চরিত্রের গ্রেডকার্ড নয়, নিজের পরিচয় নিজে গড়া আমার মায়ের অধিকার

সোমবার, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৮ ২:২৩ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


আমরা সন্তানেরা জন্মের পর থেকে মা, বাবার প্রতি চরম নির্ভরশীল হই। একটা সাদা কাগজে বা ব্ল্যাকবোর্ডে যেমন কিছু লেখা হলে তবেই সেটি চরিত্রলাভ করে, তেমনই সন্তানেরা তাদের মানসিক বিকাশ লাভ করে তাদের মা, বাবাদের দেখে, শিখে। পরিবেশে সবকিছুই জন্মের পর একটি শিশুর অজানা, অপরিচিত থাকে। তারা পরিচিত হতে শেখে, সবকিছুকে চিনতে ও জানতে শেখে তাদের পরিবার থেকেই।

কি শেখায় আমাদের পরিবার?

আমরা ছোট থেকেই দেখি বাবারা বাইরে কাজ করে, ভারি কাজ করে, টাকা রোজগার করে। আর মায়েরা সন্তান প্রতিপালন করে, রান্না করে, ঘর সাজায়, ঘর সামলায়। রোজগেরে মায়েরাও আছে, তাদের আবার বৃহৎ কর্মজীবন। তারা বাইরে চাকরি করেন, আবার ঘরে এসে ঘর সামলানোর দায়িত্বটাও তাদেরই সামলাতে হয়। রোজগেরে বাবাদের কিন্তু এই ঘর সামলানোর ব্যাপারটি মুখ্য নয়। যেন এটা সমাজে একটি পরিচিত মিথ যা আবশ্যিক, নারীকেই ঘর সামলানোর কাজ করতে হবে, পুরুষ সে বাইরে পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করবে এবং ঘরে ফিরে বিশ্রাম নেবে। আমরা সন্তানেরা এমনই দেখি পরিবারে, এমনই শিখি এবং এটাকেই সংসারের নিয়ম ভেবে বহন করে নিয়ে যায় যুগের পর যুগ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। যেন মায়েদের ও বাবাদের প্রজাতিই আলাদা। বাবারা মানুষ প্রজাতির, আর মায়েরা মানুষ নয়, অন্য কোনো প্রজাতিরই হতে পারে! আমার ধারণা নেই এই প্রজাতির সঠিক নাম। শুধু আমরা জানি, মায়েরা শুধু মা, আর বাবারা বাবা, পুরুষ মানুষ, সমাজের অগ্রগতির বাহক বা অতি মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আমার জন্য আমার মা, বাবা নিজেদের জীবনে অনেককিছু ত্যাগ করেছে। আমার বাবা নিজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা ছেড়ে করিমপুর থেকে কলকাতায় চলে এসেছিলো। যেখানে করিমপুরে থাকতে আমার বাবা শঙ্কর দত্ত নয়, মানুষের কাছে দ্য শঙ্কর দত্ত ছিলো, এক কথায় মানুষ চিনতো, জানতো, সমীহ করতো, তার কথা শুনতো, এমন একটি পরিচিত, প্রতিষ্ঠিত এলাকা ছেড়ে শুধুমাত্র আমি যাতে বেপথে না চলে যাই, কলকাতায় এসে আমার সাথে একটি অপরিচিত মহলে, অপরিচিত পরিবেশে থাকা শুরু করে। কলকাতায় পাপার এহেন কোনো নামডাক, নেই, এতো সমীহ নেই, এতো সম্মান নেই, এক কথায় নামের পরিচয় নেই, দ্য শঙ্কর দত্ত থেকে কেউ একজন ব্যবসায়ী শঙ্কর দত্ত। এটা ভীষণ বড় একটি ত্যাগ। কিন্তু একজন মা, যে শুধু মা, যার নামের আগে কখনো “দ্য” কথাটি বসে নি, যার পরিচয় শুধু সে একজন মা বা একজন ঘরের বউ, যার ত্যাগ কখনো চোখে আসে না, যেন এভাবে থাকাটাই নিয়ম, তাকে এভাবেই চলতে হয়, থাকতে হয়, বাঁচতে হয়, এটাই নারীধর্ম। এমন নারী তো সমাজের ঘরে ঘরে। বাবার ঘর থেকে নিজের সব আশা, স্বপ্নকে পায়ের তলায় মাটি চাপা দিয়ে বরের ঘরে আসতে হয়। সেখানে এসে তাকে মানিয়ে নিতে হয় একটি অপরিচিত পরিবেশ ও পরিবারের সাথে। না মানিয়ে নিতে পারলেই “খারাপ” তকমা লাগে, “বাবা, মা কিছু শেখায় নি” শুনতে হয়। আর এই “খারাপ” তকমা, “বাবা, মা কিছু শেখায় নি” এমন কথাগুলি এড়িয়ে যেতে আজীবন তাকে লড়াই করতে হয়, জ্বলন্ত কড়াইয়ে অগ্নি পরীক্ষা দিতে হয়। এটাই কি নারীর জীবন?

