সমাজের সবচেয়ে বড় রোগের নাম "পাছে লোকে কিছু বলে”

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ৩১, ২০১৯ ১০:৩৪ PM | বিভাগ : আলোচিত


প্রত্যেক মানুষ ব্যাক্তি বিশেষে যেমন একটা ইমেজ ধারণ করে, তেমনি যুগল হিসেবেও একটা ইমেজ ধারণ করে। আমাদের সোসাইটি, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে যুগল প্রিয়তার রোমান্টিসিজমের চল খুবই জনপ্রিয়, চাহিদার এবং আকাঙ্ক্ষার। 

রোমিও-জুলিয়েট, লাইলী-মজনু, রাধা-কৃষ্ণ এইরকম আরো বেশ কয়েকটি প্রেমিক যুগলের গল্প আমরা ছোট থেকেই জেনে এসেছি। সেই সাথে বলিউড আমাদের শিখিয়েছে, হাম এক বার জিতে হ্যায়, এক বার মারতে হ্যায়... প্যায়ার এক বার হোতা হ্যাঁয় ,অউর শাদি ভি এক হি বার হোতি হ্যাঁয়। 

কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে, মানুষের মধ্যে যেমন একগামীতা আছে, তেমনি বহুগামীতাও আছে। আর এই একগামী হওয়া, বহুগামী হওয়ার মধ্যে জেন্ডার নাই। নারী, পুরুষ, রুপান্তরকামী নারী, রুপান্তর কামী পুরুষ, মানে যে কোনো মানুষ বহুগামী হতে পারে।

এখন এই বহুগামী হওয়া, ভ্যালেন্টাইন্স ডের জন্য ক্ষতিকারক। কারণ বহুগামী হয়ে গেলে লাল লাল হার্ট শেইপের এই দিন টিতে লাইলী-মজনু, রোমিও-জুলিয়েটের যে শো ডাউন বাণিজ্য আছে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। 
সেই সাথে সমাজে যুগল ইমেজ এর যে কনসেপ্ট, তা ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

আমাদের সোসাইটি একটি যুগলকে নানান প্রশংসায় স্তুতিতে, স্বীকৃতি দেয়। যুগল হিসেবে এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর, এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে মানুষ। দেখা যায় তাদের নিজেদের ভেতরে সম্পর্কের গভীরতা না থাকা সত্বেও, নানান দ্বন্দ্বে, ঝগড়ায় একজন আরেকজনের উপর মান অভিমান করেও, একজন আরেকজনকে কথায় আচরণে তুলোধুনা করেও হাসিমুখে সামাজিকতা রক্ষা করে, তাদের যুগল ইমেজকে রক্ষা করে চলেছে। কারণ যেহেতু নানান জায়গায় তারা যুগল হিসেবেও একটা ইমেজ ধারণ করে, সেই ইমেজ নষ্ট হলে, বা হারালে তারা অস্তিত্ব সংকটে ভুগবে। 

তাই কোনো না কোনো কারণে তারা অসুখী সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে বা রাখতে চায়। সেই সাথে একাকীত্বের জীবন বরণ করে নেয়ার একটা ভয় কাজ করে মানুষের। কিন্তু আদতে দিন শেষে মানুষ একা। মানুষ শেষ পর্যন্ত একক স্বত্বার অধিকারী।

ডাঃ আকাশ নামের একজন আত্মহত্যা করেছেন। কারণ সম্পর্কে তিনি নিজেকে প্রতারিত মনে করেছেন। 
অথচ তার স্ট্যাটাসে দেখা গেছে স্ত্রী'র সম্পর্কে বিয়ের আগেই তিনি জেনে ফেলেছিলেন। শুধু মাত্র বিয়ের ব্যাপারে সবাই জেনে গেছে, বিয়ের কার্ড ছাপা হয়ে গেছে মানে সমাজের চোখে যে ইমেজ তিনি দেখিয়েছেন তা নষ্ট হবে তাই তিনি আশায় বুক বেঁধে, বিয়ের পর সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে ভেবে সেই মেয়েটিকে বিয়ে করেছেন।

