"লজ্জা করো মেয়ে চুপ থাকো"র দিন শেষ

বুধবার, অক্টোবর ৩১, ২০১৮ ১০:৪২ PM | বিভাগ : আলোচিত


আমাদের সমাজে, পরিবারে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়, তুমি মেয়ে তোমার স্বভাব হবে চুপচাপ, সাত চড়েও না নড়া, তুমি মেয়ে তাই তোমার সাথে কোনো অন্যায় হলে তুমি নিজে তার জাস্টিস চাইতে পারবে না, অভিভাবকদের অবহিত করবে, তারাই বিবেচনা করবে তোমার সাথে কেমন জাস্টিস করতে হবে, আর যৌনহেনস্থা হলে তো আরো বেশী চুপ করে থাকতে হবে! এসব বললে লোকে তোমাকেই বদ মেয়ে বলবে! নিশ্চয় তুমি সুযোগ দিয়েছিলে না হলে পুরুষটা সুযোগ পেতো না!

কৈশোরে পাড়ার এক বখাটে ছেলে জানালা দিয়ে চিঠি ছুড়ে মারতো, কখনো পাথর মারতো, জানালার গ্লাস একবার ভেঙে ফেলেছিলো। বাইরে কাপড় শুকাতে দিলে সিগারেটের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিতো। আমি অসহ্য হয়ে মাকে বলেছিলাম, মা শুনে উল্টা আমাকেই দোষী করলো যে আমি পাত্তা না দিলে ছেলেটার এতো সাহস হতোই না। আর পুরষ্কার হিসেবে আমার বাসা থেকে বের হওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিলো। এই আমার শিক্ষা! আমি তারপরে যতোবার হ্যারাসড হয়েছি কোনদিন কাউকে বলি নি, কখনো নিজেই প্রতিবাদ করেছি, কখনো চুপচাপ থেকেছি।

প্রিয়তি তার সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ সেদিন করতে পারে নি, এমন অনেকেই করতে পারে নি, পারছে না। পুরুষরা এটা ভালো করেই বুঝতে পারে যে মেয়েরা প্রতিবাদ করতে পারবে না, কারণ এসব প্রকাশ করলে যতোটুক না সে ন্যায় বিচার পাবে তারচেয়ে বেশী পাবে লাঞ্চনা, অকথ্য ভাষায় গালাগালি। লোকে বলবে নিশ্চয় সুযোগ দিয়েছিলো তাই করেছে! আর না হলে নিজের কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য সম্মানিত লোকের নামে অপপ্রচার চালাচ্ছে! সমাজ কিন্তু লোকটাকে হেয় করবে না করবে মেয়েটাকেই, লোকটা তার নোংরামী উন্মোচন হলেও বুক ফুলিয়ে হেঁটে বেড়াবে, আর মেয়েটা মুখ লুকিয়ে থাকবে, লোকটা পুরুষত্বের দম্ভে আত্ম-অহংকার করে বলে বেড়াবে, আরে পুরুষরা তো একটু এমনই হয়!

একটা কথা আমি বুঝি, কেউ যদি নিজ থেকে না মনে করে আমি অপরাধ করেছি তাহলে তাকে যতোই বিচারের কাঠ গড়ায় দাড় করানো হোক না কেনো, সে নত হবে না, ঠিক তেমনি কেউ যদি অপমানিত বোধ না করে নিজের অপকর্মের জন্য নিজে লজ্জিত না হয়, সমাজের সবাই তাকে যতোই অপমান করার চেষ্টা করুক আর লজ্জার থু থু দিক, তা তার গায়ে লাগবে না।

নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন যখন তার আত্মজীবনি "ক" তে লিখেছিলেন বিভিন্ন সময় সমাজের সম্মানিত লোকদের আসল চেহারাটা আসলে কি! তখন সেই পুরুষদের কিন্তু ধিক্কার দেয়া হয় নি! তারা ঠিকই আগের মতোই গণ্যমান্য হয়ে সমাজে বসবাস করেই গেছে! উল্টো তসলিমা নাসরিনের নামে একশো কোটি টাকার মানহানির মামলা করে তাঁর বই অশালীন বলে রিট করে ব্যান করে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রগতিশীল মানুষরা তসলিমা নাসরিন কতোটা লজ্জাহীন নারী তার ব্যবচ্ছেদ করে গালাগালি শুরু করে, তার বই পাঠের অযোগ্য, তার বই কোনো সাহিত্যের মধ্যে পরে না এসব বিবৃতি দেয়। আর সমাজের পুরুষরা মুখ টিপে হাসে, তাদের মনোবাসনা চরিতার্থ করার জন্য আবার সুযোগ খোঁজে। কিন্তু সেদিন যদি তসলিমার কুৎসা না করে যারা অপরাধী তাদের কুৎসা করা হতো আজ এতো মেয়ে হ্যারাসড হতো না। বন্ধ কেবিনে কোন মেয়ের বুকে হাত দিতে গেলে লম্পট পুরুষেরা দু'বার ভাবতো।

আমি স্যালুট জানাই প্রিয়তিকে যে মেয়েটা দেরি করে হলেও সাহস সঞ্চয় করে বলতে পেরেছে তার সাথে হওয়া হ্যারেসমেন্টের কথা। সে পুরুষতন্ত্রের বানানো "লজ্জা করো মেয়ে চুপ থাকো" বচন সম্পুর্ন উপেক্ষা করে #Me_too মুভমেন্টের সামনে এনেছে তিন বছর আগে তার সাথে করা রঙধনু গ্রুপ-এর চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের যৌন নিপীড়নের কথা। আরো মেয়েরা তাদের সাথে হওয়া বিভিন্ন সময়ের যৌন হয়রানি সামনে আনুক।

লজ্জা নির্যাতিত মেয়েটির না, লজ্জা সেই পুরুষের, যেই পুরুষ মনে করে কোনো মেয়েকে বদ্ধ ঘরে একলা পেলে তাকে অনেক কিছুই করা যায়।


  • ১২৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সৈয়দা সুমাইয়া ইরা

চাকুরীজিবি, নারীবাদী।

ফেসবুকে আমরা