আমার মা চেয়েছিলো কিছু করতে। অন্যরকম কিছু করার স্বপ্ন দেখেছিলো। কখনো সে দেবী চৌধুরানী হতে চেয়েছিলো যে একটি কাল্পনিক হিরোয়িক চরিত্র। কখনো সে স্বপ্ন দেখেছিলো এই করবে, সেই করবে, সমাজকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবে, দেশের জন্য কিছু করবে, শেখাবে, প্রয়োজনে যুদ্ধও করবে, প্রয়োজনে দৌড়বে, অম্লান হাসবে নিজের কাজের জন্য, সমাজ থেকে সমীহ আদায় করে নেবে! কি নারী, তোমরা এমন স্বপ্ন দেখো না! দেখো তো! কিন্তু সব স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে তোমাদের শেষ পরিণতি হয় যুদ্ধক্ষেত্রে ধুলো মেখে নয়, রান্নাঘরে চুলার কালিতে কালিমালিপ্ত হয়ে। তোমাদের পরিণতি হয় দেশের জন্য কাজ করে সমীহ আদায় নয়, বরং ঘর পরিবারকে কেমন সাজালে তার ওপর “ভালো খারাপ” গ্রেডকার্ড পেয়ে।

আমি সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখি না। পড়াশোনার স্বপ্ন দেখি, লেখালেখির স্বপ্ন দেখি, ভালো কাজ করার স্বপ্ন দেখি, নতুন আদর্শ গড়ার স্বপ্ন দেখি। আমি স্বপ্ন দেখি, “পাপাকে, মাকে অনেক কিছু দেখাবো আমার আদর্শের জগতে। পড়াবো, লেখাবো, অন্যরকম জগতের সাথে পরিচয় করাবো।” আমি স্বপ্ন দেখি, “পাপা একদিন মুখের গালাগালি ভুলে যাবে, মা একদিন নিজের ফেলে আসা স্বপ্নকে বাস্তব হতে দেখতে পাবে।” আমি স্বপ্ন দেখি, “সমাজে পুরুষ ও নারীর প্রজাতি ভিন্ন নয়, একদিন এক হবে। মায়েরা শুধু মা নয়, মায়েরাও মানুষ পরিচয় পাবে। মা মানে শুধু স্নেহ করা, মা মানে শুধু ঘর সামলানো নয়, মা মানে সত্যিকারের যুদ্ধক্ষেত্রে রনংদেহি হবে।”

আমার ভালো লাগে না যে আমার মা সবসময় ঘরে থাকে, ঘরের কাজ সামলায়, কিছু করতে না পারার জন্য হীনমন্যতায় ভোগে। আমার ভালো লাগে না যে তাকে অন্যরা “ভালো, খারাপ” সার্টিফিকেট দেবে আর সে সেটুকু নিয়েই পরম পাওয়া পেয়েছি এটাতেই সন্তুষ্ট থাকবে। আমার ভালো লাগে না যে সে অশ্লীল কথার বাণে ঝাঁজরা হয়ে যাচ্ছে এটা দেখতে। আমার ভালো লাগে না যে তার পরিচয়ের জন্য তাকে অন্যের বা অন্যদের ওপর নির্ভর করতে হয় এটা দেখতে। আমার ভালো লাগে না যে সে একজন শুধুমাত্র মা বা শুধুমাত্র ঘরের স্ত্রী হয়ে বেঁচে আছে এমনটি দেখতে। পরিচয় গড়া, পরিচিত হওয়া, অন্যরকমভাবে, নিজের মতো করে আত্মনির্ভর হয়ে বাঁচা আমার মায়েরও অধিকার। চরিত্রের গ্রেডকার্ড নয়, নিজের পরিচয় নিজে গড়া আমার মায়ের অধিকার।

নারী, যে পরনির্ভর হয়ে বাঁচো, আদতে এই বাঁচা, বেঁচে থাকা নয়। স্বপ্ন দেখা, স্বপ্নকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে সেটাকেই জীবন গড়ে তোলা, এ তোমাদের অধিকার। রান্নাঘরের চুলার কালিতে কলঙ্কিত হওয়া নয়, কর্মক্ষেত্রে ধূলা, মাটি মেখে ধুলায়িত হওয়া অনেক সম্মানের, গৌরবের।  


  • ৪০৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সৌম্যজিৎ দত্ত

লেখক, ব্লগার, আইএসআই তে লেকচারার এবং গবেষণারত ছাত্র।

ফেসবুকে আমরা