বিষন্নতা

বুধবার, জুন ১৭, ২০২০ ৪:৪৮ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


২০১৪ সালের একটা প্রতারিত হওয়ার ঘটনা থেকে শুরু হলেও জীবনের নানা চতুর্মূখী সমস্যায় মানসিকভাবে জর্জরিত হয়ে ২০১৬ সালের দিকে আমিও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিলাম। ভাগ্য আমাকে ওখান থেকে ফিরিয়ে আনলেও হতাশা থেকে বের হতে পারছিলাম না কোনোভাবেই।

একদিন ফেসবুকে আমার ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা এক আপুর প্রোফাইলে হঠাৎ চোখ পড়ে। উনার ইনফোতে দেয়া ছিলো, সাইক্রিয়াট্রিস্ট।  কিন্তু এদেশে না, কানাডাতে।  আপুর সাথে ফোনে কথা বললাম, উনি আমাকে বললেন, "শরীর যেমন অসুস্থ হয়, ঠিক তেমনি মনও অসুস্থ হয়। শরীরের অসুস্থতায় যদি ডাক্তারের প্রয়োজন হয়, তাহলে মানসিক অসুস্থতায় নয় কেনো? বাংলাদেশে মানসিক অসুস্থতা নিয়ে যে উপহাসের ট্যাবু, তা তো আমাদেরকেই ভাঙতে হবে, তাই না!" 

এ কথাটা আমাকে এমনভাবে ছুঁয়ে গেলো যে এরপর একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এর শরণাপন্ন হলাম। দীর্ঘদিনের চেষ্টায় আজকের এই আমি। হতাশার দিনগুলোতে যে আমার কিছুই ভালো লাগতো না, সবকিছুই অসহ্য মনে হতো, সে আমি এখন খুব ছোটো ছোটো বিষয়গুলোতে আনন্দ খুঁজে পাই, ছোটো ছোটো ভালো লাগা আমাকে ছুঁয়ে যায়, যে আমি আমাকেই ভালোবাসতে ভুলে গিয়েছিলাম, সে আমি এখন নিজেকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখেছি, অন্যকে ভালোবেসে কিভাবে ভালো রাখা যায়, সেই চেষ্টাও করছি, নিজের ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করছি, যে আমি জীবনের মানেটাই হারিয়ে ফেলেছিলাম, সে আমি আজ জীবনের প্রতি মুহুর্তে জীবনের মানে খুঁজে পাই, যে আমি বেঁচে থাকাটাকে অসহ্য মনে করতাম, সেই আমি এই করোনাতে অনেক অনেক মানুষের আক্রান্ত হওয়ার খবর, মৃত্যুর খবর শুনে ব্যথিত হচ্ছি, পরক্ষণেই আবার নিজে সচেতন থেকে কিভাবে অন্যকে, পরিবারকে, সমাজকে ভালো রাখা যায়, কিভাবে সাহায্য করা যায় সেই চেষ্টাও করছি।

ওই সময় সেই আপুটা যদি এত সুন্দরভাবে না বোঝাতো তাহলে আজ জীবনটাকে এভাবে উপভোগ করতে পারতাম না, এখন মনে হয় জীবনটা কত সুন্দর।

ওইসময় আমার ডিপ্রেশনের কথাগুলো শুনলে অনেকেই বলতো, তোমার মত হাসিখুশি মেয়ের কি এমন কষ্ট! 
বান্ধবীরা বলতো, ন্যাকামি করা বাদ দে তো! এসব এমন কিছু না।  
কেউ কেউ বলতো, ব্যাপার না, বাদ দে। 
কাছের লোকজন বলতো, ক্যারিয়ারের সময় এসব কী! 
এমনও হয়েছে, কেউ ঠিকই শুনলো, কিন্তু সব শেষে বললো, এসব আজেবাজে চিন্তা রেখে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবো তো! 
আমি যে ক্যারিয়ারের জন্য চেষ্টা করিনি তা নয়, কিন্তু এই চেষ্টা করতে গিয়ে আরো বেশি হতাশাগ্রস্ত  হতাম, মনে হতো আমার দ্বারা কিছুই সম্ভব না। আমার নিজেকে আরো বেশি মনে হতো মূল্যহীন, যার বেঁচে থাকা আর না থাকা এক বিষয়। বিশেষ করে এখান থেকেই আত্মঘাতী চিন্তাগুলো আসতো।

