শিশু নিপীড়ন ও প্রতিরোধ

শনিবার, ফেব্রুয়ারী ৯, ২০১৯ ১০:৩৫ AM | বিভাগ : আলোচিত


অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার প্রাক্তন স্ত্রী ডাক্তারদের রিপোর্টের কথা উল্লেখপূর্বক অভিযোগ তুলেছেন যে তার মেয়ে আপন বাবা দ্বারা ধর্ষিতা হয়েছে একাধিকবার এবং তার বাচ্চা ছেলেও দেখেছে সেসব। সেইসাথে তিনি আরও বলেছেন, উক্ত সেনা কর্মকর্তা বাসার কাজের মেয়েকেও একদা গর্ভবতী করেছিলেন যেই কারণে তাদের ডিভোর্স হয়ে যায় ।

এই ঘটনা সত্যি হলেও যেমন খারাপ কথা, তেমনি মিথ্যে হলেও ভয়াবহ। কোনো মা যদি উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে এমন বানোয়াট কেস ফাঁদেন তেমন মায়ের জিম্মায় বাচ্চা রাখা উচিত নয়। আবার অভিযোগগুলো যদি সত্যিই সত্যি হয় তাহলেও যথাযথ বিচার হওয়া দরকার যেনো ভবিষ্যতে এমন কাজ করার কেউ আর সাহস না করে। তথাপি আরও প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশ্ন থেকে যায় কোনো মা যদি দেখেন তার স্বামীর চরিত্র এমন নিরাপদ সীমার বাইরে তাহলে অবশ্যই তার বাচ্চার নিরাপত্তা রক্ষায়ও পদক্ষেপ নেয়া জরুরি ছিলো যেনো এমন কোনো দূর্ঘটনাই না ঘটতে পারে। এই ঘটনা সত্যি হলে উক্ত ব্যক্তি যেনো বিচারের আওতায় আসে, যেনো সমাজে আরেকজন ভুক্তভোগীর সংখ্যা না বাড়ে সেটা নিশ্চিতকরণ জরুরি এখন।

শিশুরা পরনির্ভরশীল হওয়ায় তাদের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে থাকে। রিসার্চে দেখা গিয়েছে আমেরিকাতে আঠারো বছরের আগে প্রতি ৪ জনে ১জন মেয়ে শিশু এবং প্রতি ৬ জনে ১ জন ছেলে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। আর প্রতি ২০ জনে ১ জন শিশুর প্রতি শারীরিক নির্যাতন ঘটে এখানে যদিও বহুদিন ধরেই তারা চাইল্ড এ্যাবিউজ রোধে সক্রিয় রয়েছেন। সেই বিবেচনায় আমাদের দেশে ঘরে ঘরে শিশুরা নিয়মিত নানারকম মারের শিকার হয় নিজের বাবা মা, ভাইবোন, এবং শিক্ষক দ্বারা যেটা ফিজিক্যাল এ্যাবিউজের আওতাভূক্ত। এই মার জাতীয়ভাবে স্বীকৃতও। সেইসাথে আছে শিশুর প্রতি নানাবিধ অবহেলা, ধমকধামক, কটুক্তি। শিশুর যৌন নির্যাতনের বিষয়ে বললে বলতে হয় এই বিষয়ে আমাদের বাবামারা যেমন অজ্ঞ সমাজও তেমনি অন্ধ। যতক্ষণ না নিজের শিশুটি যৌন নির্যাতনের সরাসরি শিকার হয় ততক্ষণ পাবলিক বোঝেই না শিশুর যৌন নির্যাতন কী, কতভাবে হতে পারে? শুধু ঘটে যাবার পরই তারা হাহুতাশ করেন, আগে যদি জানতাম তাহলে এই সেই... !

শিশু নিপীড়ন বলতে শিশুর প্রতি শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, এবং অবহেলাকে বোঝায়। চড়, থাপ্পড়, মার, লাথি, বেত্রাঘাত, আগুনের ছেকা, মোচড়ানো, হাড় ভাঙা, চুল টানা, কান মলা ইত্যাদি শারীরিক নির্যাতন। শিশু নেগলেট বা অবহেলার মধ্যে পড়ে ঠিকমত খেতে না দেয়া, যত্ন না নেয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না করানো, নিরাপদ থাকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না দেয়া, প্রয়োজনীয় জামাকাপড় না দেয়া, ভালোবাসা না দেখানো এবং যখন তখন ধমকধামক। আর শিশুর যৌন নির্যাতনের আওতায় আসে তাকে বা নিজেকে উলঙ্গ করে প্রদর্শন, পর্ণোগ্রাফি ধারণ অথবা পর্ণোগ্রাফি দেখানো। তাদের প্রাইভেট পার্টস ধরা অথবা নিজের যৌনাঙ্গ তাদের দিয়ে ধরানো/দেখানো, অরাল-জেনিটাল, এ্যানাল, অথবা ভ্যাজাইনাল সেক্স কার্যক্রম।

