার বিরোধী আইন পাশ করার উদ‍্যোগ নেয়া হয়েছে । বিচারপতি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই মর্মে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে । ডাইনি বলে অপবাদ দিলে শাস্তিবিধান , জরিমানার পাশাপাশি ডাইনি অপবাদের শিকার মেয়েদের সমাজে ও জীবিকায় পুনর্বাসন , আদিবাসী এলাকাগুলোতে কুসংস্কার বিরোধী প্রচারাভিযান , শিক্ষার প্রসার ইত‍্যাদি বিষয়েও উদ‍্যোগ নেয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে । কমিশন ডাইনি অপবাদে হত‍্যা এবং আত্মহত‍্যায় প্ররোচিত করার শাস্তি হিসেবে তিন বছরের কারাদণ্ডের প্রস্তাব করেছেন , সঙ্গে জরিমানা । জরিমানার অর্থ ডাইনি বলে কথিত ব‍্যক্তি অথবা তার পরিবারকে হস্তান্তর করা হবে । তবে হত‍্যার ক্ষেত্রে বিচার ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী হলেই যথাযথ হবে বলে মনে হয় , কারণ আইন কঠোর না হলে তার প্রয়োগ অনেক সময়েই সুফল বয়ে আনেনা । 


ভারতবর্ষের মতো দেশে ডাইনিশিকারের মতো অমানবিক কুসংস্কার নির্মূল করতে গেলে কঠোর আইন প্রণয়নের পাশাপাশি প্রয়োজন শিক্ষার প্রচার ও প্রসার , প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসার  , প্রয়োজন শতাব্দীপ্রাচীন অন্ধবিশ্বাসের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসা , প্রয়োজন যুক্তিবাদী মানসিকতার চর্চা । বিশেষত যেসব অনুন্নত দারিদ্র্যপীড়িত জনজাতি অধ‍্যুষিত অঞ্চল রয়েছে,  সেসব অঞ্চলে ব‍্যাপকভাবে এই মর্মে সচেতনতা ও  প্রচার অভিযান চালানো দরকার । যোগাযোগ ব‍্যবস্থার উন্নতি ঘটানোও সমূহ প্রয়োজন কারণ যোগাযোগ ব‍্যবস্থা উন্নত হলে প্রত‍্যন্ত এলাকাগুলিতে আইনের শাসন তুলনামূলক সুনিশ্চিত হবে , চিকিৎসা ব‍্যবস্থার উন্নতি হবে । জানগুরু ওঝা গুণিনদের ওপর যারা বাধ‍্য হয়ে নির্ভর করছেন সেইসব মানুষদের এদের ওপর থেকে নির্ভরতা কমবে অনেকাংশেই । সেইসাথে স্বাস্থ‍্যব‍্যবস্থার উন্নতিও প্রয়োজন , গ্রামীন এলাকাগুলিতে  ন‍্যূনতম চিকিৎসাব‍্যবস্থা নিশ্চিত করা আশু প্রয়োজন । পিতৃতন্ত্রের রোপণ করা লিঙ্গবৈষম‍্যের বীজ মূল থেকে উপড়ে ফেলাও জরুরী , এর জন‍্য প্রাথমিক স্তর থেকে শিক্ষাব‍্যবস্থায় পরিবর্তন আনা জরুরী । এই সবকিছুর জন‍্য‌ই তৃণমূল স্তর থেকে নীতি প্রণয়ন প্রয়োজন । সরকারী স্তরে তো বটেই , সেইসাথে প্রচারমাধ‍্যম বা মিডিয়াকে এবিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে । বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে ।  গড়ে তুলতে হবে কমিউনিটি ভিত্তিক সংগঠন বা মিশন , যেটা করে দেখিয়েছেন পদ্মশ্রী বীরুবালা রাভা । ডাইনি অপবাদের শিকার ব‍্যক্তিদের উদ্ধার করা , জীবিকা ও সমাজে পুনর্বাসন , ক্ষতিপূরণ দেয়া ছাড়াও সামাজিক হেনস্থার ভয়ে যাতে ডাইনি বলে চিহ্নিত ব‍্যক্তিকে তার পরিবার ব্রাত‍্য না করে দেয় সে বিষয়েও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে ।  সামাজিক মাধ‍্যমকে হাতিয়ার করে অনলাইন অ্যাক্টিভিটির মাধ‍্যমেও সচেতনতা অভিযান এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে । আইনি সচেতনতামূলক শিবির আয়োজন করতে হবে প্রত‍্যন্ত গ্রামগুলিতে , বিভিন্ন রাজ‍্যে ডাইনিশিকার ও কুসংস্কার চর্চার বিরুদ্ধে কী আইন আছে এটা মানুষকে জানানো জরুরী । এলাকার স্কুল স্তরেও এবিষয়ে  উদ‍্যোগ নেয়া যেতে পারে । স্কুল কলেজভিত্তিক কুসংস্কারবিরোধী শিক্ষাশিবির বা সেমিনার আয়োজন করতে হবে । প্রত‍্যন্ত এলাকার শিশুদের নিয়েও করা যেতে পারে তাদের উপযোগী সচেতনতা শিবির । তারা এই ঘটনাগুলোর সাথে অনেক বেশি কানেক্ট‌ও করতে পারে ।  বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে মঞ্চে কুসংস্কার বিরোধী গান কবিতা নাটক পরিবেশন করে জনসচেতনতা গড়ে তোলবার কাজে । এর একটির সাথে আরেকটি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত , কোনো একটি ক্ষেত্র ধরে এগোলে সমস‍্যার সমাধান সম্ভব নয় । এগোতে হবে সর্বতোভাবে , সব স্তরের মানুষকে সাথে নিয়ে , তাদের সাহায‍্য নিয়ে । বহু মানুষ এবং বহু সংগঠন এগিয়েও এসেছেন , আসছেন এই কাজে । 


