চিরবিজয়িনী জাগো জয়ন্তিকা

শনিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৮ ১:০৭ AM | বিভাগ : আলোচিত


একজন তার পেশা জীবনে অনুকরণীয় অথবা প্রজ্ঞাবান বলে যে তিনি সকল কাজেই সহিহ তা কিন্তু নয়। প্রজ্ঞা কখনোই নৈতিকতার বা চারিত্রিক গুণাবলীর পরিপূরক নয়। একজন যৌন নিপীড়ক সব সময়ই নিপীড়ক, এখানে তার পেশা অথবা রাজনৈতিক আদর্শ কিংবা প্রভাবশালী পরিচয়ের আড়ালে তিনি নিপীড়ণকে আড়াল করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক প্রভাব বিস্তারই নিপীড়নের মধ্যেই পড়ে। আমার এই গৌরচন্দ্রিকার অবতারণা মূলত #metoo আন্দোলন নিয়ে বতর্মান প্রেক্ষাপটে একজন স্বনামধন্য লেখকের যৌন নিপীড়ক ভূমিকা ও তার কিছু অনুসারীদের ইঁদুর দৌড় নিয়ে।

আমাদের মতো দেশে যেখানে একটা মেয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক জীবনে নিজের সমতা অথবা অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রীতিমত যুদ্ধ করে যায় কিংবা নিজের অধিকারটুকু প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে, হয়তো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে মুখ ফুটে তার সাথে ঘটে যাওয়া বা তার জীবনে ঘটে যাওয়া সেই কালো অধ্যায়গুলোকে সবার সম্মুখে নিয়ে আসার সুযোগ পায় না, সেখানে #metoo আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে এক চেতনার নাম, এক অনুচ্চারিত প্রতিবাদের নাম, যা মূলতঃ এমন একটা প্লাটফর্ম যেখানে একজন যৌন নিপীড়কের মুখোশ সহসাই উন্মোচন করে নারী তার সাথে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনাগুলো সবার সামনে নিয়ে আসেন।

সারাবিশ্বে #metoo ঝড় তাই বাংলাদেশের মেয়েদের শিখিয়েছে কিভাবে কোনো জড়তা ছাড়াই নিজের সাথে ঘটে যাওয়া সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করতে, যাতে শুধু নারীরাই নয়, তার পাশাপাশি সমাজের আপমর জনগন সচেতন হন, কারণ, প্রতিটি নারীইতো কারো মা, বোন, স্ত্রী বা কন্যা। সর্বপরি, #metoo এখন সময়ের প্রতিবাদী ঝড়, যা হয়তো অনেকেরই ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দিয়েছে। আর তাই, এই আন্দোলন থেকেই তৈরি হয়েছে নতুন ডিসকোর্স। এই আন্দোলন থেকে তাই বাদ পড়ে নি সমাজের প্রভাবশালী উচুতলার তথাকথিত মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভদ্রবেশী শয়তানগুলো, যারা তাদের বিকৃত যৌন পিপাসা মেটাবার জন্য কোনো না কোনো ছুতায় অসহায় নারীটির সুযোগ নেন (অসহায় সেই অর্থে, যখন নারীটি নিপীড়নের শিকার)।

একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করি, কিছুদিন আগে নিজের ব্যাক্তিগত কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের পরিবর্তে পাবলিক বাসে উঠেছিলাম। উঠে দেখি একটি সীটও খালি নেই। মেয়েদের জন্য রিজার্ভ সীটগুলোতেও ছেলেরা বসে আছে। আমি বাসে উঠে যখন কন্ডাক্টরকে বললাম,

"এগুলোতো নারী আসন, উনাদের বলুন উঠে যেতে"

রীতিমত এক দীর্ঘ যুদ্ধের পরে একজন গজ গজ আর সমানে বাজে কথা বলতে বলতে যদিওবা সিট ছাড়লো, পিছন থেকে কথার বাণে ততক্ষণে আমি জর্জরিত, আমিও দমবার পাত্রী নই। পরের স্টপেজ থেকে আরও দু’জন ভদ্রমহিলা উঠলেন বাসে। আমি দেখলাম উনারা দু’জন একবারের জন্যও বাসের সিটগুলো ছাড়তে বললেন না, যখন আমি বললাম উনাদের সিটগুলো ছেড়ে দিন, তখন তো চারপাশের অশ্লীল কটুক্তির তোড়ে আমারই ত্রাহি মধূসুধন অবস্থা! একটা বাসের সিট নিয়ে যেখানে এত যুদ্ধ সেখানে এই দেশে নিজের লাঞ্চনার বঞ্চনার আর অপমানের কথাটি যারা প্রকাশ করার গাটস রাখেন, আমার কাছে তারা নমস্য, তারাই পথটা তৈরি করে দিচ্ছেন কিভাবে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়।

