সমকামীদের স্বীকৃতি মানবিকতার সাথে ধর্মের বিরোধ

সোমবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৮ ৮:৩৪ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


সমকামীদের সম্পর্কে হিন্দু ধর্ম কী মত প্রকাশ করেছে দেখুন, ‘যদি দুই কুমারীর মধ্যে সমকামিতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তাহলে তাদের শাস্তি দুইশত মূদ্রা জরিমানা এবং দশটি বেত্রাঘাত (Manu Smriti chapter 8, verse 369.)। আরেক জায়গায় বলা আছে, যদি কোনো বয়স্কা নারী কম বয়সী নারীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে বয়স্ক নারীর মস্তক মুণ্ডন করে দু’টি আঙ্গুল কেটে গাধার পিঠে চড়িয়ে ঘোরানো হবে’ (Manu Smriti chapter 8, verse 370.)।

ভারত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হবার পরও আদালত ‘বাস্তবতা’ অনুধাবন জাতীয় অজুহাত দেখিয়ে মানবাধিকারকে এড়িয়ে যায় নি। ভারতীয় আদালত স্পষ্ট করে বলেছে, সমকামিতা মেন্টাল ডিজঅর্ডার নয়, এটি একটি সুস্থ যৌন সম্পর্ক। অপরদিকে ভারতের বুদ্ধিজীবীদের কেউ আদালতের বিরুদ্ধে দেশ অস্থিতিশীল করে তোলার অভিযোগ তুলে রায়ের বিরুদ্ধে পরোক্ষ মতামত দেয় নি। কিংবা এই রায় দেয়ার মধ্য দিয়ে আদালত মৌলবাদীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে- এই জাতীয় তত্ত্ব খাড়া করে নি। আমরা দেখেছি বাংলাদেশে যখনই কোনো প্রগতিশীল মুভমেন্ট, কিংবা মানবিক স্বীকৃতি যা ধর্মে নিষেধ- এরকম সামাজিক আন্দোলন হয়েছে- সেটা লেখার মধ্য দিয়েই হোক কিংবা রাজপথের আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই হোক- এই দেশের মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা পরোক্ষভাবে তার বিরোধীতা করেছে। যদিও এরা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করে। এরকম দাবি করলেও যে কোনো প্রগতিশীল মুভমেন্টের সময় এরা উদ্ভট যুক্তি তুলে ধরে। ‘আমাদের সমাজ এখনো এসবে প্রস্তুত নয়’ অথবা ‘এসব মৌলবাদীদের রাস্তায় নামতে উস্কানী দিবে’- এরকম জ্ঞান বিতরণ করে প্রতিক্রিয়াশীল অমানবিক সমাজকে শতাব্দী থেকে শতাব্দীতে বয়ে নেয়াই এদের পবিত্র দায়িত্ব।

২০১১ সালে জাতিসংঘে সমকামিদের সম-অধিকার নিশ্চিত করতে রেজুলেশন পাশ করে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ মানবাধিকার ও সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলোর প্রায় সবাই এতে একমত হলেও মুসলিম বিশ্ব এর তীব্র বিরোধীতা করে। বিরোধীতা করা দেশগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশ, সৌদি আরব, পাকিস্তান, বাহরাইন, কাতার। সমকামিতার জন্য মৃত্যুদণ্ড দেয়া মুসলিম দেশগুলো হচ্ছে সৌদি আরব, ইরান, সুদান, ইয়েমেন, নাইজেরিয়া এবং সোমালিয়া। অপরদিকে বাংলাদেশের মতো মুসলিম দেশ মৃত্যুদন্ড না দিলেও তাদের আইনে সমকামিতায় লিপ্ত হলে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী এটি সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত দিতে পারে! ভারতে গরু খাওয়ার জন্য দু’য়েকজন মুসলিমকে হিন্দুত্ববাদীরা পিটিয়ে মেরে ফেললে বাংলাদেশের তথাকথিত যেসব বুদ্ধিজীবীরা মুখে ফেনা তুলে ফেলেন তারা কিন্তু জীবনেও এই বিষয় নিয়ে দু’টো লাইন লিখেন নি। বরং বাংলাদেশের সমকামীদের প্রথম ও একমাত্র প্রকাশনা ‘রংধনু’ প্রকাশিত হলে এদের কেউ কেউ ইনিয়ে বিনিয়ে ‘সব কিছু রাতারাতি করতে যাওয়া ঠিক না’ ইত্যাদি বলে বলে সমকামিতার বিরুদ্ধতাই করে গেছে।

খ্রিস্টান ধর্ম সমকামিতাকে পাপ বলে মনে করে(আদি পুস্তক ১৯:১-১৩)। সমকামীকে ইসলাম হত্যা করে ফেলতে বলেছে। হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, লুত আ. এর কওমের মতো কুকর্মে লিপ্ত উভয়কে হত্যা করে ফেল(মুসনাদে আহমাদ, সুনানে ইবনে মাজাহ, সুনানে আবু দাউদ)। ইবনে আব্বাস বলেন, রাসুল (সঃ) বলেছেন, তোমরা যদি কাউকে পাও যে লুতের সম্প্রদায় যা করতো তা করছে, তবে হত্যা কর যে করছে তাঁকে আর যাকে করা হচ্ছে তাকেও (আবু দাউদ ৩৮:৪৪৪৭)। খ্রিস্টান ধর্ম অবশ্য অপেক্ষাকৃত কিছুটা ছাড় দিয়েছে সমকামীদের। বাইবেল মতে সমকামীদের ঈশ্বরের ক্ষমা পাবার সুযোগ রয়েছে। বাইবেলের চোখে সমকামীরা ব্যভিচারী, প্রতিমা পূজক, খুনী, চোরদের সমতুল্য। অন্যদের মতো সমকামীরাও ঈশ্বরের ক্ষমা পাবে যদি তারা যীশুকে উদ্ধারকর্তা বলে বিশ্বাসে করে এবং সমকামিতা ছেড়ে দেয় (১ করিন্থীয় ৬:১১; ২ করিন্থীয় ৫:১৭; ফিলিপীয় ৪:১৩)।

