‘গা ঘেষে দাঁড়াবেন না’ টি-শার্ট ট্যাবু ভাঙছে? নাকি ট্যাবুকে আরও পোক্ত করে তুলছে?

বুধবার, এপ্রিল ১০, ২০১৯ ৮:০৭ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


‘ভিড়ের আড়ালে বুকে হাত
গুরুত্বহীন
শিশ্নচাপ...
মাঝে মাঝে বেশ তো’।
-জয়িতা ভট্টাচার্য, প্রজাপতি বিস্কুট, চৌকাঠ পত্রিকা, বইমেলা সংখ্যা, ২০১৯।

এমন কবিতা লিখলে মেয়েদের বেশ্যা, ছিনাল, খানকি-মাগী বলে পুরুষকুল হামলে পড়ে। যারা বাস ট্রেনে উঠলেই মেয়েদের শিশ্নচাপ দেয়ার সুযোগ খুঁজে তারাই মেয়েদের মুখে এইরকম প্রথাহীন উচ্চারণে সমাজ সংসার রসতালে যাবার কল্পনা করে অক্কা পায়। মেয়েদের তো এরকম ভালো লাগা ভালো নয়! এরকম ভালো লাগা কেবল পুরুষ মানুষ অনুভব করবে। মেয়েদেরও যে এরকম লাগতে পারে এটি পুরুষ মেনে নিবে কিভাবে? তারচেয়ে ‘গা ঘেষে দাঁড়াবেন না’ তাদের চিরচেনা নারীর পুরুষ স্পর্শ থেকে নিজেদের বাঁচানোর তীব্র আকাঙ্খা, চিরন্তর ছুৎমার্গ বরং পুরুষকে স্বস্তি দেয়। আরিফ আজাদ নামের যে ইসলামিক ছাগু ফেইসবুকে পপুলার, সেও লিখেছে, গা ঘেষে দাঁড়াবেন না- এটা ইসলামের কথাই। ইসলাম নারী পুরুষদের গা ঘেষে দাঁড়ানো কঠোরভাবে প্রতিহত করতে বলেছে। এতকাল এসব কথা ইসলামের মোড়কে যখন তারা বলেছে তখন এই মেয়েরাই তাদের মৌলবাদী বলেছে। শেষতক নাকি ইসলামী জীবন বিধানই ঘুরিয়ে পেচিয়ে দাবী করা হচ্ছে… ইত্যাদি। মনে করে দেখুন, এই ইস্যুতে আমার প্রথম লেখাটিতে আমি বলেছিলাম এগুলো মোল্লাতন্ত্রের পছন্দ হবে। সেটারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি…।

জয়িতা ভট্টাচার্য ভারতীয় কবি। তার এই তিন লাইনের কবিতাটুকু ছাড়া তার সম্পর্কে আর কিছু জানি না। কবি মলয় রায়চৌধুরী টাইম লাইনে এই কবিতার কয়েকটি লাইন পড়ে চমকে গিয়েছিলাম। মলয় রায়চৌধুরী নিজেই সেখানে মন্তব্য করেছে, ‘ক'জন মহিলা কবি এমন লিখতে পেরেছেন’? সত্যিই কয়জন লিখেছেন এরকম কথা? বরং আমাদের নারী লেখকদের লেখা পড়লে মনে হতে পারে যৌন অনুভূতি বলতে নারীদের কিচ্ছু নেই। যৌন ব্যাপারটা কেবলই পুরুষদের এবং এটি নারীর প্রতি একটা নিপীড়ন ছাড়া আর কিছু নয়। বাসে মানুষের ভীড়ে যখন আমার পিঠে কোন নারী স্তন এসে চেপে ধরে, যেখানে আমি পিঠ দিয়ে চাপ সামলাচ্ছি, যে নারী চেপে ধরে আছেন আমাকে, তিনিও দায়ী নন, তবু নারী শরীরের স্পর্শে কি আমার ভালো লাগবে না? আবার একই রকম করে কোন পুরুষের স্পর্শ কি নারীদের ভালো লাগবে? আমাদের জানা নেই। কারণ কোন মেয়েই কখনই তাদের গোপন কথাটি লেখেন না। পৃথিবীতে এত নারী লেখক কিন্তু তারা কখনই এভাবে লিখেন না। তসলিমা নাসরিনকে সবচেয়ে যে কারণে আমার কাছে ভালো লাগে- তিনি তার যৌন জীবন নিয়ে অকপট লিখেছেন। জয়িতা ভট্টাচার্য নামে এই কবি তার কবিতায় চিরচেনা নারী ইমেজ ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে দিয়েছেন! এই কবিতা না লিখে তিনি যদি প্রতিবাদী কবিতা লিখতেন, বর্বর ধর্ষক পুরুষ চোখে আঙ্গুলে শিশ্ন নিয়ে ঘুরে… সেটাও যৌন নিপীড়ণের বিরুদ্ধে বলা হতো। কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্য পুরুষের গড়ে দেয়া ‘নারী’ ইমেজ ভেঙ্গে দিয়েছেন। নারীরা তাদের বুকে কেউ হাত দিলে বলতে পারে না, কেবল বলতে পারে ‘অসভ্যতা’ করা হয়েছে। কারণ আমাদের নারী ইমেজে তারা কখনই একপাল মানুষের সামনে তার বুকে হাত দেয়ার কথা বলতে পারবে না। এগুলো কোন ভদ্রঘরের মেয়ে বলতে পারে না। মেয়েরা যখন চিরচেনা সেই নারী ইমেজ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে পুরুষতন্ত্র তখন সবচেয়ে ভীত হয়ে উঠে…।

