তুমি জেন আমি টারজান (পর্ব -২)

মঙ্গলবার, অক্টোবর ৩০, ২০১৮ ৩:৩১ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


পুরুষের শক্তিমত্তা, কর্কশ ও কঠোর আচরণ এবং আক্রমণাত্মক স্বভাব আদিম সমাজের জন্য সু-উপযোগী ছিলো। এই বৈশিষ্ট্যগুলো যে পুরুষের যতো বেশি ছিলো, সেই সমাজে সে পুরুষ ততো বেশি সফল ছিলো। এর বিপরীতে সমাজে নারীর অবস্থান ছিলো আনুগত্যের এবং বশীভূতের। খাদ্যের জন্য, বাসস্থানের জন্য, নিরাপত্তার জন্য তাকে নির্ভর করতে হতো শক্তিশালী পুরুষের উপর। ঘরে বসে গৃহস্থালির অসংখ্য কাজ এবং সন্তান জন্ম দেওয়া ও প্রতিপালনই তাদের মূল কাজ ছিলো। কোন কাজ আগে করবে, কোন কাজ পরে, এই রুটিন করা তার অন্যতম একটা কাজ ছিলো। বাচ্চা-কাচ্চা এবং বৃদ্ধদের যত্ন আত্তি করতে গিয়ে ভাষাগত যোগাযোগকেও অনুশীলন করতে হয়েছে নারীদের। মরিসের ভাষ্য অনুযায়ী, “ভাষাগত দক্ষতায় মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ।” এটা কোনো আন্দাজে বলা কথা কিংবা পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া তথ্য নয়। বরং মস্তিষ্কের উপর করা নানা ধরনের গবেষণা থেকেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গিয়েছে। নারী এবং পুরুষকে একই ধরনের ভাষাগত সমস্যা সমাধান করতে দেওয়া হয়েছে। সেই সময়ে তাদের মস্তিষ্ক কীভাবে উদ্দীপ্ত হয় তার স্ক্যান ইমেজ নেওয়া হয়েছে। এই সব স্ক্যানে দেখা গেছে ভাষাগত সমস্যা সমাধানের সময় পুরুষদের তুলনায় মস্তিষ্কের একটা বেশ বড় অংশকে মেয়েরা ব্যবহার করে থাকে। ভাষাগত যোগাযোগকে পুরুষদের তুলনায় একেবারেই ভিন্নভাবে মেয়েরা মোকাবেলা করে। এটা জৈবগতভাবে প্রাপ্ত। গবেষণায় দেখা গেছে প্রি স্কুল এজের মেয়ে বাচ্চারা ছেলে বাচ্চাদের তুলনায় তিনগুণ বেশি কথা বলে। কথা বলার এই অভ্যাস বড়বেলাতে কমে না তাদের। একজন পুরুষ যেখানে প্রতি ফোন কলে গড়ে মাত্র ছয় মিনিট কথা বলে, সেখানে মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা বিশ মিনিটে গিয়ে ঠেকে।ভাষাগত যোগাযোগের এই দক্ষতা এবং এর সাথে অন্যের প্রতি যত্ন নেবার যে জন্মগত বৈশিষ্ট্য, সেটা মিলিত হবার ফলে আধুনিক সমাজ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে বেশি আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে।

শুধু ভাষাগত দক্ষতাই নয়, অনেকগুলো ইন্দ্রিয়ের ক্ষেত্রেও নারীরা পুরুষদের চেয়ে দক্ষতায় এগিয়ে রয়েছে। কানে শোনার কথাই ধরা যাক। পুরুষের তুলনায় মেয়েদের কান অনেক বেশি তীক্ষ্ণ। পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণ শোনে তারা। অস্পষ্ট কোনো শব্দ পুরুষের কান এড়িয়ে যাবে, কিন্তু মেয়েরা ঠিকই সেই শব্দকে ধরে ফেলবে। নিজেদের ঘরেই এই পরীক্ষা কিংবা পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পারেন। দেখবেন ঘরের মহিলারা পুরুষের তুলনায় বেশি শব্দ শোনে। বাচ্চা-কাচ্চার যত্ন নিতে নিতে তাদের শ্রবণেন্দ্রিয় এমন তীক্ষ্ণতা পেয়েছে।

মেয়েদের স্পর্শেন্দ্রিয়ও পুরুষের তুলনায় অনেকে বেশি স্পর্শকাতর। মেয়েদের ত্বক পুরুষের চেয়ে দশগুণ বেশি তথ্য সংগ্রহ করে। স্পর্শকাতরতাও তার বেশি। ভালবাসার মানুষের সাথে সম্পৃক্ত থাকার জন্য স্পর্শের চাহিদা এবং স্পর্শিত হবার আকাঙ্ক্ষা, দুটোই তার পুরুষের তুলনায় বেশি।

