নারী শরীর উপমহাদেশে সব'চে বড়ো ট্যাবু

বুধবার, জুন ১৭, ২০২০ ৩:১৪ AM | বিভাগ : আলোচিত


আমরা জন্ম থেকেই স্বাভাবিক বিষয়গুলোকে ট‍্যাবু বলে চিনতে শিখি, ট‍্যাবু হিসেবেই জেনে বড়ো হ‌ই, এভাবেই একদিন পট করে মরে যাই। আমাদের ট‍্যাবু শুরু হয় জন্ম থেকে। প্রথমত জন্মরহস‍্যেই বিরাট ট‍্যাবু। বাচ্চা মায়ের পেট থেকে হয়েছে এটা বিরাট অন‍্যায়, ঘোর পাপ। আমাদের ঋষি মুনির দেশে বাচ্চা হয় সন্ন‍্যাসীর দেয়া ফল খেয়ে, যজ্ঞের চরু খেয়ে, দেবতারা স্বপ্নে এসে পেটের ওপর টর্চের মতো গোল গোল আলো ফেললে - এমনকী অধুনা বাচ্চা হসপিটাল থেকে কিনেও আনা হয় চৈত্র সেলে বেডকাভার কেনার মতো। কিন্তু আর যাই হোক, শরীরী মিলনের মতো "জঘন‍্য পাপের" ফলে নৈব নৈব চ!

আমাদের উপমহাদেশে শরীর বা তার স্বাভাবিক চাহিদাগুলো এমনিতেই ভিলেন। আমাদের পূতপবিত্র চোখে অসভ‍্যের মতো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বৃদ্ধশিশু নির্বিশেষে নাকের ডগায় সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়া সহ‍্য হয়, দেয়াল দেখলেই ঠ‍্যাঙ তুলে রাস্তার কুকুরগুলোর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছ‍্যাড়ছ‍্যাড় করে জলত‍্যাগ সহ‍্য হয়, ওই যাকে ল‍্যাংটো পাগলি বলি তার শরীর নিয়ে সরস মন্তব‍্য সহ‍্য হয়, পানগুটখার পিক ফেলে ফেলে হাওড়া ব্রিজ ক্ষ‌ইয়ে ফেলা সহ‍্য হয়, সহ‍্য হয় না কেবল মানুষ মানুষীর চুম্বন! আধবুড়ো দরকচাদের দেবতা বা ঋষিমুনিদের স্টাইলে যত্রতত্র রেতঃপাত হয়ে যায় একেবারে, আর তেনারা আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তারস্বরে খ‍্যাঁকাতে থাকেন। শরীরী চাহিদাকে ট‍্যাবু মনে করে, চেপে রেখে রেখে, ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে গেলে এসব‌ই হয়। ধর্ষণের বাড়বাড়ন্ত হওয়ার এটাও একটা কারণ বটে।

এ তো গেল শরীরী চাহিদার কথা, নারীর অতি স্বাভাবিক শরীরী প্রক্রিয়াকে বিশাল অঙ্কের ন‍্যাকা ট‍্যাবুবাজরা বলেন শরীর খারাপ, অপবিত্তির! অথচ নিয়মিত ঋতুস্রাব না হলেই বরং সেটাই শরীর খারাপ, তখন ছুটতে হয় ডাক্তারের কাছে। যেদিন থেকে জানতে পেরেছিলাম ঋতুরক্ত ড্রেনড হয়ে না গেলে ওই রক্ত আর মিউকাস‌ই ভ্রূণের শরীরে থাকে, তখন মনে প্রথম প্রশ্নটা ছিলো, ঋতুরক্ত অপবিত্র হলে তাহলে সন্তানের রক্ত‌ও তো অপবিত্র! কী করে হয়? মগজ পঙ্গু না হলে এই প্রশ্ন তো মনে আসার‌ই কথা! স‍্যানিটারি ন‍্যাপকিনের ব‍্যবহার শিখিয়ে দেয়ার সাথে সাথেই এই পাঠ‌ও পড়ানো হয়, কেউ যেন জানতে না পারে, এটা কিন্তু লজ্জার! আমাকেও শেখানো হয়েছিলো। এই শিক্ষাই স‍্যানিটারি ন‍্যাপকিনের প‍্যাকেট কালো পলিথিন বা খবরের কাগজে মুড়ে দিতে বা আনতে শেখায়, দাগ লেগে গেলে লজ্জায় মরে যেতে শেখায়, ডিসমেনোরিয়ার অ-স-হ-নী-য় যন্ত্রণায় পাগল পাগল লাগলেও চেপে যেতে শেখায়। আর হ‍্যাঁ, অপবিত্র ভাবতে শেখায়, ধর্মীয় আচরণে এমনকী সামাজিক মঙ্গল অনুষ্ঠানে ব্রাত‍্য হয়ে থাকতে শেখায়। দেবালয় থেকে কবরস্থান সবখানে নিষিদ্ধ করে রাখে। আমার ঠাকুমা ঋতুকে বলতেন "অনাচারী"! হোয়ট আ মাইণ্ডসেট! যেহেতু কোনো আচার অনুষ্ঠান থেকে তুমি এসময়ে ব্রাত‍্য, তাই ওই নাম।