‘গা ঘেষে দাঁড়াবেন না’ টি-শার্ট কেন্দ্রিক প্রচারণায় আমরা যারা দ্বিমত করেছিলাম তাদেরকে বাসে ঘষাঘষিকারী যৌন নিপীড়ণকারদের দালাল বলে, যৌন নিপীড়নকারী বলে গায়ের ঝাল মেটাতে যারা চাচ্ছেন তাদের কিচ্ছু বলার নেই। আমাদের আপত্তি ছিলো এরকম লেখা নারীদের শরীরকে আরো বেশি করে ‘নারী’ করে তোলে কিনা সেই আশংকাটা থাকে। অথচ আমরা তো নারীদের যৌন হয়রানীর বিরুদ্ধে সব সময়ই ছিলাম। তাহলে এইসব চেনাজানা মুখগুলি আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রুপে মেতে উঠেছে কেন? সামান্যতম দ্বিমত শুনতে অভ্যস্ত নয় এমন মানুষই যে কোন ‘বাদ’-কে কাল্টে পরিণত করে ফেলে। তাই নারীবাদও কেউ কেউ কাল্টে পরিণত করে ফেলেছেন। ইনারা মনে করেন, পুরুষ কখনই ভালো হতে পারে না। পুরুষ মাত্রই ধর্ষক। তাদের বিচি ছেঁচে দিতে হবে। তাদের ইয়ে কেটে দিতে হবে।…

বেশ বেশ ভালো কথা, তাহলে আপনাদের কাছে সমাধানটা কি? পুরুষকুলকে তো আর অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়ে কিংবা নিজেরাই অন্যত্র পৃথক বসবাস করতে পারবেন না? তাহলে নারীবাদের দর্শনটা আপনাদের সংজ্ঞায় কি দাঁড়ালো? এই যে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা নারীদের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে, হয়ে উঠছে নারীবাদী তাদের কাছে আপনাদের বক্তব্যটা কি? তারা তো বিভ্রান্ত হয়ে উঠেছে। একটা ডবকা মেয়ে দেখে তার ভালো লাগাটা ঠিক হচ্ছে কিনা, লম্পট আর প্রেমিকের সংজ্ঞা কি, একটা মেয়ের শরীর কামনা করা কি অন্যায়? আর যেসব পুরুষ ‘সব পুরুষই ধর্ষক’ বক্তব্যে একমত হচ্ছেন, এই কথার বিরোধীতাকে ট্রল করছেন ‘সব পুরুষ এক না’ বলে, তারা নিজেরা তাহলে এই ‘ইউনিভার্সাল ট্রুথ’ মানে পুরুষ মানেই ধর্ষক’ এই ক্যাটাগরিতে পড়েন কিনা?

যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নারীদের টি-শার্ট প্রচারণার উদ্দেশ্য নিয়ে দ্বিমত না থাকলেও এর বক্তব্য নিয়ে দ্বিমত ছিলো- আছে। তার মানে আমরা যৌন নিপীড়নের পক্ষে- এমন সরলীকরণের চেষ্টা পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার মানসিকতা। এই মানসিকতাই ফেইসবুক ফেমিনিজমে রূপ নিয়েছে। আজকাল মেয়েদের ইস্যু নিয়ে কথা বলতেই ভয় লাগে- এই না আমাকে নারী বিদ্বেষী বলে বসে! আমার ভয় হয়, নারীবাদীরা পুরুষতন্ত্রের নারী ইমেজের মতই নিজেদের একটি কৃত্রিম খোলসে ঢেকে আরো একটি মিথ্যে ইমেজে তাদের নেচারাল চরিত্র আড়াল করে ফেলবে। সেখানেই জয়িতা ভট্টাচার্য অনন্য। কে জানে- এখন এই মহিলা কবিকেই না কোন মেয়ে পুরুষতন্ত্রের দালাল, যৌন নিপীড়নের প্রচারক বলে বসে…।


  • ১৩৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সুষুপ্ত পাঠক

বাংলা অন্তর্জালে পরিচিত "সুষুপ্ত পাঠক" একজন সমাজ সচেতন অনলাইন একটিভিস্ট ও ব্লগার।

ফেসবুকে আমরা