ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

তুমি জেন আমি টারজান (পর্ব -১)

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। সমাজে পুরুষের ভূমিকা ছিলো সুনির্দিষ্ট। এবং সেই ভূমিকাটা সে পালন করবে, এটাই প্রত্যাশিত ছিলো। কারণ, তার সেই ভূমিকাটা প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো। পুরুষের তখন জন্ম হতো শিকারি হবার জন্য, পৃথিবীতে সে আসতো আক্রমণাত্মক আচরণ নিয়ে। তার যা কিছু সম্পদ, সেগুলোকে রক্ষা করা এবং নিয়ন্ত্রণ করাই ছিলো তার জৈব গন্তব্য।

পুরুষের সেই দীর্ঘকালের সুনির্দিষ্ট ভূমিকাতে হঠাৎ করে বাধা এলো। এই বাধা এলো বিংশ শতাব্দীতে। এই শতাব্দী চাক্ষুষ করলো নারী অধিকার আন্দোলন। শুধু এই এক আন্দোলন নয়, আরো বেশ কিছু ঘটনাপ্রবাহ যুক্ত হবার ফলে এই শতাব্দীতে এসে প্রকৃতি বনাম প্রতিপালন, এই বিতর্ক গভীরভাবে শুরু হয়ে গেলো। একটা ছেলে বাচ্চা এবং মেয়ে বাচ্চার যে তফাৎ, সেই তফাৎ কে তৈরি করছে? প্রকৃতি, নাকি প্রতিপালনের ভিন্নতার কারণে তারা দু’জন ভিন্ন হচ্ছে? ধরা যাক, এই ছেলে বাচ্চার নাম হচ্ছে টারজান আর মেয়ে বাচ্চাটার নাম জেন। বিপদে পড়লে জেনকে কেনো লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে উদ্ধার করে টারজান? জেনই বা কেনো নিজের উদ্ধারের কাজ নিজে না করে অপেক্ষা করে থাকে টারজানের জন্য?

টারজানের শক্ত পেশীবহুল শরীর জন্মাচ্ছে কি বেশি বেশি মাঠে খেলা করার কারণে, বন্ধুদের সাথে কাদায় গড়াগড়ি খাবার কারণে? নাকি সে শক্ত সমর্থ হয়ে উঠছে তার পিতা এবং অন্যদের তার প্রতি পুরুষ হয়ে ওঠার যে প্রত্যাশা, সেই প্রত্যাশা পূরণের মানসে? একজন পুরুষের যে কোনো বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়, ঝুঁকি নিতে হয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য, এগুলো তার কানের কাছে দিনরাত জপে তাকে করে তোলা হয় কঠিন এবং কর্মঠ।

আর, জেন, সে যে একজন কোমল নারী, বিপদে অপেক্ষায় থাকে শক্ত সামর্থ্য পুরুষ টারজানের, সে কি এই কোমলতা পেয়েছে পুতুল খেলতে খেলতে, হাড়ি-পাতিল নিয়ে মিছেমিছি রান্না-বান্না খেলা খেলে। নাকি, তার এই পেলবতা গ্রথিত হয়ে আছে তার মস্তিষ্কে। ইচ্ছে করলেও এখান থেকে সরানো যাবে না তাকে। তার এই ভূমিকা জৈব নিয়ন্ত্রিত।

একটা সময়ে এসে প্রতিপালন তত্ত্বটা প্রকৃতিগত তত্ত্বটাকে হারিয়ে দেয়। বলা হয়, নারী এবং পুরুষের বৈষম্যের, ভূমিকার যে পার্থক্য তা সমাধান করা সম্ভব যদি তাদেরকে একই ভাবে সমাজে গড়ে ওঠার সুযোগ করে দেওয়া হয়। প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলায় মেয়েদের ছেলেদের সমান সুযোগ করে দিতে হবে, অন্য দিকে ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের কোমল অংশকে দমিয়ে না রেখে তাকে বিকশিত হবার সুযোগ করে দিতে হবে।

ছেলে বাচ্চা এবং মেয়ে বাচ্চাদের একইভাবে মানুষ করার এই সিদ্ধান্ত অনেক ভালো ফল বয়ে এনেছে, অনেকের জন্য এটা খুব চমৎকারভাবে কাজ করেছে, কিন্তু এর বিপরীতটাও ঘটেছে। নারী এবং পুরুষ প্রকৃতিগতভাবেই আলাদা, এই জৈব সিদ্ধান্তকে সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অস্বীকার করা হয়েছে। সামাজিক চাপে পড়ে প্রকৃতিবিরুদ্ধ এই নীতির সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে অনেকেই সমাজ বিচ্ছিন্নতাও অনুভব করেছে।

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে পুরুষেরা নারীদের চেয়ে কিছু কাজে অনেক বেশী পারদর্শী। ধরা যাক, খেলাধুলার কথা। যে খেলাগুলোতে শারীরিক সামর্থ্যের প্রয়োজন হয়, সেই খেলাগুলোতে নারীরা পুরুষদের বিরুদ্ধে খেলতে গেলে পাত্তাই পাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ ফুটবল টিম বিশ্বকাপেই কোয়ালিফাই করে না। অন্যদিকে মেয়েদের দলটা প্রায়শই বিশ্বকাপ জিতে নেয়। এই দু’টো দলকে একের বিরুদ্ধে অন্যকে খেলতে দিন। দেখবেন, পুরুষ দল কোনো পরিশ্রম করা ছাড়াই হারিয়ে দিতে পারবে মেয়ে দলটাকে। টেনিস বলেন, সাতার বলেন, ক্রিকেট বলেন, সব জায়গাতেই একই ফলাফল আসবে।

