দেশ স্বাধীন হলেও ধর্ষণ থামেনি

বুধবার, মার্চ ৬, ২০১৯ ৯:৪২ PM | বিভাগ : আলোচিত


বিদেশে পড়তে এসে অনেক পাকিস্তানীদের পেয়েছি কেউ ক্লাসমেট কেউ রুমমেট, ডরমিটরিমেট, ফ্লোরমেট, ভার্সিটিমেট। প্রথমদিকে তাদের সবাই অই মেট অব্দিই ছিলো কাউকেই ফ্রেন্ড ভাবতে পারতাম না! কেমন যেনো একটা মানসিক দূরত্ব কাজ করে। পাকিস্তানি কারো সাথে গল্প করার পরিবেশ আসলেই ৪৭-৭১ অব্দি সব ইস্যু চলে আসে। আর এই চলে আসাটা খুব স্বাভাবিক, আমি বাংলাদেশী আর কেউ একজন পাকিস্তানী আলাপ করবো, এখানে হিস্ট্রি কালচার যুদ্ধ-সংঘাত তো উঠে আসবেই! পক্ষ বিপক্ষ কিংবা এই দ্বিমত থাকা স্বত্বেও....

"খাদিজা কারদিল" আমার পাকিস্তানি বান্ধবী খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের পাশতুস্থানের মেয়ে। এই এলাকার ছেলেমেয়েদের বাংলাদেশীদের সাথে দেখা বা কথা হলে তাদের চোখেমুখে খুব আশাবাদী একটা এপিয়েরেন্স থাকে কারণ তারাও বাংলাদেশীদের মতো শোষিত নিপীড়িত, তারাও স্বাধীনতাকামী! ঐ এলাকায় এডুকেডেট মাস্টার্স পিএইচডি করা ছেলে মিললেও গোটা থানায় একটা গ্রাজুয়েট মেয়ে পাওয়া দায়! ঐ এলাকায় প্রথম গ্রাজুয়েট করা মেয়ে সে! তার বাবা সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মী, তার বাবার কারণে সে পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও যে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ৭১ এর ইতিহাস আছে তা জেনেছে, পড়েছে! সে ব্রিটিশ সাংবাদিক এন্থনি মাসকারেনহাসের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা কলাম এবং বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ পড়েছে! এক কথায় তার জ্ঞানের পরিধি অপরিমেয়! কারদিল খুব রেগুলার, সংযত, মার্জিত, ধার্মিক স্বভাবের একটা মেয়ে হওয়া স্বত্বেও কোনো কারণ ছাড়াই এই আমার মতন ইরেগুলার, উটকো, অস্থির ঠোঁটকাটা স্বভাবের মানুষকে অসম্ভব পছন্দ করে! নিয়ম করে আমার স্বাস্থ্য পড়াশোনার খোঁজ-খবর নেয়। আমার সাথে উপমহাদেশীয় যত্ত ইতিহাস আলোচনা আছে সবই সে আলাপ করে যায়, আমারও ভীষণ ভালো লাগে তার সাথে আড্ডা দিতে কারণ সে প্রচুর পড়াশোনা করে এবং জানে। উইথ রেফারেন্স এ আলাপ করে! তার আলাপ আবেগকেন্দ্রিক নয় বরং বেশী তথ্যনির্ভর! একদিন সে খুব আক্ষেপ করে বললো পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে হারিয়েও শিক্ষা নিতে পারে নি, শোষণ আর বিমাতাসূলভ আচরণ ত্যাগ করতে পারে নি।

"জানো একজন পাকিস্তানি হিসেবে আমার গর্ব করার অনেক কিছু আছে বাট যখন ৭১ এ পাকিস্তানি কর্তৃক বাঙালি নারী শিশু ধর্ষণ এর চিত্র ভেসে উঠে তখন আমার গৌরবান্বিত গলা জড়িয়ে আসে.... আমি থেমে যাই"!

তার এই সরল মানবিক অনুভূতির জন্যই সে আমার পরম স্নেহাশিস একজন মানুষ! পরক্ষণেই বললো পাকিস্তানিদের এই ধর্ষণ হত্যা নির্মমতার জন্যই ৭১ এর যুদ্ধে ইন্ডিয়ার হস্তক্ষেপ বাঙালিদের প্রতি সাহায্য সহযোগিতা আন্তর্জাতিক চোখে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে বেশি। আর তোমরা পরাধীনতার শিকল ভেঙে একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছো!

কিন্তু তোমাদের স্বাধীন দেশে এখনো নারী শিশু ধর্ষণের শিকার হয় প্রতিনিয়ত! ১৬ ডিসেম্বর এ স্কুলে বিজয় দিবস উৎযাপন করতে গিয়ে কিশোরী ধর্ষিত হওয়ার খবর পত্রিকার পাতা দখল করে নেয়! "নো রেইপ" প্লেকার্ড নিয়ে এখনো নারীদের মিছিল করতে হয়! আসলে কি জানো! নারীর কোনো দেশ নেই, স্বাধীনতা নেই! স্বাধীন দেশের মানুষ হয়েও নারী মানুষের মূল্য পায় না দিন শেষে কেবল মাংসপিণ্ডই রয়ে যায়!

তবুও আমরা পোশতুবাসীরা স্বপ্ন দেখি একদিন পাকিস্তানের শোষণ থেকে আমরাও মুক্ত হবো আমাদের ও একটা স্বাধীন দেশ হবে!

কারদিলের এমন কথায় আমি কোনো প্রতিউত্তর করতে পারি নি! যে ধর্ষণ আর নিপীড়নের জন্য পাকিস্তানিদের আমরা এতো ঘৃনা করি সে ধর্ষণ নিপীড়ন স্বাধীনতার ৪০ দশকে আজও বাংলার অন্ত্রে তন্ত্রে মন্ত্রে রয়েই গেছে। মাদ্রাসার মৌলভী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অব্দি যত পুত-পবিত্র প্রতিষ্ঠান আর প্রফেশন ই হোক এখানেও প্রতিনিয়ত ধর্ষণ নিপীড়ন সত্যতা পাওয়া যায়, গণমাধ্যমে খবর হয়ে আসে!


  • ৩১৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তাহেরা তমা

ইস্ট চায়না ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত।

ফেসবুকে আমরা