আব্দুল্লাহ্ আবু সায়ীদ, আপনি বাঙালি পুরুষ রয়ে গেছেন, মানুষ হন নি!

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ ২:১৪ AM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের 'শাড়ি' লেখাটি প'ড়ে এ-প্রসঙ্গে কিছু কথা বলার তাগিদ বোধ করছি। এ লেখাটি আমার কাছে আপাদমস্তক কট্টর বর্ণবাদী, পুরুষতান্ত্রিক ও স্থূল মনে হয়েছে। আলোচ্য লেখা থেকে কিছু কিছু মর্মান্তিক কথা উদ্ধৃত ক'রে আমি তা খণ্ডণ করার চেষ্টা করেছি।

১. শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক। শুধু শালীন নয়, রুচিসম্পন্ন, সুস্মিত ও কারুকার্যময় পোশাক। নারী শরীরকে যতটুকু অনাবৃত রাখলে তা সবচেয়ে রহস্যখচিত হয়ে ওঠে, পোশাক হিসেবে শাড়ি তারই উপমা। শরীর আর পোশাকের ওই রমণীয় এলাকা বিভাজনের অনুপাত শারীর রচয়িতারা কি জেনে না না–জেনে খুঁজে পেয়েছিলেন, সে কথা বলা না গেলেও এর পেছনে যে গভীর সচেতন ও মুগ্ধ শিল্পবোধ কাজ করেছিলো, তাতে সন্দেহ নেই। আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ। শাড়ি তার রূপের শরীরে বইয়ে দেয় এক অলৌকিক বিদ্যুৎ হিল্লোল।

শাড়িকে যে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ পোশাক ঘোষণা দিলেন পৃথিবীসমক্ষে, এটা কি বিশ্বব্যাপী যৌনাবেদনময় পোশাক বিষয়ক কোনো জরিপের ফলাফল? নাকি তাঁর নিজস্ব মতামত? যদি জরিপের ফলাফল হয়, তাহলে এর রেফারেন্স চাই। আর যদি তাঁর নিজস্ব মতামত হয়, তাহলে তাঁর কাছে জিজ্ঞাস্য, তিনি এমন একটি কথা এত নিশ্চয়তা দিয়ে কীভাবে ও কেন বললেন? তাঁর কাছে আরো জিজ্ঞাস্য, যৌনাবেদনপূর্ণ এবং যৌনাবেদনশূন্য পোশাকের সংজ্ঞা কী? কী কী গুণ থাকলে কোনো পোশাক যৌনাবেদনপূর্ণতা-লাভ করে? আর কী কী গুণ না থাকলে কোনো পোশাক এ-বিশেষ যোগ্যতার্জন করতে ব্যর্থ হয়? এবং নারীর যৌনাবেদনপূর্ণ পোশাক যদি শাড়ি হয়ে থাকে, তাহলে পুরুষের যৌনাবেদনপূর্ণ পোশাক কী?

‘শুধু শালীন নয়, রুচিসম্পন্ন, সুস্মিত ও কারুকার্যময় পোশাক’

- ‘শালীন পোশাক’! শালীন পোশাক জিনিসটা আসলে কী? শালীন পোশাক কাকে বলে? আর অশালীন পোশাক কাকে বলে? শালীন শব্দটাই কি আপেক্ষিক নয়? সবার শালীনতা-অশালীনতাবোধ কি এক? অথবা এক হওয়া কি জরুরি? সভ্য সমাজে যেকোনো মানুষ তার পছন্দ অনুযায়ী পোশাক পরবে; এটাই আমার কাছে পোশাকে শালীনতা। এক্ষেত্রে আমার শালীনতাবোধের সঙ্গে আপনার শালীনতাবোধের যে বিরাট ফারাক, জনাব আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ! আপনি নিজের শালীনতাবোধ সবার ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছেন কেন?

‘শুধু শালীন নয়, রুচিসম্পন্ন, সুস্মিত ও কারুকার্যময় পোশাক’

কোনোকিছু কারুকার্যময় হলেই তা সুস্মিত বা রুচিসম্পন্ন হয় না। এবং সবার রুচি এক না, এক হওয়াটা জরুরিও না। আর কারুকার্যময় পোশাক অনেকেই পছন্দ করে না।


‘নারী শরীরকে যতটুকু অনাবৃত রাখলে তা সবচেয়ে রহস্যখচিত হয়ে ওঠে, পোশাক হিসেবে শাড়ি তারই উপমা’