পুরুষের এই শারীরিক সক্ষমতা একদিনে আসে নি। লক্ষ লক্ষ বছর মানুষ শিকারি-সংগ্রাহকের জীবন যাপন করেছে। এই সময়ে খাদ্য সংগ্রহের মূল ভূমিকাটা পালন করেছে পুরুষ। ফলে, শারীরিকভাবে সে বিকশিত হয়েছে নারীর তুলনায় অনেক বেশি। মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় শারীরিক পরিপক্বতা ছেলেদের আগে পেলেও, বয়ঃসন্ধির পরে ছেলেদের হৃৎপিণ্ড মেয়েদের তুলনায় বড় থাকে, ছেলেদের পেশি মেয়েদের তুলনায় বেশি শক্ত এবং সমৃদ্ধ থাকে, ফুসফুসের সক্ষমতাতেও ছেলেরা এগিয়ে থাকে। যে কোনো শারীরিক পরিশ্রমের কাজে, কিংবা দীর্ঘ পরিশ্রমে ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় বেশি পারদর্শী হয়।

বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ডেসমন্ড মরিস নারী-পুরুষের এই পার্থক্য আদিম সমাজের শ্রম বিভাজন থেকে উদ্ভূত বলে মনে করেন। আদিম সমাজে ছেলেরা যখন শিকারে যেতো, মেয়েরা তখন বাচ্চা প্রতিপালনে ব্যস্ত থাকতো। এর ফলে ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় পেশীবহুল হয়েছে বেশি। মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা গড়পড়তায় তিরিশ শতাংশ শক্তিশালী, দশ শতাংশ পরিমাণে ওজনে বেশি, এবং সাত শতাংশ অধিক লম্বা। ছেলেদের দৃষ্টিশক্তি মেয়েদের তুলনায় প্রখর। ঝুঁকি নেবার প্রবণতাতেও তারা এগিয়ে মেয়েদের তুলনায়। দীর্ঘমেয়াদী কোনো কাজে মনোনিবেশ ধরে রাখার ক্ষেত্রেও তারা মেয়েদের চেয়ে এগিয়ে।

মরিসে বক্তব্য হচ্ছে, বিবর্তন নারী এবং পুরুষের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে এবং এই পার্থক্য আসলে জন্মের পর থেকেই শুরু হয়। শিখিয়ে এই পার্থক্যকে অদৃশ্য করে দেওয়া সম্ভব নয়।

আদিম সমাজ থেকে উদ্ভূত সেই সব দক্ষতার অনেক কিছুই আধুনিক সমাজে এসেও মানুষের মধ্যে রয়ে গিয়েছে। ম্যাপ রিডিং এর কথাই ধরুন। প্যারিসের গেস্টাল ইন্সটিটিউট এর একটা গবেষণা থেকে দেখা যায় পুরুষেরা নারীদের তুলনায় ভালো ম্যাপ রিডার। পুরুষের এই দক্ষতা এসেছে শিকারি-সংগ্রাহক সময় থেকে। খাদ্যের অন্বেষণে পুরুষদের তাদের বসবাসের জায়গায় থেকে বহুদূরে চলে যেতে হতো। তারপর দিনশেষে নানা চিহ্ন মনে রেখে তাদের ফিরে আসতে হতো বসত এলাকায়।

পুরুষের এইসব দক্ষতা আদিম সমাজের জন্য অনেক বেশি সহায়ক ছিলো টিকে থাকার জন্য। সে কারণে সেই সময়ে অন্য লিঙ্গের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সে। বিপরীত লিঙ্গ বিনা প্রতিবাদেই মেনে নিয়েছে তার আধিপত্য। কিন্তু, আধুনিক সমাজে পুরুষের এইসব দক্ষতা অকেজো। ফলে, তার সেই রাজকীয় অবস্থান এখন হুমকির সম্মুখীন। জৈব বিবর্তনের তুলনায় মানুষের সাংস্কৃতিক বিবর্তন ঘটেছে দ্রুতগতিতে। আজকের এই সমাজে দৈহিক শক্তির গুরুত্ব নেই। যন্ত্রপাতি সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে। আক্রমণাত্মক আচরণের অহমিকা শেষ হবার পথে। আগ্নেয়াস্ত্র এই জায়গা দখল করে নিয়েছে। মানুষের কাজের যে জায়গা, সেই জায়গাতে এখন ইন্টারপারসোনাল সম্পর্কের জয়জয়কার। এই দক্ষতা যার যতো বেশি, অফিসে সে ততো বেশি সফল।

এক কথায় বললে, আধুনিক সমাজ পুরুষের জন্য না। এই সমাজে টিকে থাকার জন্য যে সব দক্ষতার প্রয়োজন হয়, সেগুলোতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে তার। টারজানের যুগ শেষ, জেনের জয়জয়কারে মুখরিত পৃথিবী এখন।
(চলবে...)

829 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।