তারপরও আমি এ হতাশার মধ্যেও চাকরী করেছি, এমবিএ করেছি। তাই "ব্যস্ত থাকলেই এসব ডিপ্রেশন চলে যায়" বলা মানুষরা কি আদৌ জানে? তাবৎ দুনিয়ার বিখ্যাত অনেক ব্যক্তিই ব্যস্ত থাকার পরও আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন?
"মিসেস ডেলোয়ে" খ্যাত লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ, নোবেলজয়ী সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জগৎ সুন্দরী মেরিলিন মনরো সহ কে নেই এই দলে!
আর যদি ব্যস্ত থাকলে ডিপ্রেশন চলে যায়, তাহলে সেটা ডিপ্রেশন নয়, স্যাডনেস। অনেকসময় মন খারাপ থাকলে একটা গান শুনলে বা একটা মুভি দেখলে বা কোথাও ঘুরতে গেলে বা প্রিয় বন্ধুর সাথে আড্ডা দিলে আবার ঠিক হয়ে যায়, এই ক্ষণিকের মন খারাপ হওয়া বা স্যাডনেস রাত-দিন, সুখ-দুঃখের মতোই মানবজীবনের স্বাভাবিকতা কিন্তু ডিপ্রেশন বা হতাশাগ্রস্ত হওয়া (মানে হতাশা যাকে গ্রাস করে ফেলে) একটা রোগ, মনের রোগ। ডিপ্রেশন আর স্যাডনেসকে মেলাবেন না প্লিজ। 

পরিশেষে যেসব কথা না বললেই নয়,
"মানসিক অসুস্থতা থেকে বের হতে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এর শরণাপন্ন হয়েছি" এ কথাটা যতোবার যতোজনকে বলেছি তার ১০ জনের মধ্যে ৮ জনই "পাগল" বলে বা তাচ্ছিল্য নিয়ে হেসে, ব্যঙ্গ করে উপহাস করেছিলো এবং এখনও করে। তাদেরকেই বলছি, জ্বী, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট আমাকে মানসিকভাবে সুস্থ ঘোষণা দেওয়ার পরও আমি প্রয়োজন বোধ করায় আবারও গিয়েছিলাম এবং প্রয়োজন হলে আরো যাবো।

সাইক্রিয়াট্রিস্ট বা সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হয়ে একটু সচেতনতায় যদি আত্মহত্যাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়, একটা প্রাণ যদি নতুন জীবন ফিরে পায়, তাহলে এখানে হাহা হিহি করে, পাগলের ডাক্তারের কাছে গেছে রে, তদুপরি পাগল সাব্যস্ত করে উপহাস করার কি আছে? আপনারাই বলুন।

আপনাদের জন্যই বলে রাখি, ২০১৪ সালে দৈনিক "প্রথম আলো"তে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছিলো, "ডব্লিউএইচও আশঙ্কা প্রকাশ করছে, ২০২০ সাল নাগাদ প্রতিবছর সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবেন এবং আত্মহত্যার চেষ্টা চালাবেন এরও ১০ থেকে ২০ গুণ মানুষ।" এবার আপনারাই অবস্থাটা ভেবে দেখুন।
 
দুইদিন ধরেই বলিউড সুপারস্টার সুশান্ত সিং রাজপুত কে নিয়ে বিটাউনসহ পুরো উপমহাদেশ টালমাতাল। অনেকে বলছে, 
- কিসের অভাব ছিল তার! 
- কেনো করলো সে! 
- না করলেও তো পারতো !  
- এতো সুদর্শন একটা ছেলে কিভাবে পারলো! 
- তো অর্থ বিত্ত যশ খ্যাতি থাকার পরও এতো হতাশা এদের কোত্থেকে আসে!

এসব বলা কওয়া বন্ধ করে দয়া করে আপনার যে আপনজনটি দিনের পর দিন বিষতন্নতায় ভুগছে, তাকে বিষন্নতা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করুন। ভুলে যাবেন না, বিষন্নতার শেষ ধাপই কিন্তু আত্মহত্যা। তাই তার কথাগুলো শুনুন, আগেই তাকে বোঝানোর চেষ্টা না করে আগে তার অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করুন, প্রয়োজনে সাইকোলজিস্টের কাছে নিয়ে যান। আপনার সামান্যতম সচেতনতায় একটা প্রাণ ফিরে পেতে পারে নতুন জীবন। 


  • ৩১১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তনয়া দেওয়ান

লেখক ও এক্টিভিস্ট।