তবে এক্ষেত্রে আশু এবং সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে ডাইনিশিকার বিরোধী কঠোর একটি কেন্দ্রীয় আইন । অপরাধ এবং সমাজ বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন , কেন্দ্রীয় আইন থাকাটা অত‍্যন্ত জরুরী । কেন্দ্রীয় আইন থাকলে ডাইনিশিকারের সংখ‍্যা উল্লেখযোগ‍্য ভাবে কমতে বাধ‍্য । বর্তমান  ভারতীয় দণ্ডবিধি কেবল হত‍্যা করলে তার বিচার করবে , কিন্তু ডাইনি অপবাদ দিয়ে মারধর বা অন‍্যান‍্য শারীরিক নির্যাতনের কেবল সাধারণ মারধরের মতোই বিচার হয় । নিগৃহীতের যে দীর্ঘকালীন মানসিক ট্রমা , সামাজিক নিগ্রহ , আঘাত , আতঙ্ক এইগুলোর কোনো নির্দিষ্ট বা যথাযথ বিচারের অথবা কোনো ক্ষতিপূরণের যথাযথ নিদান ভারতীয় দণ্ডবিধিতে নেই । এই সুযোগে ঘটে চলেছে একের পর এক ডাইনিশিকার বা ডাইনি অপবাদ দিয়ে নিগ্রহের ঘটনা । ন‍্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব‍্যুরোর তথ‍্যগুলো দেখলে এটাই প্রমাণ হয় । এছাড়াও প্রচুর ঘটনার অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়না , থেকে যায় চোখের আড়ালে । বাস্তবে প্রাপ্ত তথ‍্যের চেয়েও অনেক বেশি সংখ‍্যায় এসব ঘটনা ঘটে থাকে । অনেকক্ষেত্রে যদিওবা নির্যাতিতরা আইনের দ্বারস্থ হন , সামাজিক চাপে অভিযোগ প্রত‍্যাহার করে নিতে বাধ‍্য হন । এবিষয়ে কেন্দ্রীয় স্তরে  সুনির্দিষ্ট আইনে Non Compoundable তথা অপ্রত‍্যাহারযোগ‍্য ধারায় অভিযোগ করবার সুযোগ থাকা অত‍্যন্ত জরুরী , যেমন অনেক রাজ‍্যস্তরের আইনে রয়েছে । আমাদের দেশের বুক থেকে ডাইনিপ্রথা নামক কুসংস্কারের শেকড় সমূলে উৎপাটন করতে হলে কঠোর কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়ন করা ছাড়া অন‍্য রাস্তা নেই । ভারতে ডাইনিশিকার বিরোধী কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবী ।


ভবিষ‍্যৎ পেতে চলেছে আরো ছুটনি মাহাতো , বীরুবালা রাভাদের । যারা অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যেতে যেতেও প্রাণপণে আঁকড়ে ধরেন আলো , তাঁদের দেখানো সেই আলোয় আলোকিত হয় বহু জীবন । পেতে চলেছে নরেন্দ্র দাভোলকরদের , নষ্ট সমাজের নষ্ট প্রাণীদের হুমকির মুখেও দমে না গিয়ে , জীবন দিয়ে হলেও প্রমিথিয়াসের মতো সত‍্যের আগুন যাঁরা জ্বালিয়ে গিয়েছেন এবং যাবেন । এই আগুনের তাপেই  একদিন পুড়ে ছাই হয়ে যাবে ডাইনিপ্রথা নামক অন্ধবিশ্বাসের শতাব্দীপ্রাচীন অভিশাপ ।

 

412 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।