রান্নাঘর নয়, নারী হোক বহির্মূখী

মঙ্গলবার, মে ১৪, ২০১৯ ৪:৫১ AM | বিভাগ : ওলো সই


এখন কেনা খাবারেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তবুও ছুটির দিন হলে একটু তৃপ্তি করে খাওয়ার লোভে রান্না করতে বসে যাই। আর সেদিন দিনের প্রায় পুরোটা সময়ই চলে যায় রান্নার পিছনে। দিনশেষে ভাবি এতো সময়ের অপচয় ছাড়া কিছুই না, বরং কিনে খাওয়াই ভালো ছিলো।

অনেকেই ভাবতে পারেন মেয়ে মানুষ রান্নাকে সময়ের অপচয় বলছে, এ কী কথা, মেয়েদের প্রধান কাজই তো রান্না করা!

ঠিক তাই। সমাজ আর পারিপার্শ্বিকতা আমাদের এভাবেই ভাবতে শিখিয়েছে। তাই আমাদের কাছে রান্না বলতেই মায়েদের কিংবা মেয়েদের মুখ চোখ ভেসে উঠে। এমন কি বিয়ের কথা উঠলে সবার আগে কথা উঠে মেয়ের রান্না নিয়ে। মেয়ের শিক্ষা, সংস্কৃতির চেয়ে রান্না জানার প্রয়োজনীয়তা যেনো অনেক বেশি। অথচ এখানে রান্না শুধুই একটা পেশা, ছেলে কিংবা মেয়ে কেউই পিছিয়ে নেই তাতে। রান্নাকে থাইল্যাণ্ডে মেয়ের আবশ্যক গুণ কিংবা প্রধান কাজ হিসেবে নয়, ভাবা হয় একটা শিল্প, ভাবা হয় উপার্জনের একটা পথ হিসেবে। নারীর পাশাপাশি পুরুষেরাও সমানতালে অংশগ্রহণ করেন এই পেশায়।

রান্না করতে গিয়ে বারবারই মায়ের কথা মনে পড়ছে। এবার দেশে যাওয়ার পর মায়ের সাথে সময়ই কাটানো হয়নি, কারণ মা সারাক্ষণ ব্যস্ত রান্নার কাজে। ভেবে দেখলাম, আমাদের মায়েরা, আমাদের মেয়েরা, জীবনের বেশিরভাগ সময়ই অপচয় করে থাকেন রান্নাঘরে। আমরা শুধু মাকে বলি খিদে পেয়েছে কিংবা বিশেষ একটা খাবার খেতে ইচ্ছে করছে, আর বলতেই খাবার হাজির। সন্তানের একটা আবদার না মেটানো অবধি যেনো মা স্বস্তি পান না। অথচ আমাদের এই আবদার পূরণ করতে গিয়ে মায়ের পুরোটা সময় কেটে যায় রান্নাঘরে, একা একা কী করে সব করছেন একবারও কি আমরা ভেবে দেখি সেটা!

আমাদের দেশে সব নারীদের সংসারের কাজের চিত্রগুলো একই। আলো ফোটার আগেই তাকে উঠতে হয়। স্বামীর সকালের নাশতা, দুপুরের খাবারে যেনো কোনো বিঘ্ন না ঘটে খুব খেয়াল রাখতে হয় সেদিকে। স্বামী কাজে গেলে ডুবে যেতে হয় ঘরের অন্যান্য কাজে। সংসারের সমস্ত কাজের পরে স্বামী মানুষটির জন্যে তার পছন্দের খাবারটি রান্না করে স্ত্রীরা অপেক্ষা করতে থাকেন অধীর আগ্রহে। অথচ অধিকাংশ স্বামীরাই ভুলে যান একটিবার খোঁজ নিতে তার ঘরের মানুষটি কী করেছে সারাদিন, খেয়েছে কিনা সময়মতো!