নারী শরীরকে কতটুকু অনাবৃত রাখলে তা আপনার কাছে রহস্যখচিত লাগে, জনাব আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ? শাড়ির কথাই যদি ধরেন, তাহলে বলতে হয়, শড়ি কেউ-কেউ নাভির নিচে পরে, কেউ-কেউ পরে ওপরে। আপনার কোনটা ভাল লাগে? নাভি দেখা গেলে? নাকি না দেখা গেলে? ব্লাউজের হাতার দৈর্ঘ্যও নানান রকমের হয়, আবার হাতাকাটাও হয় ব্লাউজ। আপনার কোনটা বেশি ভাল লাগে? আবার শাড়ি পরার ঢং-ও সবার এক নয়। আপনার কাছে কোন ঢংটি সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ?


‘আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ’

নারীর উঁচু-নিচু ঢেউ? পুরুষের উঁচু-নিচু ঢেউ নিয়ে এবার একটু বলুন, দেখি, জনাব! এবং কোন পোশাকে পুরুষের উঁচু-নিচু ঢেউগুলো অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে তা বলতেও ভুলবেন না যেন!

‘শাড়ি তার রূপের শরীরে বইয়ে দেয় এক অলৌকিক বিদ্যুৎ হিল্লোল’

এবার পাওয়া গেছে আসল কথা! বিদ্যুৎ হিল্লোল! নারীর শরীর দেখে আপনি নিজের শরীরে বিদ্যুৎ হিল্লোল-বোধ করেন। তা করতেই পারেন। এবং এক্ষেত্রে বয়েস কোনো ব্যাপার না অবশ্য!  

২. না, সব দেশের মেয়েদের শাড়িতে এমন অপরূপ লাগবে না। পৃথিবীর কোনো কোনো এলাকার নারী শরীরেই কেবল শাড়িতে এ অলীক রূপ ফুটে ওঠে, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রিয়দর্শিনী সুকুমারী তন্বীদের দেহবল্লরীতে—সে বাংলা, পাঞ্জাব বা উত্তর ভারতের—যেখানকারই হোক। বিশালদেহী আফ্রিকার নারীর জন্য এ পোশাক নয়, জার্মান বা ইংরেজ নারীর উদ্ধত সৌন্দর্যেও এ পোশাক হয়তো খাপ খাবে না। শাড়ি সুকুমার ও নমনীয় শরীরের জন্যই কেবল সত্যিকার অর্থে মধুর। হয়তো উপমহাদেশের বাইরে একধরনের মঙ্গোলীয় নারীকেও শাড়িতে ভালো লাগবে তাদের শারীরিক কমনীয়তার জন্য। কিন্তু পোশাকটি তাদের ভেতর প্রচলিত নয় বলে সে কথায় এখন যাব না। এটি ভালো লাগে বিপুলসংখ্যক উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় মেয়েদের। যদি বাঙালি মেয়েদের প্রশ্ন ওঠে তবে বলব, এটি ভালো লাগে প্রায় প্রত্যেকটি বাঙালি মেয়েকে। সত্যি কথা বলতে কি, অধিকাংশ বাঙালি মেয়েকে শাড়ি ছাড়া আর হয়তো কিছুতেই মানায় না। এ জন্য তাদের প্রকৃতিগত পোশাক—তাদের সহজাত রূপের অংশ।

আমি ‘উদ্ধত’ সৌন্দর্যের অনেক ইংরেজ ও জার্মান নারী ও ‘বিশালদেহী’ আফ্রিকান নারীকে শাড়িতে দেখেছি এবং তাদেরকে শাড়িতে সুন্দর লেগেছে আমার কাছে। আর আপনার কাছে তাদের লেগেছে কুৎসিত! আর ইংরেজ ও জার্মান নারীদের শারীরিকভাবে আপনি উদ্ধত বলেছেন, আফ্রিকান নারীদের বলেছেন বিশালদেহী। এসব খুবই বৈষম্যমূলক, অবমাননাকর ও নেতিবাচক কথাবার্তা।

‘সত্যি কথা বলতে কি, অধিকাংশ বাঙালি মেয়েকে শাড়ি ছাড়া আর হয়তো কিছুতেই মানায় না। এ জন্য তাদের প্রকৃতিগত পোশাক—তাদের সহজাত রূপের অংশ’