শুধু স্পর্শেন্দ্রিয়ের ক্ষেত্রেই পুরুষেরা পিছিয়ে নেই খুঁটিনাটি অনেকে জিনিসও পুরুষের দৃষ্টিসীমাকে এড়িয়ে যায়। গন্ধের অনুভূতিও পুরুষের অনেক বেশি ভোঁতা নারীদের তুলনায়। বাসার ময়লার গন্ধ পুরুষদের নাকে যাবে না, কিন্তু মহিলারা দেখবেন নাকে কাপড় দিয়ে গন্ধ থেকে বাঁচার চেষ্টা চালাবে। এমন দৃশ্য বিরল কিছু নয়। শিকারি-সংগ্রাহক, কিংবা কৃষিজীবী, যে সমাজেই যান না কেনো, পুরুষ বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত। ছোট জায়গার খুঁটিনাটি বিষয়কে লক্ষ্য করার চেয়ে বিস্তীর্ণ এলাকাকে পর্যবেক্ষণ করার জন্যই তার জৈব আচরণ প্রোগ্রামড। অন্যদিকে, মেয়েরা একটা দীর্ঘসময় কাজ করেছে ছোট এবং সীমিত এলাকাতে। সেই ছোট্ট এলাকার সমস্ত খুঁটিনাটি তাকে মনে রাখতে হয়েছ, এর ভিত্তিতে তার কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। স্ত্রী ঘরে ঢুকে মোজা এখানে রাখছো ক্যান, আন্ডারপ্যান্ট এখানে কেনো, বাথরুমের ভেজা তোয়ালে কেনো দলা মেরে আছে, এইসব নিয়ে ঝাড়ি খায়নি এমন পুরুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তোমার কিছু চোখে পড়ে না, এই অভিযোগও অহরহই শুনতে হবে। এই অভিযোগ আসলেই সত্য। নারীদের চোখে ধরা পড়া এইসব জিনিস পুরুষদের চোখে আসলেই পড়ে না। বউয়ের ধাতানি খাবার পরে দৌড়ে গিয়ে এগুলোকে সামাল দেবার চেষ্টা করে তারা।

গড়পড়তায় পুরুষের মস্তিষ্কের পরিমাণ নারীদের তুলনায় বড়। কিন্তু, এই বড়ত্ব দিয়ে বলে দেওয়া সম্ভব নয় যে পুরুষেরা নারীদের তুলনায় বেশি বুদ্ধিমান। মস্তিষ্ক বড় হলেই যে সে বেশি বুদ্ধিমান হবে এমনটা নয়। বরং মস্তিষ্ককে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার উপরই বুদ্ধিমত্তা নির্ভর করে। জটিল কোনো কাজের ক্ষেত্রে পুরুষেরা মস্তিষ্কের বাঁদিককে ব্যবহার করে। অন্যদিকে, মেয়েরা মস্তিষ্কের দুইপাশকেই সুষমভাবে ব্যবহার করে। মস্তিষ্কের এই সুষমতাই হয়তো নারীদের যোগাযোগের দক্ষতাকে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করেছে। পুরুষের মস্তিষ্কের দুই অংশের মধ্যে বৈদ্যুতিক যোগাযোগ খুব কম। ফলে, দুই পাশের তথ্যের আদান প্রদান তাদের ক্ষেত্রে সীমিত। মানুষের মস্তিষ্কের ডান পাশে থাকে তার আবেগ, অন্যদিকে বাঁ পাশে থাকে কথা বলার কেন্দ্র। মস্তিষ্কের দুই অংশের মধ্যে সীমিত যোগাযোগের কারণে পুরুষদের পক্ষে তাদের আবেগকে সঠিকভাবে প্রকাশ করাটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

মেয়েদের এইসব বৈশিষ্ট্য, যা এক সময় তাকে পিছিয়ে দিয়েছিলো পুরুষের তুলনায়, সেই বৈশিষ্ট্য আজ শাপে বর হয়ে দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, পুরুষের ক্ষেত্রে একদিন যে সব বৈশিষ্ট্য তাকে অন্য লিঙ্গের তুলনায় সুবিধা বেশি দিয়েছিলো, আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করেছিলো, সেই সব বৈশিষ্ট্যকেই এখন প্রশ্নের সম্মুখীন করে তোলা হচ্ছে। তার সহিংসতা, তার বহুগামিতা, তার আক্রমণাত্মক বৈশিষ্ট্য এগুলোকে আধুনিক সমাজ দেখছে অত্যন্ত নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে। তাকে বাধ্য করা হচ্ছে নারীর মতো কোমল এবং মানবিক অনুভূতির বিকাশে। তা না করতে পারলে এই সমাজে সে অচল এবং অথর্ব হিসাবে বিবেচিত হবে। আধুনিক সমাজে লক্ষ লক্ষ বছরের আদিম অরণ্যচারী সমাজ থেকে প্রাপ্ত জৈব বৈশিষ্ট্যের কোনো মূল্য নেই। নবজাতকের মতোই নরকে শিখতে হবে সমাজে টিকে থাকার নতুন দক্ষতা। পুরুষ হবার জন্য এক সময় পা মাটিতে ঠুকে অহংকার করেছে পুরুষ, আর এখন পুরুষ হওয়াটাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার জন্য। ইট’স হার্ড টু বি এ ম্যান ইন দিজ সোসাইটি।


  • ১১৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা