ইস আমি যদি ছেলে হতাম!

শনিবার, মার্চ ৯, ২০১৯ ৫:০৯ AM | বিভাগ : আলোচিত


মা বলতেন, কথা শিখতে খুব একটা দেরি হয় নি আমার। বরং সমবয়সীদের থেকে একটু বেশিই তাড়াতাড়ি। তারপর অনর্গল। সবার স্নেহ মিশ্রিত প্রশ্রয়ে আর অতিরিক্ত ডানপিটে স্বভাবের কারণে দুমদাম মুখের উপর কথা বলার অভ্যাসটা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো অজান্তেই । সবাই বলতো মুখফোঁড়।

তখনও মেয়েবেলার দিনগুলো এখনকার মতো এতটা সংকুচিত হয়ে যায় নি। সাত-আট বছরের মেয়ে শিশুকে নিয়ে অভিভাবক এক প্রকার নিরুদ্বিগ্নই থাকতো বলা চলে। মায়ের অফিস আটটা থেকে আড়াইটে। স্কুল ছুটির দিনগুলো স্বর্গীয়। কোনমতে পেটে চারটে চাপিয়ে সারাটা দিন দস্যিপানা। ছ’ সাত জনের তুমুল দাপটে কলোনির বরই গাছের পাতা গুলো আতঙ্কিত। গোল্লাছুট - দাড়িয়াবান্ধার বিরতিতে এ গাছ থেকে ওগাছ।

অধিকাংশ পরিবারের আলাদা কিচেন গার্ডেন ছিলো। আমরা বলতাম ”ক্ষেত”। পালা করে এক একজনের ক্ষেতে হামলা করে সদ্য তোলা টমেটো, পেয়াজ ধনেপাতা মিশিয়ে কলাপাতায় অভিনব এক সালাদ খেয়ে অতিরিক্ত ঝালে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে দলবল সমেত কারও সদ্য গজানো পালং এর বেড মাড়িয়ে ফেলে অনুশোচনায় ভুগতাম।

দস্যিপানার চোটে প্রায়শই আমর ফ্রকের পিছনের বোতাম একটা দু’টো করে ছিঁড়তে ছিড়তে নাই হয়ে যেত, পেছনের বেল্টের দু’টোর সহাবস্থান কদাচিৎ দেখা যেত। মা চরম বিরক্ত হয়ে দুমাদুম কয়েক ঘা লাগিয়ে হয়তো সেলাই করে দিতো। কিন্তু ঘটনাগুলো এতটাই পৌন:পুনিক, যে আমার পিঠের অধিকাংশ স্থান মোটামুটি দৃশ্যমান থাকতো। অবশ্য তখনকার মানুষগুলোর মানসিক অসুস্থতা এতটা তীব্র পর্যায়ে যায় নি যে ওটাকে একটা শিশুর শরীর ছাড়া অন্য কোনো কিছু বলে ভাববে।

আমাকে প্রায়শই দেওয়ালে উঠতে হতো, তাসকিন - বাবুদের কাছে আমার সক্ষমতা জাহির করার প্রসঙ্গে। মাদার গাছের ডালে, বা মসজিদের ছাদে পাখির বাসায় পাখির ডিমগুলো দেখে রাখার মহান দায়িত্বগুলো চরম নিষ্ঠা সাথে পালন করতে হতো।

এসব কাজে আমার ফ্রকের ঝুলগুলো নিদারুণভাবে শত্রুতা করতে শুরু করেছিলো। একবার আমার নতুন কেনা হলদে রঙা চিকেন কাজের ফুলতোলা ফ্রকের ঝুলের পুরোটাই পি এমজি স্কুলের উঁচু দেওয়ালে লটকে গেলো চরম বিশ্বাসঘাতকতায়। আমি পুচ্ছছাড়া ময়ুরের মতো দেওয়াল থেকে নামতে কোরাস কন্ঠে সেকি হাসির রোল! ঈশ্বরের প্রতি ছল ছল অভিমান। ইস! আমি যদি ছেলে হতাম!

