মানুষের মুক্তিই চূড়ান্ত লক্ষ্য

বুধবার, আগস্ট ১৫, ২০১৮ ১০:২১ PM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


আজ ১৫ই আগষ্ট -জাতীয় শোক দিবস। আজ থেকে ৪৩ বছর আগে এই দিনে আমাদের জাতির জনককে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে -যে নৃশংসতার কোনো তুলনা নেই। বাঙ্গালি জাতির জন্য ১৫ই আগষ্ট তাই একটি শোকাবহ দিন। সেই শোক আমাদের হৃদয়কে উদ্বেলিত করে, জনক হারানোর সে আর্তি আমাদের মথিত করে এবং সে শোক প্রকাশের কোনো ভাষা নেই।কিন্ত শোক মানুষকে এক ধরনের শক্তিও দেয় -মানুষ শোককে রূপান্তরিত করতে পারে শক্তিতে। শোক যদি শক্তিতে রূপান্তরিত না হয়, তা’হলে তা শুধু মাতমই থেকে যায়, শক্তি যদি শোক থেকে কিছু না নিতে পারে, তা’হলে সেটা আবেগহীন হয়ে পড়ে।

তাই জাতির পিতাকে হারানোর এই দিনে আমাদের শোককে যদি শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হয়, তা’হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনার কাছে, তাঁর দূরদৃষ্টির কাছে, তাঁর দিক্-নির্দেশনার কাছে। সেই প্রেক্ষিতে পাঁচটি জিনিস আমাকে সদাই আকৃষ্ট করে।

প্রথমত: বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের শেষ লাইনটি, যেখানে তিনি আমাদের সংগ্রামকে ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ও ‘মুক্তির সংগ্রাম’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এ হয়তো নিছকই স্বাভাবিক শব্দ চয়ন। কিন্তু আমার মনে হয়, তা কিন্ত নয় -অত্যন্ত সচেতনভাবে বঙ্গবন্ধু শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন তাদের অন্তর্নিহিত অর্থ মনে রেখে। ‘স্বাধীনতা’ ও ‘মুক্তির’ ব্যঞ্জনা ভিন্ন। স্বাধীনতা এলেই মুক্তি আসে না। স্বাধীনতা অর্জন করার পরেও একটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বঞ্চনা থাকতে পারে, অসাম্য থাকতে পারে, অন্যায় থাকতে পারে। এগুলো দূর করতে পারলেই তখন কেবল মুক্তি সম্ভব। সুতরাং বাঙ্গালি জাতির সংগ্রাম শুধু স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে শেষ হবে না, তাকে মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, কারণ স্বাধীনতা মুক্তির আবশ্যকীয় শর্ত, কিন্তু পর্যাপ্ত শর্ত নয়।

দ্বিতীয়ত: শোষণের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আপোষহীন। সারাটি জীবন তিনি শোষণের বিরুদ্ধে বলেছেন, বঞ্চিত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, রুখে দাঁড়িয়েছেন শোষকদের বিরুদ্ধে। শোষণকে তিনি দেখেছেন বঞ্চনার বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে, সাম্যের পরিপন্থী হিসেবে এবং মানবাধিকারের সঙ্গে সঙ্গতিহীন হিসেবে। সেই প্রেক্ষিত থেকেই তিনি বলেছেন, ‘বিশ্ব আজ দু’টো শিবিরে বিভক্ত -শোষক ও শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’

তৃতীয়ত: সামাজিক ন্যায্যতাকে তিনি একটি শোষনমুক্ত সমাজের অপরিহার্য প্রাক-শর্ত হিসেবে দেখেছেন। তিনি গনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন, কিন্তু দু’টোকেই দেখেছেন সামাজিক ন্যায্যতার এক একটি স্তম্ভ হিসেবে। তাই সত্তুর দশকের প্রথমদিকে নানা মনে ‘গনতন্ত্র’ ও ‘সমাজতন্ত্র’ বিষয়ে নানা রকমের ধোঁয়াটে ভাব থাকলেও, এ বিষয় দু’টোতে বঙ্গবন্ধুর ধারণা ছিলো শার্সির মতো স্বচ্ছ। ‘গনতন্ত্রকে’ তিনি শুদ্ধ একটি বিষয় হিসেবে ভাবেন নি, ভেবেছেন, ‘সমাজতান্ত্রিক গনতন্ত্র’ হিসেবে; আবার ‘সমাজতন্ত্রকেও’ একটি যান্ত্রিক মাত্রায় দেখেন নি, দেখেছেন ‘গনতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ হিসেবে। এবং এ দু’টোকেই সম্পৃক্ত করেছেন সামাজিক ন্যায্যতার সঙ্গে।

চতুর্থত: বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনায় ‘জাতীয়তাবাদ’ এবং ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ একটা বিশেষ স্হান ছিলো। বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদকে তিনি ‘চরম জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে দেখেন নি, দেখেছেন বাঙ্গালি জাতির আত্মস্বত্ত্বার নির্ণায়ক হিসেবে। তেমনিভাবে বারবার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন এই বলে যে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ও সমাজজীবনে তিনি ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদকে এমন জায়গায় রেখেছেন, যেখানে বাঙ্গালি জাতির আত্মস্বত্বা-অস্তিত্বে কোনো দ্বন্দ্ব না থাকে, আর ধর্ম বিষয়ে কোনো সংশয় না থাকে। পরবর্তী সময়ের সব দ্বন্দ্ব ও সংশয়ের স্রষ্টা আমরাই -বহু মীমাংসিত বিষয়কে আবার ঘোলাটে করে দেই।

পঞ্চমত: মনে প্রাণে বাঙ্গালি হয়েও বঙ্গবন্ধুর ছিলো একটি বিস্তৃত বৈশ্বিক মানসিকতা। এ ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী ছিলো অনেকটা রবীন্দ্রনাথের মতো। তাই তিনি শুধু বাঙ্গালীর নেতা ছিলেন না, ছিলেন বিশ্বনেতা। বৈশ্বিক অঙ্গনে তিনি যূথবদ্ধতার পক্ষে ছিলেন, কিন্তু স্বার্থ জোটবদ্ধতার পক্ষে নয়। তাই তাঁকে দেখা গেছে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা হিসেবে -টিটো, ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে একই কাতারে। বিশ্বশান্তির সপক্ষে তাঁর জোরালো বানী, বিশ্ব শান্তি কাউন্সিলের প্রতি তাঁর সমর্থন ও মানবতাবাদী বিশ্ব ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তাঁর আলাপ-আলোচনা তাঁকে এক বিশ্ববরেণ্য নেতায় পরিনত করেছিলেঅ। তাই তিনি শুধু ‘বঙ্গবন্ধুই’ নন, ‘বিশ্ববন্ধুও’ বটে।

শেষের কথা বলি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারের পরে ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখি নি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। আমার আর হিমালয় দেখার প্রয়োজন নেই।’ আমাদের অনেকেই হয়তো হিমালয় দেখেছি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে দেখি নি। কিন্তু তা’তে কি? হিমালয়ের বিস্তার থেকে আমরা বঙ্গবন্ধুর বিশালতা বুঝতে পারি, তাঁর চিন্তা-চেতনা থেকে পাই এক স্থির দিক-নির্দেশনা, তাঁর স্মৃতি থেকে পাই এক অনন্য প্রেরণা। প্রাপ্তি আমাদেরই বা কম কিসে? চেতনার সিঁড়ি বেয়ে আমাদের পথচলা অক্ষয় হোক।


  • ১৪২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সেলিম জাহান

অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক

ফেসবুকে আমরা