নারীর অন্তর্বাসও একটা বিরাট ট‍্যাবু। যেহেতু পোশাকের ভেতরে ওটি পরা হয়, বাইরে এসেছে কি মরেছো! ব্রা-এর স্ট্র‍্যাপ যদি পথঘাটে কোথাও উঁকি দিয়েছে জামার আড়াল থেকে, সেতো মহা কেলেংকার, প্রায় উলঙ্গ হয়ে যাওয়ার শামিল! এমনকি ওসব শুকোতেও হবে অন্ধকারে, অন‍্যান‍্য "ভদ্রসভ‍্য পোশাক‌-আশাকের" আড়ালে আবডালে। যেহেতু সরাসরি এগুলোই বডি কনট‍্যাক্টে আসে, কড়া রোদে শুকিয়ে না নিলে এতে ফাংগাল ইনফেকশান হতে পারে, সেক্ষেত্রে শরীর সংক্রমিত হবে, তবু চেপে যেতে হবে, এ নিয়ে বলা যাবে না, সে হবে চরম লজ্জার!

সবচেয়ে বড় ট‍্যাবু হলো আমাদের শরীর, বিশেষত নারী শরীর এ উপমহাদেশে বিরাট বিশাল ট‍্যাবু। শরীর নাকি তেঁতুলের মতো, খোসা ছাড়ালে পচে যায়, মাছি বসে, লোভ জাগায়। তা সে না হয় হলো, খোদ তেঁতুলের‌ও মাত্র একপরত ঢাকলে চলে, আমাদের আবার তাতে চলে না। ভেতরে অন্তর্বাস ,তার ওপর স্লিপ, তার ওপর জামা বা টি বা কুর্তি...  তিন পরতেও শান্তি নেই, চাপাতে হয় ওড়না, চাপাতে হয় কায়দার স্কার্ফ, চাপাতে হয় মাথা ঢাকা বস্তা বা শরীরটাকেই মুড়ে ফেলতে হয় বস্তার ভেতরে, জীবন্ত! কী ভাবছেন? শাড়ির মতো "ভদ্র" পোশাক‌ও প্রপারলি ঢাকতে অসমর্থ, তেঁতুল অথবা কলা-কে স্রেফ একটা জরদগব কাপড়ের পোঁটলা হলে, তবেই খানিকটা শান্তি। পুরো শান্তি? তা বোধহয় কখনোই না। তা ভাই, যাদের এতো লোভ, তারা নিজেরাই একটু চোখটোখ ঢাকলেও তো পারেন!


  • ৩০৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শীলা চক্রবর্তী

জন্ম খুলনায়। কলকাতা বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে আইনে স্নাতক। মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে অপরাধ আইনে স্নাতকোত্তর। পেশায় আইনজীবী। নেশা রবীন্দ্রনাথের গান , ধ্রুপদী সঙ্গীত , কবিতা, অভিনয়, লেখালিখি । মঞ্চে নিয়মিত উপস্থিতি । লেখালিখি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও পোর্টালে প্রকাশিত । পেশায় আইনজীবী শীলা চক্রবর্তীর জন্ম খুলনায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক আর মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা শীলার নেশা রবীন্দ্র সঙ্গীত, ধ্রুপদী সঙ্গীত, কবিতা, অভিনয় এবং লেখালেখি। মঞ্চ নাটকেও তিনি নিয়মিত।