রাস্তা আটকে নামাজ পড়া কি ধর্মীয় অধিকার?

মঙ্গলবার, মে ৮, ২০১৮ ৬:২৭ PM | বিভাগ : মুক্তচিন্তা


রাস্তা আটকে নামাজ পড়ার অধিকারের জন্য ভারত উত্তাল! আপনি যদি খেয়াল করে দেখেন, সারাবিশ্বে মুসলমানরা সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে নামাজ বোরখা ইত্যাদি অধিকার চেয়ে। তাদের দাবী এসব নিয়ে তাদের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে। শিক্ষা অর্থনীতি সামাজিক ন্যায় বিচারের মত প্রসঙ্গ না তুলে তারা বোরখা নামাজ পড়ার অধিকার চায়। তাদের এই চাওয়াতে হঠাৎ শুনে মনে হতে পারে তাদেরকে বুঝি কেউ নামাজ পড়তে বাধা দিচ্ছে। তাদেরকে বুঝি বোরখা হিজাব পরতে বাধা দিচ্ছে। আসলে ঘটনা হচ্ছে এরকম, একটা লোক তালগাছের উপর নামাজ পড়তে উঠেছে আর লোকজন তাকে ধমকে দমকলবাহিনী ডেকে নিচে নামানোর পর সে চিৎকার শুরু করে দিলো, তাকে নামাজ পড়তে বাধা দিচ্ছে…। লোকটা চেয়েছেই যেন তাকে বাধা দেয়া হয় যাতে সে দাবী করতে পারে তাকে নামাজ পড়তে বাধা দেয়া হচ্ছে। ঠিক তদরূপ রাস্তা আটকে জ্যামজট বাধিয়ে জুম্মার নামাজ পড়ার অর্থ হচ্ছে নামাজের শোডাউন করে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এতে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার হবে, অমুসলিম প্রশাসন এতে বাধা দিতে আসলে চিৎকার করে নামাজে বাধা দেয়া হচ্ছে বলে শোরগোল তুলে মুসলিমদের মধ্যে তৌহদী চেতনাকে জাগ্রত রাখা যাবে।হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টার প্রকাশ্য স্থানে নামাজ পড়া প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘নামাজ পাঠ হওয়া উচিত মসজিদ, ঈদগাহের মতো নির্দিষ্ট ধর্মীয় স্থানে। যদি জায়গার অভাব হয়, তবে নিজের বাড়িতে নামাজ পড়ুন…’। এই ভদ্রলোক হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি করেন বলেই কি তার যৌক্তিক কথাকে আগ্রাহ্য করব? বাংলাদেশের মত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে জুম্মার নামাজ পড়তে রাস্তা আটকে রেখে যে সমস্যার সৃষ্টি করে তার অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। যে কোন খোলা স্থানে নিয়মিত নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যও সৎ নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জায়গা দখল করা। বাংলাদেশের ষাট ভাগ মসজিদই অবৈধ জায়গা দখল করে বানানো। চার লেন রাস্তা বানাতে গিয়ে সরকার দেখেছে মহাসড়কের পাশে জায়গা দখল করে কয়েক মাইল পর পর একটা করে মসজিদ খাড়া হয়ে আছে! এই মসজিদ ভাঙ্গতে গেলে ‘মুসলমানদের মসজিদ ভেঙ্গে ফেলছে’ আওয়াজ তুলে সারাদেশে জঙ্গি অবস্থা তৈরি করে ফেলবে। ভারতে একইভাবে খোলা জায়গায় নামাজ পড়তে পড়তে এক সময় সে জায়গাটা মসজিদ বানানোর জন্য মুসলমানরা দাবী করে বসে। মূলত এরকম অভিযোগ থেকে খোলা স্থানে নামাজের বিরুদ্ধতা করা হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু হিন্দুত্ববাদীরাই এইসব অপকর্মের বিরোধীতা করছে তাই সেটা পুরোপুরি সম্প্রদায়িক ট্যাগ লেগে গেছে। এই ব্যর্থতার দায় ভারতের সেক্যুলাদের। তাদের অনেক আগেই রাস্তা আটকে, সরকারী খাস জমিতে নামাজ পড়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিলো। তারা এগিয়ে এলে আজকে হিন্দুত্ববাদীদের এখানে রাজনৈতিক মুনাফা লোটার কোন সুযোগ থাকত না।