দিন গড়াল। ফ্রকের ঝুলের আকার বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে যোগ হলো অনুষঙ্গ । কয়েক প্রস্থ পোষাকের গ্রন্থিতে টানা হলো লক্ষন রেখা। ভুঁইফোড় স্বভাবটি শেষ হলেও মুখফোঁড় বদলালো না।

গুরুজনেরও বলতো মেয়েমানুষের মুখ যত বন্ধ, সংসার ততই শান্তির। জোরে হাসবে না, গলা তুলে কথা বলবে না, মুখের উপর কথা বলবে না, ধুপধাপ শব্দ করে চলাফেরা করবে না, খাওয়া সময় শব্দ হবে না কত কি! ঈশ্বর কে বললাম, ইস্ আমি যদি ছেলে হতাম!

আশপাশের পারিপার্শ্ব চোখে আঙুল এই ব্যবধানটা স্পষ্ট করতে শুরু করেছিলো। আমার সমবয়সী স্কুলফেরতা ছেলেগুলো পাড়ার মোড়ে সাইবার ক্যাফেতে বসে নেটে গুগল সার্ফিং করতো। আমরা তখন বাড়ির ছাদে বাগানে জল দিতে দিতে পরদিন ক্লাসের পদার্থবিজ্ঞানের ইকোয়েশন সমাধানের চিন্তায় হাবুডুবু খেতাম। তখন ক্ষণিকের জন্য মনের কোনে উঁকি দেয়। ইস্ ... আমি যদি ছেলে হতাম।

দু’বোন একসাথে স্কুল কলেজ থেকে ফিরতাম। পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানের চোখ গুলো অস্বস্তি তৈরির জন্য যথেষ্ঠ ছিলো। বাসার সামনে অচেনা লোকজনের মোটর সাইকেলের মহড়া মা বাবার কপালের ভাঁজকে দীর্ঘায়িত করতো। তার উপর শুভাকাংখীদের দিনরাতের পরামর্শ। দুই দুইখান মেয়ে ঘাড়ের ওপর, দেখতে ভালো, কোন খান দিয়ে কোন বিপদ ঘাড়ে চাপে, সময় থাকতে বিয়ে দেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। পড়াশোনাতো বিয়ের পরেও করানো যায়। দিদির প্রচন্ড অনশন, ধর্মঘট, কান্নাকাটি, হল্লাহাটি সত্বেও মাত্র উনিশ বছর বয়সে ওর বিয়ে হয়ে যায়। অথচ কি অসম্ভব সৃজনশীল ছিলো ও। তখন আফশোস ... আমরা কেনো ছেলে হলাম না!

ছেলে হয়ে ওঠার জন্য প্রানপণ সংগ্রাম শুরু করি। নিজের অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে সবসময় নিজেকে অতিক্রম করার চেষ্টা করি। নিজের যতটুকু অর্জিত বিদ্যা, সৃজনশীলতা, একাগ্রতা দিয়ে পায়ের নীচে একটা অবলম্বন খুঁজতে থাকি। যেখান থেকে দাঁড়িয়ে অন্তত উঁচু গলায় কথা বলা যাবে। পেয়েও গেলাম। ছোটখাট, মাঝারি সম্মানজনক চাকরী। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সাথে কিছুটা আত্মবিশ্বাস। যদিও সেটা মেরুদন্ড শক্ত করার মতো যথেষ্ঠ ছিলো না। সংসার, সন্তান ,পেশা সামলে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে থাকি। কারণ মনে হয়ে মেয়ে হিসেবে পথ চলাটা অতটা সহজ নয়। নিজেকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করতে হবে নিজের জায়গা তৈরি করতে গেলে। সময়ের সাথে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মস্থল বদলালো। চাকুরী পেলাম একটা, দুটো, চারটে।

সেখান থেকে দেখছিলাম তৃণমূল মেয়েদের অবস্থান। আজ হয়তো আমার অনেক সহকর্মীই আমার সাথে একমত হবেন না। তাদের হয়তো কোনো স্ট্রাগলই করতে হয় নি, বা করতে হয়েছে আমার থেকে বেশি। চেয়েছিলাম অন্যদের রাস্তাগুলো যাতে আমাদের থেকে একটু মসৃণ হয়।

অভিষ্ট লক্ষ্য ছিলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া। বিসিএস দিলাম। প্রথমবারে ভাইভা বোর্ডে মনে হলো পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে আমার জানার অনেক ঘাটতি আছে। যেগুলো হয়তো অনেকে চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে গিয়ে শিখে ফেলে। তখনও একবার মনের কোনে উঁকি দিয়েছে... ইস্।