বাঙালি মেয়েদেরকে আমার কাছে শাড়িতে যেমন সুন্দর লাগে, তেমনি সুন্দর লাগে জিনস, স্কার্ট, সেলোয়ার-কামিজ ইত্যাদি পোশাকে। আপনার কাছে সুন্দর লাগে না, আপনার মনের অসৌন্দর্যের কারণে। আর প্রকৃতিগত পোশাক মানে কী? প্রকৃতপক্ষে, মানুষের প্রকৃতিগত কোনো পোশাকই নেই। প্রকৃতিগতভাবে মানুষ নগ্ন, অন্যান্য প্রাণিদের মতোই। মানুষ পোশাক বানিয়ে পরছে, তা খুব বেশিদিনের ইতিহাস নয়। পোশাক আবিষ্কারের আগে মানুষ অন্য প্রাণিদের মতো নগ্নই থাকতো। তাছাড়া বাঙালি মেয়েরা আধুনিকভাবে শাড়ি পরছে মাত্র একশ বছর আগে থেকে। রবীন্দ্রনাথের ভাবি জ্ঞানদানন্দিনীই প্রথম বাঙালি নারী যিনি ব্লাউজ ও সায়াসহযোগে শাড়ি পরতে শুরু করেন। এই ইতিহাস আপনার অজানা হবার কথা নয়। তাই প্রকৃতগত পোশাক, সহজাত রূপ ইত্যাদি আপনার মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করার জন্য উদ্দেশ্যমূলক কথা।

৩. ’যদি তারা তাদের কমনীয় শাড়িগুলোকে নান্দনিক বা সুরুচিসম্মতভাবে পরতে পারে’

- শাড়ি পরার ঢং বিভিন্ন রকমের। তা অঞ্চলভেদে, মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থাভেদে, পারিপার্শিক অবস্থাভেদে এবং মানুষের রুচিভেদে এর আরো ইত্যাদি কারণ রয়েছে। যেমন, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নারী ও একজন ইট-ভাঙা নারীর শাড়ি পরার ঢঙের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এক্ষেত্রে কোন ঢংটিকে নান্দনিক আর কোন ঢংটিকে অনান্দনিক আখ্যা দেবেন? তাছাড়া, আরো নানান কারণে নারীদের শাড়ি পরার ঢঙে যেসকল পার্থক্য রয়েছে, তার মধ্যে কোন কোন ঢংকে আপনি নান্দনিক বা সুরুচিসম্মত মনে করেন? আর কোন কোন ঢংকে অনান্দনিক ও কুরুচিসম্মত মনে করেন?

৪. ‘- আমার ধারণা, একটা মেয়ের উচ্চতা অন্তত ৫ ফুট ৪–এর কম হলে তার শরীরে নারীজনিত গীতিময় ভঙ্গি পুরোপুরি ফুটে ওঠে না। এরপর তাদের দৈর্ঘ্য ৫ ফুট ৫, ৬ বা কিছু পরিমাণে ৭ ইঞ্চি পর্যন্ত উঠলে তা ক্রমাগত অলীকতর হয়ে উঠতে থাকে।‘

নারীজনিত গতিময় ভঙ্গি কাকে বলে? কোনো নারীর উচ্চতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চির কম হলে তার শরীর ভঙ্গি গতিহীন হয়ে পড়ে? চীন, ম্যাক্সিকো, কোরিয়া ইত্যাদি অঞ্চলের মেয়েদের গড় উচ্চতাও তেমন বেশি নয় আমাদের মতো। তাই ব’লে কি এসব মেয়েরা সুন্দর নয়? এরা সবাই কুৎসিত? নারীজনিত গতিহীন ভঙ্গি এদের দেহে?

৫. ‘বাঙালি মেয়েরা বিপদে পড়ে এখানটাতেই। এদের গড় উচ্চতা ৫ ফুট ২ থেকে ৩ ইঞ্চির সামান্য এদিক–ওদিকে (অবশ্য ১০ শতাংশ মেয়েকে বাদ দিয়ে ধরলে)। এই উচ্চতা নিয়ে ললিত–মধুর ও দীর্ঘাঙ্গী নারীর কমনীয় শরীর নিয়ে ফুটে ওঠা কঠিন, যা দেখা যায় এই উপমহাদেশের উত্তর দিকের নারীর উন্নত দেহসৌষ্ঠবে’

শুধু বাঙালি মেয়েরা কেন, কোনো মেয়েরই উচ্চতা নিয়ে বিপদে পড়ার কারণ নেই। তাদের বিপদে ফেলতে চান ও ফেলে রাখেন আপনি ও আপনার মতো আরো অগণিত স্কেল দিয়ে নারীর শরীর-মাপা বাহ্যিক রূপ উচ্চতা ও শরীরবাদী এবং চরম পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার লোকেরা।

এই উচ্চতা নিয়েই নারী হ’তে পারে প্রিয়দর্শিনী। বলিউড অভিনেত্রী রাণী মুখার্জি ও জয়া ভাদুড়ির উচ্চতা বেশি নয়। কিন্তু এঁরা দু’জনেই প্রিয়দর্শিনী আমার কাছে। এবং শাড়ি ও অন্যান্য যেকোনো পোশাকেই এঁদের সুন্দর লাগে। এরকম আরো হাজার হাজার উদাহরণ আছে। এবার আপনি একজন নারীর নাম বলুন, কম উচ্চতার কারণে যাকে আপনার কাছে কুৎসিত লাগে।

৬. ‘কিন্তু ওই কাম্য উচ্চতার অভাবে বাঙালি মেয়েদের শাড়ি ছাড়া আর যেন কোনো গতিই নেই। আজ বাঙালি মেয়েরা সেই শাড়িকে প্রায় ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিচ্ছে। আজকাল শাড়ি ছাড়া অনেক রকম কাপড় পরছে তারা—সালোয়ার–কামিজ তো আছেই, পাশ্চাত্য ফ্যাশনের কাপড়ও কম পরছে না—এবং পরার পর ইউরোপ বা ভারতের ওই সব পোশাক পরা সুন্দরীদের সমকক্ষ ভেবে হয়তো কিছুটা হাস্যকর আত্মতৃপ্তিও পাচ্ছে।‘

বাঙালি মেয়েদের শাড়ি ছাড়া গতি আছে, এবং সে-গতি আরো বেশি সুগতি। কারণ শাড়ি পোশাক হিসেবে সুন্দর হলেও তা মোটেও সহজ ও আরামদায়ক পোশাক নয়। শাড়ি প’রে কোনো কাজ করা যায় না। হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন, শড়ি প’রে শুধু শুয়ে থাকা যায়। আমার মতে, শুয়ে থাকার জন্যও শাড়ি উপযুক্ত এবং আরামদায়ক পোশাক নয়। শাড়ি প’রে শুধু ভাস্কর্য সেজে থাকা যায়। ইউরোপ বা ভারতের ওই সব পোশাক পরা মেয়েরা যদি সুন্দরী হয়, তবে একই পোশাক প’রে আমাদের মেয়েরা কেন সুন্দরী হতে পারবে না? মানুষের পোশাকের সৌন্দর্যের সমকক্ষতা বা অসমকক্ষতা আবার কী জিনিস? যেকোনো মানুষ তার নিজের ইচ্ছা ও রুচি অনুযায়ী পোশাক পরবে এবং তাতে আত্মতৃপ্তিবোধ করবে, তাতে আপনার এতো সমস্যা কেন? আর এই নির্দোষ আত্মতৃপ্তিবোধকে আপনার হাস্যকরই বা মনে হচ্ছে কেন?

৭. ‘আমরা যেন না ভুলি যে এসব পোশাক বাঙালি মেয়েদের দেহ গঠনের একেবারেই অনুকূল নয়। দেহভঙ্গিমারও না। বাঙালি মেয়েদের উচ্চতার অভাবকে আড়াল করে তাদের প্রীতিময় ও কিছুটা তন্বী করে তুলতে পারে একমাত্র শাড়ি। মেয়েরা শাড়ি পরে মাথা বা কাঁধ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত। এভাবে শাড়িতে শরীর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যেকোনো মেয়ের রূপে কমবেশি দীর্ঘাঙ্গি বিভ্রম দেখা দেবেই’

এসব পোশাক বাঙালি মেয়েদের দেহ ভঙ্গিমা ও গঠনের খুব অনুকূল; শাড়িই বরং প্রতিকূল, যেহেতু শাড়ি প’রে হাঁটাচলা কাজকর্ম ইত্যাদি দুঃসাধ্য ব্যাপার। তাছাড়া কম উচ্চতা আড়াল করা বা তা নিয়ে হীনমন্যতাবোধ করার কোনো কারণ নেই। অথচ আপনি কম উচ্চতার মেয়েদেরকে তা-ই করতে উৎসাহ দিচ্ছেন! মানুষের উচ্চতা বা বাহ্যিক রূপ কোনো গুণ নয়। মানুষকে মনের রূপ তথা গুণ-অর্জনে উৎসাহ দিন, বাহ্যিক রূপ-অর্জনে নয়! কোনো মেয়েকে তার নিজের শরীরটি শাড়িতে জড়িয়ে অন্যের চোখে বিভ্রম সৃষ্টি করার পরামর্শ বা উৎসাহ দেওয়া কোনো কাজের কথা না।

৮. ‘শাড়ি ছাড়া এমন জাদুকরি রহস্য আর পরস্পরবিরোধী মাধুরী আছে কোন পোশাকে? শরীর নিয়ে এমন শিল্পিত খেলা আর কে খেলতে পারে? সালোয়ার-কামিজ, টাইট জিনস, মিনি স্কার্ট কি এর সমকক্ষ? শেষেরগুলো তো প্রায় পোশাক না থাকারই শামিল’

তার মানে, আপনার কাছে শাড়ি হলো ব্রাহ্মণ আর অন্যসব পোশাক হলো শূদ্র! পোশাকেরও যে জাতপাত আছে, তাদের মধ্যেও যে ব্রাহ্মণ-শূদ্র আছে, তা তো আগে জানা ছিল না! কারো গায়ের পোশাক 'পোশাক না থাকার শামিল' হলেই বা আপনার অসুবিধা কোথায়? উন্নতবিশ্বের মেয়েরা গ্রীষ্মে ‘পোশাক না থাকার শামিল’ ধরনের পোশাক পরে। তাতে ওদের সুন্দরও লাগে। এবং কারো পোশাক নিয়ে ওসব সমাজে কেউ বাজে কথা বলে না আপনার মতো।

৯. ‘আগেই বলেছি, নানা জাতির দৈহিক বৈশিষ্ট্য একত্র হওয়ায় বাঙালির শরীর অধিকাংশ সময় সুগঠিত নয়। এই ত্রুটিকেও শাড়ির রুচি স্নিগ্ধ–শৈল্পিক আব্রুর মধ্যে এনে যেন বাঙালি মেয়েকে প্রাণে বাঁচিয়ে দেয়’

কোনো মেয়ের উচ্চতা ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির কম হওয়া মানে তা কোনো ত্রুটি নয়। এবং তা শাড়ি দিয়ে ঢেকে জনচক্ষুতে বিভ্রম সৃষ্টিরও কোনো দরকার নেই। এবং কোনো একটি বিশেষ পোশাক পরার অর্থ কখনোই প্রাণে বেঁচে যাওয়া হতে পারে না। যদি তা হয়ই, তবে সে-পোশাক প্রাণঘাতি পোশাক। সম্মান নিয়ে প্রাণে বাঁচতে মেয়েদের অধিকার সচেতন হতে বলুন, স্বাস্থ্য সচেতন হতে বলুন, স্বাবলম্বী হতে বলুন। ওরা কখন শাড়ি পরবে, কখন কোট বা অন্যকিছু পরবে তা ওদের ব্যাপার, আপনার নয়।

১০. ‘তাদের শরীরের অসম অংশগুলোকে লুকিয়ে ও সুষম অংশগুলোকে বিবৃত করে শাড়ি এই দুর্লভ কাজটি করে’

- শাড়ি কেন, কোনো পোশাকই কোনো দুর্লভ কাজ করতে পারে না। দুর্লভ কাজ করতে পারে মানুষ হবার গুণ ও উপকরণগুলি। এবং সেসব পোশাকে নয়, অন্যকিছুতে।

১১. ‘শাড়িও তেমনি নারীর শরীরে সৌন্দর্যের প্রতিটি ঢেউ আর সরণিকে আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু ভঙ্গিতে বিন্যস্ত করে আঁচলের কাছে এসে একঝাঁক সাদা পায়রার মতো নীল আকাশে উড়তে থাকে’
- নারীর শরীরের প্রতিটি ঢেউ, সারণি, আঁকাবঁকা-উঁচুনিচু ভঙ্গি ইত্যাদি তো দেখি, আপনি গণনা ক’রে ফেলেছেন!

১২. ‘আমার মনে হয়, এ রকম একটা অপরূপ পোশাককে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে বাঙালি মেয়েরা সুবুদ্ধির পরিচয় দেয়নি’

সুবুদ্ধির পরিচয়টা তবে আপনিই দিন না, জনাব আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ! যে অপরূপ পোশাককে ঝেঁটিয়ে বিদায় ক’রে বাঙালি মেয়েরা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছে, সে পোশাকটি আপনি পরতে শুরু ক’রে এহেন সুবুদ্ধির পরিচয় দিতে পারেন কিন্তু!


  • ২২৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তামান্না ঝুমু

ব্লগার ও লেখক

ফেসবুকে আমরা