কর্মজীবী নারীর ক্ষেত্রে তো সময়ের হিসেবটা আরো জটিল। সারাদিন বাইরের কাজ সেরে আবার ঘর সামলাতে হয়, দেখতে হয় স্বামী, সন্তান, পরিবারের অন্যান্যদেরও। স্বামী ভদ্রলোক অফিস থেকে এসেই কড়া করে এককাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে রিমোট হাতে বসে যান প্রিয় স্পোর্টস চ্যানেল খুলে। তাঁরা বেমালুম ভুলে যান ঠিক একই শারীরিক এবং মানসিক পরিশ্রম তার স্ত্রীও করে এসেছেন। তারও অফিস থেকে ফিরে আসার পর কিছুটা বিশ্রাম, কিছুটা নিজস্ব সময়, কিছুটা কেয়ার প্রয়োজন !!

আমাদের দেশে স্বামী, সন্তান, সংসার এর পিছনে সময় দিতে গিয়ে নারীর নিজস্ব কোনো সময় থাকে না। আমাদের মায়েদের, মেয়েদের ভুলে যেতে হয় তাঁদের নিজস্বতার কথা। সত্যি কথা বলতে, নারী জীবন বড্ড বিচিত্র, বড্ড জটিল। নারী মাত্রই নিদারুণভাবে একা। অথচ স্বামী কিংবা পরিবারের অন্যরা ঘরের কাজে সাহায্য করলে নারী কিছুটা সময় পেতে পারে নিজের জন্যে। উপভোগ করতে পারে কিছুটা সময় পরিবার কিংবা বন্ধুর সাথে আড্ডা দিয়ে। পারে আংশিক পড়া কোনো বইয়ে মন দিতে, কিংবা গুনগুন করে নিজের পছন্দের রবীন্দ্রসংগীত গাইতে, অথবা পারে জীবনের নানা অভিজ্ঞতাকে, নানা স্মৃতিকে পুস্তকবন্দী করতে।

এদেশে অর্থাৎ থাইল্যাণ্ডে নারী পুরুষ দুজনই ঘরে এবং বাইরে একইসাথে কাজ করেন। অনেকে স্বামী স্ত্রী একই পেশায় কাজ করেন এবং একে অন্যকে সাহায্য করে নিজেদের জন্যে আলাদা সময় বাঁচিয়ে নেন। যেনো, কাজের পর তারা নিজেদের এবং পরিবারের অন্যদের সময় দিতে পারেন। উপভোগ করতে পারেন পরস্পরের সহচর্য। আর একসাথে ঘুরতে যাওয়া, গল্প করা, বাইরে খেতে যাওয়া এদের কাছে খুবই স্বাভাবিক। যেহেতু দুজনই উপার্জন করছেন, সুতরাং কেউ কারো উপেক্ষার নন, কিংবা অধীনস্থও নন। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য বরং মানুষকে মানসিক ভাবে প্রশান্তি দেয়, ফলে তারা জীবনকে ভীষনভাবে উপভোগ করেন, জীবনকে আরো সহজ করে তোলেন।

আমাদের দেশে পুরুষ মানেই পরিবারের একমাত্র হর্তাকর্তা, একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তি। আর নারী বলতেই চোখে ভাসে এক নিরীহ অন্তর্মুখী রমনীর ছবি, যার গন্ডি শুধু বাড়ীর ভেতরেই সীমাবদ্ধ, যার শখ সীমাবদ্ধ থাকবে শুধু বাহারি রান্না আর রঙিন সুতোয় ফুল তোলায়। সেই ছকের বাইরে নিজেকে দেখতে চাওয়া নারীকে পুরুষশাসিত সমাজ নিতে পারে না। নারী চাকরী করছে, নারী বিয়ে করছে না, নারীর ছেলেবন্ধু আছে, নারী অফিসের কাজে চারদিন ঘরের বাইরে ছিলো, নারী স্বাধীন ভাবে বাঁচতে চাইছে! তার মানে সেই নারী উচ্ছন্নে যাচ্ছে, সমাজ উচ্ছন্নে যাচ্ছে।