সম্প্রতি এই সমাজের দুইজন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে বেশ তোলপাড় চলছে অনলাইনে। একজন সাংবাদিক, অপরজন শিক্ষক। সাংবাদিক ভদ্রলোক জীবিত, শিক্ষক প্রয়াত। প্রয়াত ভদ্রলোক শুধু শিক্ষকই নন, একজন প্রথিতযশা নাট্যব্যক্তিত্বও বটেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, এই সমাজেরই কিছু পুরুষ ভাবেন, শুধুমাত্র মৃত বলে, অথবা যথেষ্ট প্রমাণ ছাড়া কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা যায় না। একজন মানুষ মৃত বলে, তিনি সকল কিছুর উর্ধ্বে উঠে যাবেন, সেটা বোধ করি ঠিক নয়। কারণ একজন নারী যৌন হেনস্থা হবার জন্য প্রস্তুত থাকেন না, এই ঘটনা তার ইচ্ছার বিপরীতেই ঘটে। সুতরাং যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ নিয়ে তিনি প্রস্তুত থাকবেন, এমনটা ভাবা পুরুষতান্ত্রিকতার এক ধরনের মার্জিত বহিঃপ্রকাশও বটে। ভাবটা এমন,

''এত যদি হেনস্থার স্বীকার, তবে আগে কেনো প্রকাশ করতে বা আইনের আশ্রয় নাও নি''!!

আরে ভাই, যেখানে চিন্তায় মজ্জায় অসমতা বিরাজ করে সেখান বাক স্বাধীনতা নিরবে কাঁদে। আর #metoo কিন্তু বিচার নয়, বরং নিজের গ্লানির কথা প্রচার করে সমাজের এই অন্ধকারকে প্রকাশ করার এক আলোক বর্তিকা। এটা এক ধরনের চেতনার নাম, যেখানে প্রকাশিত সত্য নারীকে আরও প্রতিবাদী হতে প্রকারন্তরে সত্য প্রকাশে সাহসী করে তোলে। #metoo তাই একটি জয়গাথা। নাম না জানা অসংখ্য নারীর সাথে ঘটে যাওয়া এক প্রতিরোধের নাম। সহস্র বছরের লাঞ্চনার বিরুদ্ধে এক তীব্র ধিক্কারের মূর্ত প্রতিমূর্তির নাম #metoo।

শিক্ষক ভদ্রলোকের অসংখ্য গুণগ্রাহী দেশজুড়ে। উনার ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন করার দুঃসাহস করবে না তার চরম শত্রুও। অনেকের কাছেই তিনি পীর বা গুরুদেব। যে কারণে বাতির নীচের অন্ধকারের প্রসঙ্গটুকু উত্থাপিত হতেই পীরের সম্মান রক্ষার জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মুরীদকূল। "প্রমাণ চাই, প্রমাণ চাই" ধ্বনি তুলে মেতে উঠেছেন "ভিক্টিম ব্লেইমিং" এর নোংরামিতে। যেন "পোষাক ঠিক ছিলো না বলেই ধর্ষিত হয়েছে "নাটকের পুনঃ মঞ্চায়ন। হতবাক হয়ে যাই, যখন অনেক অনেক জ্ঞানী গুণী মানুষদেরকেও দেখি এই নোংরামির মিছিলে সামিল হতে। মেইল শভিনিজম এভাবেই রহিত করে মনের সুস্থ চিন্তার গতি প্রকৃতিকে। যেভাবে করে এসেছে বিগত হাজার বছর ধরে। মিটু এই পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করার এক উদাত্ত আহবানের প্রতিচ্ছবি মাত্র।

পরিশেষে বলবো, সমাজটাকে কলুষ মুক্ত করতে গেলে এইসকল মানুষরুপী যৌন নিপীড়কদের চিহ্নিত করতে হবে, তবেই এই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা অপশক্তিগুলোর বিনাশ হবে। "পেশা তার হোক না যাই, নিপীড়ক নিপীড়িকই"। আসুন সকল ধরনের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই।

শেষ করি বিদ্রোহী কবির অমর পঙক্তি দিয়ে,

"জেগে ওঠো ভগিনী, ধর্ষিতা নাগিনী,
চির বিজয়িনী জাগো জয়ন্তিকা "


  • ৩২৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সুমনা গুপ্তা

সহকারী অধ্যাপক ইংরেজি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুকে আমরা