সর্ব প্রকারের শিশু নিপীড়নই শিশুদের সুস্হভাবে বেড়ে ওঠাকে বাঁধাগ্রস্থ করে। আর অতি কাছের জন দ্বারা তারা অত্যাচারিত হয় বিধায় বুঝতেও পারে না ঘটনা কোন দিকে গড়াচ্ছে এবং কিভাবে প্রতিরোধ করা উচিত। আমেরিকায় এমন পরিস্থিতিতে তাদেরকে ৯১১ কল করার পরামর্শ দেয়া হয়। চাচা, মামা, খালু, কাজিন, নানা, দাদা, শিক্ষক, হুজুর, প্রতিবেশী, সৎ বাবা, এমন কী নিজের বাবা দ্বারাও ঘটতে পারে চাইল্ড এ্যাবিউজ, যারা অতি কাছের এবং ভালোবাসার জন। শিশুর যৌন হয়রানি পুং লিঙ্গের জন দ্বারা ঘটলেও শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন স্ত্রী এবং পুং সব রকম লিঙ্গের ব্যক্তি দ্বারাই সংঘটিত হয় যারা তাদের অতি ভালোবাসার জন। এহেন পরিস্থিতিতে এমন অভিজ্ঞতায় তাদের শারীরিক, মানসিক এবং আবেগিক সব ক্ষেত্রই ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং পরিণত হয়েও তারা একেকজন এ্যাবিউজারে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সব রকমের শিশু নিপীড়নই অপরাধ। উন্নত বিশ্বে এমন ঘটলে বাচ্চাদেরকে তেমন বাবামা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। রাষ্ট্রই তখন তাদের পালনের দায়িত্ব নেয়।

শিশুদের পরনির্ভরশীলতা, জ্ঞানের অভাব, প্রতিরোধ সম্পর্কিত অদক্ষতা তাদের নির্যাতনের মাত্রা বাড়ায়। শিশুর জীবনে যাদেরকে অতি নির্ভরযোগ্য মনে হয়, সমাজে যারা শিশুর প্রতি অতি আদর-কদর দেখায়, চকলেট আইসক্রীম উপহার দেয়, একা একা দীর্ঘসময় কাঁটায় তারাই হয়তো ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় সময়ে। শিশু নির্যাতক যারা তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুকে নানাভাবে ম্যানিপুলেট এবং ব্রেনওয়াশ করে যেনো ঘটনা সহসা ফাঁস হয়ে না যায়। এদের অনেকেই অতি আপনজন হওয়ায় তাদের প্রতি যেমন শিশুর গভীর ভালোবাসা থাকে তেমনি ঘটনা ফাঁস হলে আরও কী কী এবং কার কার ক্ষতি হবে সেই ভয়ও ঢুকিয়ে দেয়া হয় তাদের ভেতর। এমন কি শিশুর উপরই হয়তো দায় চাপানো হয় যে তুমিই চেয়েছিলে আমাদের মাঝে এমন ঘটনা ঘটুক। যদিও শিশুদের হ্যাঁ বা না কনসেন্ট দেবার মতো যোগ্যতা থাকে না তখন তথাপি অধিকাংশ শিশুই নিজেকে দায়ী মনে করে।

শিশুর পেটে ব্যথা, যৌনাঙ্গ বা রেকটাল ব্লিডিং বা জেনিটাল এরিয়ায় আঘাতের চিহ্ন, এসটিডি, মাথা ব্যথা, দুঃস্বপ্ন, অকারণ ভয়, বিছানায় প্রস্রাব, হঠাৎ এগ্রেসিভ হয়ে ওঠা অথবা হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, রেজাল্ট খারাপ, শরীরে নানাবিধ মার্কস, যৌনতা সম্পর্কিত অঙ্গভঙ্গি, ঘর পালানো ইত্যাদি শিশু নিপীড়নের লক্ষণ। ব্রোকেন ফ্যামলির শিশুর প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে তাদেরকে যেমন সহজেই আয়ত্বে আনা যায় তেমনি অতি ভদ্র শিশুদের গুরুজনকে ভক্তি করা স্বভাবজাত হওয়ায় সহজেই কব্জায় আনা যায়। আর একবার নিপীড়ন শুরু হলে বার বার ঘটে যতদিন না শক্তভাবে প্রতিরোধ করা হয়। নিপীড়ন যত দীর্ঘ হয়, যত বেশী আপনজন দ্বারা ঘটে বিষয়টি ততই বেশী ক্ষতিকর। বাচ্চাটির পুরো জীবনই হয়তো নষ্ট হয়ে যায় তখন -জীবনযাপনের ধরণ, সুখ, স্বাস্থ্য, সামাজিক জীবন, মানসিক স্বাস্থ্য সবই ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

শিশুর জীবনে বাবা মায়ের সর্বদা সক্রিয় ভূমিকা থাকলে, আগেই শিশুকে তাদের শরীরের প্রতিটি পার্টসের নাম শেখালে, মানুষের সভ্য আচরণ এবং যৌন হয়রানি সম্পর্কে ধারণা দিলে, পরিবারে খোলাখুলি আলোচনার কালচার তৈরি করলে এবং যেকোনো বিষয়েই তাকে বিশ্বাস করা হবে, সুরক্ষা দেয়া হবে, তার উপর অকারণ অপরাধের দায় চাপানো হবে না নিশ্চয়তা দিলে শিশু নিপীড়ন অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব। শিশু নিপীড়ন শুরু হলে বার বার ঘটে যা শারীরিক, মানসিক, এবং সামাজিক জীবনকেও বাঁধাগ্রস্থ করে, ঘর পালানো বা সুইসাইডাল মনোভাব জন্মায়। তাই প্রিভেনশনই বেষ্ট। শিশু নিপীড়নে মেডিকেল এবং সাইকোলজিক্যাল হেল্প অবশ্যই নেয়া দরকার যেনো জীবনকে সঠিকপথে এবং সঠিকভাবে পরিচালনা করতে শেখে শিশুটি।


  • ১৮৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শিল্পী জলি

সমাজকর্মী, ইউএস প্রবাসী

ফেসবুকে আমরা