তাহমিনা শিখা

ডেপুটি সেকশন ম্যানেজার (সিপি বাংলাদেশ)।

মেয়েরা কোথায় যৌন নিপীড়নের শিকার হয় না!

#Metoo নিয়ে দেশজুড়ে চলছে তোলপাড়। এই সময়কার সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ের একটি। সেক্সুয়াল হ্যারেসম্যান্ট এর শিকার হয় নি এমন কোনো মেয়ে এদেশে আছে বলে আমার জানা নেই। #Metoo এর মতো আন্দোলনকে স্বাগতম জানাই মেয়েদের সেই না বলা কথাগুলো বলার সুযোগ করে দেয়ার জন্যে।

প্রতিটা মেয়ের উপর যৌন নিপীড়ন শুরু হয় পরিবারের নিকটতম আত্নীয়স্বজন থেকেই। আদর করার ছুতোয় যখন জাপটে ধরে থাকে কোলের উপর, নোংরাভাবে ছোঁয় শরীরের বিভিন্ন স্থানে। অনেকেই সেগুলো ভয়ে প্রকাশ করে না, অনেকে প্রকাশ করলেও পরিবার সেটাকে আমলে নেয় না। যার ফল কখনো কখনো হয়ে উঠে ভয়ানক।

মেয়েরা যৌন নিপীড়নের শিকার হয় তখন থেকেই যখন, আরবী পড়াতে আসা হুজুরটা পা ছড়িয়ে বসে রানের চিপায় চুলকাতে চুলকাতে একটা বাচ্চামেয়েকে অশ্লীল ইঙ্গিত করেন।

মেয়েটি যৌন নিপীড়নের শিকার হয় তখন থেকেই যখন, কোচিং শেষে তাকে একা আটকে রাখা হয় বাড়তি পড়ানোর নাম করে।

মেয়েটি যৌন নিপীড়নের শিকার হয় তখন থেকেই যখন, স্কুলে অংক কিংবা বিজ্ঞান স্যার পড়ায় ভালো করার সুবাদে পিঠ চাপড়ে দেন বিশ্রীভাবে, কিংবা, পড়া না পারার অপরাধে যখন মেয়েটির সারা পিঠ হাতড়ে বেড়ায় স্যারের নোংরা হাত, মনে হয় যেনো উনার হারিয়ে যাওয়া কিছু খুঁজছেন সমস্ত পিঠজুড়ে, যখন টেনে দেন কাঁধের পাশে বেরিয়ে যাওয়া ব্রায়ের ফিতাটি।

মেয়েটি যৌন নিপীড়নের এর শিকার হয় তখন থেকেই যখন, স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে আরেকটু বড় হয়ে উঠে, ভেবে নেয় মুক্তির দিন বুঝি এলো !!
অথচ কলেজ, ভার্সিটি সবখানেই চলে একই ব্যাপার। অমানুষগুলোর বিচরণ সবখানেই। শুধু কৌশলটা হয়তো একটু ভিন্ন, একটু আধুনিক হয়।

মেয়েটি যৌন নিপীড়নের শিকার হয় তখন থেকেই যখন অফিসে কলিগ ডেস্কে বসে পর্ণ দেখেন আর বিভিন্ন অজুহাতে কাছে ডাকেন, বিভিন্ন ইঙ্গিত করেন তার দিকে।
যখন বস কাজের অযুহাতে অফিসের পরও মেয়েটিকে আটকে রাখেন। কাজে অকাজে বারবার রুমে ডেকে পাঠান। কখনো শরীর খারাপের বাহানায় গা, হাত-পা টিপে দিতে বলেন।

এমন কোনো মেয়ে নেই যে বাইরে গেলে সেক্সুয়াল হ্যারেসের শিকার হয় নি। রাস্তাঘাটে, বাসে, ভীড়ে, নির্জনে, সবখানে কোনো না কোনোভাবে হ্যারেসের শিকার হতে হয়। কেউ পিঠে হাত দেয়, কেউ বুকে, কোমরে, নিতম্বে, পারলে আরো গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করে।

রাস্তায় বের হলেই অশ্লীল আচরণ, অশ্লীল কথা কিংবা ইঙ্গিত শুনে নি এমন মেয়ে নেই। যেকোনো পেশার, যেকোনো বয়সের অমানুষ দ্বারা নিপীড়নের শিকার হতে হয়। যার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস নেই সেও হ্যারেস করে প্রতিনিয়ত!

মুখের কথাকেও আমি যৌন নিপীড়ন বলি। কারণ, চোখের আন্দাজে, মুখের অশ্লীল ভাষায় সেই মানুষ আমাদের শরীরকে মেপে ফেলে, শারীরিক আনন্দ উপভোগ করে।

তো যে বা যারা বলছেন যারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তারা প্রমাণ দিন, এতোদিন বলেন নি, আজ এতো বছর পর কেনো বলছেন!

তার আগে একটা প্রশ্ন, আপনার মা, বোন কিংবা প্রেমিকাকে কোনোদিন বলতে শুনেছেন কেউ তাকে নোংরাভাবে ছুঁয়েছে কিনা!
আজ এতবছর পর যদি উনারা বলেন উনারাও যৌন নিপীড়নের শিকার, তবে কী প্রমাণ চাইবেন মা, বোন কিংবা প্রেমিকার কাছে?
নাকি, আজো চুপ করিয়ে দিবেন!

যে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বলছি তারা প্রত্যেকেই আজ সমাজসেবক। শেষ বয়েসে হজ্ব পালন করে পাপ ধুয়ে মুছে পবিত্র হয়ে এসেছেন, নামাজ পড়ছেন পাঁচ ওয়াক্ত।
অফিসের যে বসদের কথা বললাম উনারাও সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি।
রাস্তাঘাটের যে অমানুষদের কথা বললাম তারা আপনাদের মতোই ভদ্র পোশাকের অফিসার, কেউ বা গার্মেন্টস কর্মী, কেউ রিকশাচালক, কেউ মুচি, কেউ দোকানদার, কেউ বাসের হেল্পার।

আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই ভাইয়ারা। শুধু এক বিশ্রী অনুভূতি আছে, এই বিশ্রী অনুভূতির কোনো প্রমাণ হয় না।

897 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।