মানুষ নিজের পায়ে কুড়াল মারে, আর তিনি কুড়ালের কাছে গিয়ে বলেছেন, আসো কুড়াল, আমার পায়ে আসো।

অনেক মেয়ে ড্রাগ এডিক্ট ছেলে বিয়ে করে ফেলে, কারণ সে ভাবে যে বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। অনেক বাবা মা তার মানসিক অসুস্থ সন্তান বা বিগড়ে যাওয়া সন্তান কে বিয়ে দিয়ে দেন। ভাবেন বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। 

হ্যাঁ অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি কাজে দেয়। কারণ আরেকজনের সাথে জোড়া বেঁধে দিলে একটা নতুন যুগল ইমেইজ তৈরি হয়, যেটাতে মানুষ নিজের একটা নতুন স্বীকৃতি পায়, এবং জীবন শুরু করতে পারে। কিন্তু সেটা সবার জন্য তো সিদ্ধ না।

মানুষ সহজে বদলায় না। মানুষ তখনই বদলায় যখন সত্যিকার অর্থে সে বদলাতে চায়। তাই এই "বিয়ের পরে সব ঠিক হয়ে যাবে" থিওরী একটা বুলশিট থিওরী।

মানুষ সম্পর্কে চিট করে। যে সম্পর্ক একটা শেকলের মতো, সেই সম্পর্কে চিটিং, অনিবার্য। চিটিং বলতে আমরা জানি পার্টনার এর অমতে অন্য কারো সাথে যৌন সম্পর্ক বা যৌনতা ভিত্তিক সম্পর্ক স্থাপন। সম্পর্কে পার্টনার ব্যতীত অন্য কারো সাথে সম্পর্ক স্থাপন যেমন চিটিং, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে এটা একটা এস্কেইপ (Escape). সম্পর্কের ভার/চাপ/বিষাক্ততা/শেকল থেকে সাময়িক মুক্তি বা পলায়ন।

অনেকে সাংসারিক সমস্ত দায় দায়িত্ব থেকে নিজেকে উইথড্র করে কোথাও চলে যান, অনেকে মুখের উপর খবরের কাগজ ধরে রাখেন, অনেকেই বই পড়েন, অনেকেই বন্ধুদের আড্ডায় যান, অনেকেই শুধু ক্রিকেট/ বা অন্য খেলা নিয়ে পড়ে থাকেন। অনেকেই দেখবেন কোনো কাজ নাই, তবুও রাতে বাড়ি ফিরেন, অনেকেই মায়ের বাড়ি যান, বা নিজের বাচ্চাকেই সময় দেন। অনেক কে দেখবেন, নানান রান্না করছেন, বাগান করছেন, ঘর সাজাচ্ছেন। এই সব গুলো মানুষের শখের কাজের মধ্যেও পড়ে। আমি বলছি না সবার ক্ষেত্রে, তবে অনেক মানুষের মনের গভীরে তাকালে খুঁজে পাওয়া যায় যে, এই সব কিছু এক একটা এস্কেইপ। অসুখী সম্পর্ক থেকে সাময়িক মুক্তির জন্য কিছু দরজা।

ডাঃ আকাশের স্ত্রী তার স্বামী'র সাথে সম্পর্ক রেখেই অন্য একজনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। এতে ডাঃ আকাশ চাইলে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দিতে পারতেন। তার স্ত্রী সম্পর্ক ছিন্ন করেন নি, কারণ তার হয়তো মনে হয়েছে তিনি গাছের টা খাবেন, তলারটাও কুড়াবেন। ওঃ আমাদের দেশে তো আবার কে আগে ডিভোর্স দিলো, কে আগে ব্রেক আপ করলো এটাও একটা ইস্যু।

দুঃখজনক যে একটা বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে নতুন ভাবে জীবন শুরু করার একটা অপশন ছিলো। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন আত্মহত্যার পথ।

সমাজের সবচেয়ে বড় রোগের নাম "পাছে লোকে কিছু বলে"

আরে ভাই আপনার সিদ্ধান্ত আপনি নেন। আঙুল সবারই আছে। লোকে তর্জনি তুললে আপনি মধ্যমা দেখান।


  • ৯৮১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

প্রমা ইসরাত

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

ফেসবুকে আমরা