বাংলাদেশে আমরা যারা ব্লগ-ফেইসবুকে লেখালেখি করছি তারা দীর্ঘকাল ধরে রাস্তা আটকে নামাজ পড়ার বিরোধীতার কথা লিখে আসছি। ইউরোপ আমেরিকাতে এই ঘটনা নিয়ে প্রচুর ট্রল হয়েছে। দেখার বিষয় এবার ভারতের এই ঘটনায় আমাদের কতজন বন্ধুর গণেশ উল্টে যায়! কারণ দেশটা এখানে ভারত। ‘ভারত’ এদেশে একটা ফ্যাক্ট! এ কারণেই বাংলাদেশের মূলধারার মিডিয়ায় শিরোনাম হয়েছে ‘ভারতে মুসলমানদের নামাজ পড়তে বাধা দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা’! একটা পোর্টাল লিখেছে, ‘ভারতে বিজেপি শাসিত হরিয়ানায় প্রকাশ্য স্থানে নামাজ পড়তে দেয়া হবে না বলে হিন্দুত্ববাদী জোটের পক্ষ থেকে হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে’। বলা বাহুল্য তথ্য বিকৃত করা হয়েছে এখানে। ঈদগায় নামাজ পড়ার বিষয়ে কিন্তু কেউ আপত্তি করেনি। অথচ মিডিয়া এমনভাবে লিখে ফেলেছে যেন মনে হতে পারে ভারতে মুসলমানদের হিন্দুদের ভয়ে গোপনে নামাজ পড়তে হবে…। বাংলাদেশে এখন সাংবাদিকতা করে মূলত দুটো বড় গ্রুপ। যারা আদর্শগতভাবে ফান্ডামেন্টালিস্ট মুসলিম অথবা প্যান ইসলামিস্ট মুসলিম।

সমস্যা সেই একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ভারতের অমুসলিম সেক্যুলারপন্থি মানুষজন ইসলাম আর মুসলমানকে আবারো এক করে ফেলেন। মুসলমান ছেলেমেয়ের মাদ্রাসা শিক্ষার বদলে আধুনিক শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ না থাকলেও এইসব নামাজ বোরখার পক্ষে তারা সদা ব্যস্ত। গুড়গ্রামে নামাজ নিয়ে এই শোরগোলে ভারতের সরদার মন্তেশ্বর সিং নামে এক ব্যক্তি সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেছে, ‘আমি দেখছি কিছু মুসলিম চণ্ডীগড় রেলস্টেশনে নামাজ পড়ছিলেন। তারা কি রেলস্টেশন দখল করে নিয়েছেন’?... রেলস্টেশন নামাজ পড়ার জায়গা নয়। সিবিচ, খেলার মাঠ, শপিংমলে লোকজনের চলাচলের স্থানে, ব্যস্ত রাস্তায়, ট্রেনে কামরায় জায়গা দখল করে নামাজ পড়লে সেটা দখল হয়ে যায় না, তবে মানুষকে বিড়ম্বণায় ফেলে। এই মানসিকতাকে কেন আমরা প্রশ্রয় দিবো? ইসলামে সফর চলাকালে নামাজ কাজা করার নিয়ম আছে। তাহলে কেন ট্রেন প্লাটফর্মে চলাচলের পথ আটকে নামাজ পড়তে হবে? এ হচ্ছে নামাজের বিজ্ঞাপন। এর মাধ্যমে মুসলমানরা ‘কাফেরদের’ কাছে নামাজ এক্সিবিউশন করে থাকে। ইউরোপের কোন শান্তসৃষ্ট শহরে যদি একটা মাইক বাজিয়ে আজানের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে দৈনিক ৫ বার কাফেরদের শোনাতে বাধ্য করবে ‘আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুত নাই’। কয়েক লক্ষ অমুসলিম শহরবাসীকে মাত্র শ’খানেক মুসলমান দৈনিক আজান শোনাতে বাধ্য করবে- এরকমই থাকে মুসলমানদের উদ্দেশ্য। মুসলিম ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে না আসলে একজন ধার্মীক মুসলমানদের মানসিকতা কোনদিন বুঝা সম্ভব হবে না।

মুসলমানদের নামাজ পড়ার জন্য পর্যাপ্ত মসজিদ নেই- এই অভিযোগটি কি কোন সুস্থ বিবেচনার সরকার মেনে নিতে পারে? পৃথিবীতে মন্দির গির্জা মসজিদই যদি সমস্ত জায়গা দখল করে নেয় তাহলে গৃহহীন মানুষরা কি পাপ করেছে? আজো গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে একটা উল্লেখযোগ্য মানুষ খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে অথচ সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদের অভাবকে বড় করে দেখানো হচ্ছে! মানুষের মাথার নিচের ছাদ নেই অথচ আল্লাহ ভগবানের ঘর বানানোর কোন বিরাম নেই! মসজিদের অভাবের ছুতো দেখিয়ে জায়গা দখল করে মসজিদ বানানোর ফিকিরে রাস্তা আটকে নামাজ পড়ার যে চলটা মুসলমানরা শুরু করেছে তা অচিরে কঠরহস্তে দমন করতে হবে…।


  • ৪০২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সুষুপ্ত পাঠক

বাংলা অন্তর্জালে পরিচিত "সুষুপ্ত পাঠক" একজন সমাজ সচেতন অনলাইন একটিভিস্ট ও ব্লগার।

ফেসবুকে আমরা