নিজের ঘাটতিগুলো অনুধাবন করতে পারাটাও এক ধরনের সৃজনশীলতা। নারীদেরকে নিজেকে অতিক্রম করতে হয় নিজেরই অনুপ্রেরণায়। কারণ একবার ব্যর্থতার অন্তরালে হাজারো উৎসুক হাত অপেক্ষা করে করতালি দেবার জন্য। নিজেকে নিজে পুরস্কৃত করতে হয় , অনুপ্রাণিত করতে হয়।

আজ এই নারী ক্ষমতায়নের যুগে পুরুষের সাথে সমান তালে প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে, অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে ক’জন নারী পারছেন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অংশ নিতে? অথবা পৌঁছালেও তাদেরকে দেওয়া হয় না সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকারটুকু। তবে আশার বানী এটাই যে লক্ষ্য অর্জনের দাঁড়ি অন্তত ছুঁতে পেরেছেন ক’জনা।

সমানাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে যে গন্তব্য ছিলো এখন সেটা # Balance for betterment.
এই ব্যালান্স টা আসলে কাদের স্বার্থে সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

উনিশ শতকের শুরুতে যখন নারী শিক্ষা, নারী স্বাধীনতা বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করলো মূলতঃ পুরুষেরও যোগ্য সহধর্মিনীরই প্রয়োজনে। তারা এই প্রথমবারের মতো স্ত্রীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের একটা অভাব অনুভব করলেন।

বেগম রোকেয়া, সিমোন দ্য বোভেয়ার গলা তুলেছেন, প্রতিবাদ করেছেন, ধরেছেন নারী মুক্তির ঝান্ডা। পরিবর্তন এসেছে, সমতাও অর্জিত হয়েছে কিন্তু বাটখারাটা এখনো পুরুষেই হাতে। Equality র থেকে balance টা অনেক বেশি বানিজ্যিক। তাই নারী উন্নয়ন যতটা না সামাজিক উন্নয়ন সাধন করছে তার বেশি সাহায্য করছে পুরুষতন্তের বানিজ্যিক প্রচারণায়।

আশেপাশের সবাইকেই তো দেখি নারী বান্ধব। তাহলে দেশে এতো নারী নির্যাতন করে কারা? আর কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের অবমাননা করেই বা কারা? অবশ্য balance তারা ঠিকই ই maintain করেন কথায় আর প্রচারে।

এখন আর নিজেকে নারী বলে আফসোস হয় না। স্বত্তাকে ধারণ করে যে নারী কিনা হয় অন্তসত্বা, সে নারীর সৃজনশীলতা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এই নারীরাই পারবে সকল “না” কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বুক ফুলিয়ে এগিয়ে চলতে। বানিজ্যকীকরণ হোক আর প্রচারণাই হোক এ সুযোগে নিজের গলাটাতো তুলতে পারছে । নিজেদেরকে নিয়ে ভাববার অবকাশ পাচ্ছে।

শুধু দরকার চিন্তার আকাশটাকে একটুখানি প্রসারিত করবার। নিজের সৃজনশীলতাকে আরেকটুখানি জাগিয়ে নেওয়া ।

জাগো নারী জাগো বহ্নি-শিখা।
জাগো স্বাহা সীমন্তে রক্ত-টিকা।।
দিকে দিকে মেলি’ তব লেলিহান রসনা,
নেচে চল উন্মাদিনী দিগ্‌বসনা,
জাগো হতভাগিনী ধর্ষিতা নাগিনী,
বিশ্ব-দাহন তেজে জাগো দাহিকা।।
ধূ ধূ জ্ব’লে ওঠ ধূমায়িত অগ্নি,
জাগো মাতা, কন্যা, বধূ, জায়া, ভগ্নী!
পতিতোদ্ধারিণী স্বর্গ-স্খলিতা
জাহ্নবী সম বেগে জাগো পদ-দলিতা,
মেঘে আনো বালা বজ্রের জ্বালা
চির-বিজয়িনী জাগো জয়ন্তিকা।।


  • ৭৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সোনালী সেন

জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

ফেসবুকে আমরা