স্বপ্না দে

সংস্কৃতি কর্মী, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সিলেট জেলা সংসদ।

প্রতিটা মানুষের একখানা নিজের বাড়ি চাই

ছাদে বসে আকাশ দেখছিলাম, মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো, আন্টি পূজায় বাড়ি যাবেন না? আমি বললাম কার বাড়ি? মেয়েটা বললো আপনাদের বাড়ি, আপনার গ্রামের বাড়ি। আমি বললাম আমার কোন বাড়ি নাই। মেয়েটা মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। আসলে আমাদের সমাজে কোন মেয়েরই নিজের কোন বাড়ি নাই।

বাবার বাড়ি, স্বামীর বাড়ি, সব শেষে ছেলের বাড়ি। প্রায় তিন কুড়ি বছরের এক লম্বা জীবন কাটিয়ে আজও আমার নিজের বাড়ি নাই। 

আমাদের সনাতনী সমাজের বাবারা মেয়েদের উত্তরাধিকার স্বীকৃতি দিতে মোটেই রাজি না। তাদের মনে নিদারুণ ভয় পাছে মেয়ে খুটির জোরে শ্বশুর বাড়ি থেকে চলে আসে। তাহলে বংশ মর্যাদায় টান পড়বে। নিজেদের সংসারের সুখশান্তি উবে যাবে। বিবাহিত মেয়েদের মা বাবার মনে সারাক্ষণ ভয় মেয়ে যেন কোনো ভাবেই সংসার বিমুখ না হয়। 

মেয়েদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার না দিলেও মেয়েকে (বিড়াল ছানার মতো হাত পা বেঁধে হলেও) শ্বশুর বাড়ি পাঠানোর সময় কিছু তৈজসপত্র, পোশাকপরিচ্ছদ, হাতেপায়ের বেড়িসম কিছু অলঙ্কার, ও স্থান-পাত্র বেধে কিছু নগদ অর্থও উপঢৌকন হিসেবে দিতে পিছপা হন না। পাছে এসবের কমতি হলে মেয়েকে ফিরিয়ে দেয় সে ভয় যেমন আছে, সামাজিক একটা মান মর্যাদার ব্যাপার সেপারও এইসব লেনদেনের সাথে যুক্ত থাকে তাই এসব দিতে কন্যাদায় গ্রস্থ বাবারা মোটেই কস্ট বোধ করেন না। অথচ মূলের বেলা যত গাইগুই। 

প্রত্যেক মানুষেরই (মাথা গুজার ঠাই) নিজের একখানা ঘর একান্ত জরুরি। যেখান থেকে দিনান্তে যখন তখন কেউ 'ঘাড় ধরে বের করে দিবো' এই জমিদারি টুকু দেখাতে না পারে। কিন্তু আমাদের এই পোড়ার দেশে মেয়ে মানুষ যতই আয় রোজগার করুক না কেনো নিজের একখান বাড়ি থাকে না। 

এমন উদবাস্তু জীবনে আলমারি ভর্তি শাড়ি, কিংবা গা ভর্তি গহনা কোন কাজে লাগবে যদি নিজের স্বাধীন ভাবে মাথার উপরের ছাদখানারই দাবিদার না হতে পারে?

তাই মেয়েদের উচিত সমস্ত শাড়ি গয়নার তোয়াক্কা না করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজের একটা বাড়ি বানিয়ে নেওয়া। যেখান থেকে কেউ বলবে না ঘাড় ধরে বের করে দিবো, বা যেখানে আছো সেখানেই থাকো ফিরে এসো না!

দু‘ফোঁটা গঙ্গাজল ছিটিয়ে, কাশিপাতা ছিড়ে ফেলে যারা জন্ম পরিচয় টাকে মুছে দিতে পারেন। পাঁচজন মিলে একবেলা পেটপুরে খেয়ে,নেচে-গেয়ে মেয়েদের বংশলতিকা পর্যন্ত মুছে ফেলতে পারেন, এমন মায়া মমতা রহিত সমাজ জীবনে প্রতিটা সনাতন ধর্মাবলম্বী বিবাহিত মেয়ের বিয়ের পর আর পিত্রালয়ে ফিরে যাওয়াই উচিৎ না বলে আমি মনে করি।

আমি শুধু আমার মতটাই এখানে ব্যক্ত করেছি,ভিন্নমত নিশ্চয়ই থাকবে। আপনাদের মতামত টাও জানাবেন আশা করি। আসুন মুক্ত আলোচনা করি।

জগতের সকল প্রাণি  নিরাপদ জীবন যাপন করার শক্তি লাভ করুক।

93 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।