অর্থ্যাৎ কমবেশি সব ধর্মই যে সমকামিতার বিপক্ষে আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আজকের আধুনিক মানবাধিকার বিশ্বে ইসলাম ও মুসলমান ছাড়া কেউই সমকামিতাকে গায়ের জোরে দমন করার চেষ্টা করে না। যেসব রাষ্ট্র সমকামী বিয়ে অনুমোদন দিয়েছে সেগুলো খ্রিস্টান প্রধান এবং দেড়-দুইশ বছর আগে সেখানে খ্রিস্টান চার্চের শাসনে ছিলো। হিন্দু ধর্মেও সমকামিতার বিরুদ্ধে সাজা দেয়ার কথা বলা থাকলেও ভারতের আদালত মানবিক ও বৈজ্ঞানিক দেহতত্ত্ব অনুসারে সমকামিতাকে স্বাভাবিক যৌন সম্পর্ক বলে রায় দিতে দু’বার ভাবে নি। হিন্দু ধর্মে সতিদাহ প্রথা আছে। ভারত সেই শাস্ত্রীয় বিধান আইন করে বাতিল করেছে। হিন্দু বিয়ে রেজিস্টার ও বাতিলের আইন করেছে ভারত যার হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে কোনো অনুমোদন নেই। সেই ভারতেই তিন তালাকের পক্ষে মুসলমানরা আন্দোলন করে। পুরুষের বহু বিবাহের অধিকার সুরক্ষার দাবি জানায়। সমকামী পত্রিকা ‘রংধনুর’ প্রকাশক জুলহাস মান্নাকে ইসলামিক সন্ত্রাসীরা হত্যা করার পর বাংলাদেশের সরকার থেকে বলা হয়েছিলো, এসব (সমকামিতা) আমাদের সমাজে অনুমোদন নেই।… একটা লোকের চারটা বউ, অগুণতি যৌনদাসী, রক্ষিতা, হেরেম- এসব আমাদের সমাজে অনুমোদন আছে। এরকম সমাজের কথা হাদিস বইগুলোতে পাওয়া যায়। বাপের দাসীকে পুত্র ভোগ করতে পারবে কিনা, অবাধ্য স্ত্রী দাসীর সঙ্গে সহবত করতে না দিলে ইসলামী হুকুমত কি বলে- এরকম প্রশ্ন আর জবাব নিয়ে লেখা বই আমাদের সমাজে অনুমোদিত। যেটা নেই- কে কার সঙ্গে সেক্স করবে। কে কাকে জীবনসঙ্গী বানাবে, কে কাকে বিয়ে করবে- এই মানবিক স্বীকৃতি সারা পৃথিবী আস্তে আস্তে মেনে নিতে শুরু করলেও মুসলিম বিশ্বে আজো ঘোর অন্ধকার।

ভারতের সুপ্রীম কোর্টের বিচারকরা সমকামীদের পক্ষে রায় দিয়েছে। ঢাকার বিচারকদের পক্ষে কিংবা লাহোর ইসলামাবাদের বিচারকদের পক্ষে এরকম রায় দেয়া সম্ভব হতো না। কারণ দেশগুলো মুসলিম এবং বিচারকরাও মুসলিম। যদিও সমকামিতার বিপক্ষে পৃথিবীর সব ধর্মই।

কয়েক বছর আগের কথা, ঢাকার ওয়ান্ডারল্যান্ডে ভ্রাম্যমান আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট প্রেমিক-প্রেমিকা যুগলদের গণহারে জেল জরিমানা করেছিলো। ম্যাজিস্টেট সাহেব ভয় দেখিয়ে বলছিলো, বাপ-মাকে ফোন দিয়ে ডেকে এনে এদের দেখান… ইত্যাদি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন একটা ডিপার্মেন্টে যেন কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিয়েছিলো রাত আটটার পর ছাত্র ছাত্রী একত্রে থাকতে পারবে না…? এই ধরণের ঘটনায় সাধারণ মানুষ থেকে জ্ঞানীগুণী লোকজন পর্যন্ত সমর্থন করেছে। ‘সামাজিক অবক্ষয়’ ঠেকাতে নাকি এরকম কার্যক্রম বা ব্যবস্থা নেয়া উচিত। যে দেশে ছেলেমেয়ে প্রেম করলে পুলিশ এসে ভয় দেখায়, ঝামেলা করে সেখানে সমলিঙ্গের সেক্স প্রেম ভালোবাসা স্বীকৃতি তো এক হাজার বছরের পথ পরিক্রমা…।


  • ২৯০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সুষুপ্ত পাঠক

বাংলা অন্তর্জালে পরিচিত "সুষুপ্ত পাঠক" একজন সমাজ সচেতন অনলাইন একটিভিস্ট ও ব্লগার।

ফেসবুকে আমরা