সত্যি বলতে, নারীকে স্বাবলম্বী দেখলে পুরুষেরা ভোগেন আত্নবিশ্বাসের অভাবে। ভোগেন নারীর কাছে হেরে যাওয়ার শংকায়। একজন নারী পুরুষের চেয়ে এগিয়ে, এটা যেনো কিছুতেই ভাবতে পারেন না তারা। অথচ এখানে, অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা পুরুষের চেয়ে অনেক এগিয়ে, আর তাতে পুরুষের কোনো লজ্জা নেই, শংকা নেই, বরং তারা গর্বিত। কারণ তারা জানেন, যে নারী যত বহির্মুখী, সে নারী ততো সমৃদ্ধ, সে সমাজ ততো সমৃদ্ধ।
আমাদের দেশে স্বাবলম্বী নারীকে শুধু পুরুষ নয়, নারীরাও বাঁকা চোখে দেখেন। সেই স্বাবলম্বী নারীদের দেখে অথর্বরা করেন ঈর্ষা, আর অসহায়রা করেন আক্ষেপ।

আমার মায়ের হাতের লেখা খুব সুন্দর। বাংলা পড়েন শুদ্ধ উচ্চারণে। শুধু ইংরেজিটা গুলিয়ে ফেলেন ইদানীং। তাই লজ্জায় আমাদের সামনে পড়েন না। আমার মায়ের খুব আক্ষেপ ছিলো, পড়াশোনা করতে না দিয়ে কেনো তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হলো! বিয়ের পর মাকে আর পড়তে দেয়া হয়নি। শূন্য থেকে শুরু করা আমার বাবার সংসারে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন মা। আমার শিক্ষিত বাবাও কোনোদিন মায়ের পড়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি। অথচ একটু সুযোগ পেলে হয়তো মায়ের জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো! পাশের বাসার আন্টি যখন অফিস করে বাসায় ফেরেন আমার মা তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকেন। মায়ের একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস টের পাই এখনও!

একটা সময় আমরা ভাইবোনেরা মায়ের এই আক্ষেপ নিয়ে হাসি তামাশা করতাম, যেনো অফিস করা কোনো মহিলার চেহারায় মাকে মানাবেই না, মা আদর্শ ঘরনী রূপেই ঠিক আছেন। এখন বুঝি, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আমার মা আসলে কতোটা অসহায়, কতোটা নিরুপায়। নিজের প্রিয় রঙের একটা শাড়ী, শখের একমুঠো চুড়ি কিংবা সংসারের খুঁটিনাটি কিনতে হলেও সংকোচ নিয়ে চেয়ে থাকতে হয় আমার বাবার দিকে, একজন পুরুষের দিকে। বুঝতে হয় তার মন মর্জি।

আমি আমার মায়ের কথা বলছি, যদিও এটা শুধু আমার মায়ের গল্প নয়, আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীর গল্পটা এমনই। আমার মায়ের মাঝে আমি আমাদের দেশের সেই অধিকাংশ নারীর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। যারা একটা বদ্ধ ঘরেই কাটিয়ে দেন জীবনের সারাটা সময়। যার কাছে বাইরের আলো ঝলমলে পৃথিবী একদম অচেনা। যাকে জীবনের নানা ইচ্ছে পূরণ করার জন্যে অপেক্ষা করতে হয় একজন পুরুষের মুখ চেয়ে, তার মন মর্জি জয় করতে হয় নানা ছলাকলায়। যিনি কোনোদিন নিজের উপার্জনের টাকায় নিজের কোনো শখ পূরণ করতে পারেননি, নিজের সুপ্ত কোনো ইচ্ছেকে পূরণ করতে পারেননি, পেরেছেন কেবল দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখতে।

আহা..কী দারুণ অপচয় জীবনের, কী দারুণ অপচয় সময়ের, অপচয় ইচ্ছের!

প্রিয় নারীরা বহির্মুখী হও, সমৃদ্ধ হও, বাঁচতে শিখো।


  • ৩৪২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তাহমিনা শিখা

ডেপুটি সেকশন ম্যানেজার (সিপি বাংলাদেশ)।

ফেসবুকে আমরা