ভিআইপি কালচার ও জনদূর্ভোগের সংস্কৃতি

রবিবার, জুলাই ২৮, ২০১৯ ১১:৪০ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


বর্তমান সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক আলসারের নাম "ভিআইপি পরিসেবা"। এই ভিআইপি পরিসেবা এখন এমন আকার ধারণ করেছে যে ঢাকা শহর বা এর আশেপাশে শুধু ভিআইপি চলাচলের কারণে অনেক সাধারণ মানুষের কর্মঘন্টার অপচয় হচ্ছে যাচ্ছেতাইভাবে। অমুক ভিআইপি আসবেন বলে একপাশের রাস্তা বন্ধ করে দেয়া তো এখন মামুলি ব্যাপার। আবার এখন কোনো কারণে রাস্তায় জ্যাম হলেই ধরে নেয়া হয় সেই সড়ক বা এর আশেপাশের সড়কে ভিআইপি যাতায়াত করছেন। অতএব রাস্তা বন্ধ। আর আমদেরও জীবন যুদ্ধের রঙ্গমঞ্চে সব গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে দেশের রাজধানীতে যানযট সমস্যাতে এমনিতেই মানুষ নাকানি চুবানি খায় প্রতিনিয়ত সেখানে যেকোনো কাউকে ভিআইপি পরিসেবা দেয়া এখন যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নূতন ক্যানসারের নাম।

প্রথমেই নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। ঢাকার অদূরের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজের জন্য আমি এবং আমার আর একজন কলিগ মোটামুটি মানের একটি পাবলিক বাসে রওনা হই। আরিচার কাছাকাছি গিয়ে যখন পৌঁছেছি তখন গাড়ির জ্যামে অবস্থা খারাপ। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম, পুলিশের হুইসেলে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত। কী ব্যাপার কী হলো!? জিজ্ঞেস করতেই জানলাম, পেছনের গাড়িতে ম্যাজিষ্ট্রেট স্যার আছেন। তিনি মহান দেশের মহান ভিআইপি তাই তাঁকে আগে ফেরিতে তুলে দিতে হবে। প্রফেশনাল জায়গা থেকে নয়, এমনিতেই মনটা একটু খারাপ হলো। একজন সদ্য জয়েন করা ম্যাজিষ্ট্রেট একটি দেশের ভিআইপি অথচ একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক সাধারন মানুষ! আমার সাথে আমার যে সহকর্মী ছিলেন ওনার একাডেমিক এক্সিলেন্সি ও রেজাল্ট খুব ভালো। একটি প্রথম শ্রেনীর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও এক্ষেত্রে কিন্তু তিনি সাধারণ। আর ক্ষেত্র বিশেষে ক্লাসের মিডিওকার স্টুডেন্ট শুধু মাত্র বিসিএস নামক পরীক্ষার মাধ্যমে হয়ে গিয়েছেন ভিআইপি!

আসলে, সমস্যাটা আমাদের সিষ্টেম এর। যাদের কাজ সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়া মানে সাধারন মানুষের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি, আমলা অথবা প্রশাসনের কর্মকর্তারা তারা সাধারণ সুবিধাগুলোকে অসাধারণ ভাবেই পেতে চান অথবা তাই পেতে পেতেই অভ্যস্ত। আমি সবার কথা বলছি না, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেসস্টাডি এমন তথ্যই দেয়। তাই জনগনের সেবা করতে গিয়ে সাধারণ জনগন যে অসাধারণ বিড়ম্বনায় পড়েন তা এই সব ভিআইপি কালচারের জন্য। বোধকরি উনারা সেটা অনুধাবন করেন না অথবা বেমালুম ভুলে যান। ক্ষেত্র বিশেষে উনাদের গাড়ি আবার রং সাইড দিয়ে যাবার কালচারকেও অনুপ্রাণিত করে। বেশ কিছুদিন আগে টিভিতে দেখেছিলাম এক সচিবের গাড়ি রং সাইডে যাওয়ায় দায়িত্বরত পুলিশ সেই গাড়ি আটকে দিয়েছিলেন আর আমরা তাকে প্রশংসার বন্যায় ভাসিয়েছিলাম। হয়তো এই অপসংস্কৃতির চর্চায় তার এই কাজ সত্যিকার অর্থেই প্রশংসার দাবী রাখে। কিন্তু ওই পুলিশটির পেশাগত কাজই কিন্তু সিষ্টেমটাকে শ্রেনী ও দলমতের উর্ধ্বে উঠে ঠিক রাখা। তাই এক্ষেত্রে নিজ নিজ স্থান থেকে দায়িত্ব পালনটাই বেশী খুব প্রয়োজনীয়।

আজ পত্রিকা মারফত এবং টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে জানতে পারলাম এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। শুধুমাত্র নৌপরিবহন মন্ত্রনালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ভিআইপি সুবিধা দিতে শত অনুরোধ সত্বেও রোগীর গাড়িটিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে আর এর পরিনতি এক করুণ ও নির্মম মৃত্যু। ৯৯৯ এ কল করেও যেখানে মেলেনি তার কোন সমাধান। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে এই ভিআইপির ক্যাটাগরি ভিন্ন। ক্ষমতার অপব্যবহার যখন রাষ্ট্র যন্ত্রের হাতিয়ার তখন সাধারণের মৃত্যু তো এক মামুলি ব্যাপার। এজন্য প্রতিনিয়ত বেঁচে থেকেও আমরা মরছি মননে। হায়রে স্বদেশ!! এখানে জীবনের দাম খুব কম আর ভিআইপিরা এক একজন ক্ষমতার দাপুটে প্রভু।

মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সচিব একটি পত্রিকায় সাথে সাক্ষাকারে জানিয়েছিলেন, "মন্ত্রীরা কোনো আলাদা সুবিধা নেন না। তারা একটা প্রটেকশন গাড়ী এবং গানম্যান নেন। তাদের রাস্তা বন্ধ করার নিয়ম নেই। এটা শুধু ভিভিআইপিদের জন্য আছে সেটা এসএসএফ আইন।" যদি তাই হয়, একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ভিআইপি প্রোটোকল একটা মানুষের জীবনের দামের থেকে বেশী হয় কী করে?

পরিশেষে, এই ভিআইপি কালচারের প্রাকটিস ও এর পুনঃমূল্যায়ন করা এখন সময়ের দাবী। প্রথমত এর অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং এর জন্য সাধারন জনগনের যে হয়রানি হচ্ছে, জনগণ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে তা অনুধাবন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নিতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে আমরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাস করি যেখানে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার উৎস জনগন।


  • ৪৬৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সুমনা গুপ্তা

সহকারী অধ্যাপক ইংরেজি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুকে আমরা