চলে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি

রবিবার, ডিসেম্বর ২, ২০১৮ ৮:০০ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি চলে গেলেন। ’৭১ এ চৌদ্দ বছর বয়সের এক বাচ্চা মেয়ে। কমান্ডারের নির্দেশে- একটা কলাগাছ বুকে নিয়ে নদী পার হয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পে গেলেন গুপ্তচর হিসেবে। সারা রাত নদী সাঁতরে ওই একা কিশোরী খরস্রোতা নদী পার হলেন। শত্রু শিবির কাছেই।

নোংরা কাপড় আর চুলের মধ্যে কাদা মেখে ‘পাগলীর’ বেশ ধরলেন। সারা শরীরে পায়খানা মেখে ঘুরতে থাকলেন ক্যাম্পের আশেপাশে। চারদিকে বমি আসার মতো নোংরা দুর্গন্ধ আর চিৎকার চেচামেচি করে মিলিটারি ক্যাম্পের সবাইকে বুঝালেন- তিনি আসলেই পাগলীনি।

দিন দিন এভাবেই- তারামন বিবি পাকিস্তানি ক্যাম্পের সমস্ত খবরাখবর নিয়ে আসতেন।

কতগুলো অস্ত্র আছে। কয়টা মেয়ে ক্যাম্পে প্রতিদিন ধর্ষিত হচ্ছে। পাকিস্তানি আর রাজাকাররা কোথায় ক'টায় অপারেশন চালাবে। সমস্ত ফিরিস্তি তিনি পাচার করে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে।

অথচ এই সংগ্রামী তারামন বিবির কিশোরবেলার স্বপ্ন ছিলো -রোজগেরে গিন্নি হওয়ার। গোলাভরা ধান ছিলো। ঐশ্বর্য্য ছিলো। পাকিস্তানি মিলিটারি এসে তছনছ করে দিয়েছিলো সব।

সেই ঘরছাড়া কিশোরী মেয়ে মায়ের সাথে ভিক্ষে করতেন। কচুর মাথা সেদ্ধ করে পেট চালাতেন। অন্য গাঁয়ে শরনার্থী হওয়ার পর কাজ পেলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাত রেঁধে দেয়ার চুক্তি হিসেবে।

মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার আজিজ মাস্টার তাকে রাজি করিয়েছিলেন নিজের ‘ধর্ম মেয়ে’ বানিয়ে। বলেছিলেন- পাকিদের ক্যাম্পে প্রতিদিন ধর্ষিতা বোনদের জন্য হলেও উনি যেন মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের এটুকু সাহায্য করেন।

এমনিতেও রাজাকারেরা ধরে নিয়ে যাবে, এজন্য খুঁজছে। নিজের ধর্মবাপের কথায় রাজি হয়ে তারামন বিবি ভাত রাঁধবার চাকরি নিয়েছিলেন, পেটের তাগিদে। নিরাপত্তার খাতিরে।

কিন্তু হাড়ি মুছতে গিয়ে একদিন ভারী অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন- আদর্শের জন্যই। চোখ বন্ধ করলে সে আদর্শ টের পাওয়া যায় না। কিন্তু দৃশ্যটা কল্পনা করতে চেষ্টা করতে পারা যায়।

যুদ্ধের গুলাগুলির মধ্যে গেরিলাদের ভাত রেঁধে দিচ্ছে এক ১৪ বছরের কিশোরী। ভাইদের প্রয়োজনে- পাকিস্তানি ক্যাম্পে শরীরে পায়খানা মেখে পাগলিনী বেশে গুপ্তচর হয়ে দিন কাটাচ্ছেন সেই তারামন বিবি।

গাছের আগায় উঠে পাকিদের অস্ত্র গুণতে থাকা এক চঞ্চল জেদী পাগলিনী। তারপর একদিন নিজেই মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে অস্ত্র চালনা করা বীর প্রতীক বিবি।

১৪ বছরের ছিপছিপে তরুণী দিনের পর দিন নোংরা ডোবার মধ্যে দিয়ে রেকি করছেন। পৃথিবীর সেরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত শত্রুসৈন্যের বুকের দিকে তাক করে স্টেনগান চালাচ্ছেন। আর ওই পবিত্র সুন্দর হাতে গুলি লেগেছে। দরদর করে রক্ত ঝড়ছে। তবুও দেশ স্বাধীন অবধি চলেছিলো তার সংগ্রাম।

দেশ স্বাধীনের পরেও কি কম? এই দেশ তাকে কতটুকু মূল্যায়ন করতে পেরেছে? তবুও, এইসব ত্যাগ তিতীক্ষা আর সংগ্রামের জন্য যে বারুদ লাগে। যে আদর্শ লাগে। তার নাম- দেশ, মাটি আর মা।

সেই স্বাধীন মাটিতেই যোগ্য শয়ন নিলেন তারামন বিবি। শ্রদ্ধা!


  • ১০৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

হাসনাত কালাম সুহান

অনুবাদক ও লেখক।

ফেসবুকে আমরা