আসুন কিছু পুরুষ মানুষের গল্প শোনাই #Metoo

রবিবার, মার্চ ১০, ২০১৯ ৯:১৭ PM | বিভাগ : #Metoo


আমার বাবা যখন মারা যান, সালটা ২০০২। সেই থেকে বলি। তার আগের কিছু পুরুষের গল্প পরে বলবো। হুম, আমার বাবা যখন মারা যান, সালটা ২০০২। তার কথা আমার খুব আবছা করে মনে পড়ে। রোমান্টিসাইজ করছি না; মৃত্যু স্বাভাবিক। আইনের চাকর ছিলেন কিন্তু কোনোদিন মাথা নোয়াতে দেখি নি। এমন অনেকবার দেখেছি ঘুষ অফারের দায়ে তাঁকে কলার চেপে খোলা বারান্দায় ধরে রেখেছেন, এই মুহুর্তে ক্ষমা চাইবি, নইলে নিচে ফেলে দিবো। সবার বাবা সবার কাছে হিরো, আমার কাছে একটু বেশি হিরো; হয়তো দুম করে মরে গেলো বলে ছোট ছোট ব্যাপারপগুলোকেই বেশি গ্লোরিফাই করি। যাক, এই গেলো বাপের কীর্তন।

বাপের পর এন্ট্রি নিলো চাচাজান। যারা আমাকে অনেকদিন থেকে জানেন, চাচাজানের সুকীর্তি কুকীর্তির কথাও জানেন। অন্যদিকে এলো এক ভালো পুরুষ। আমার খালু। অর্থবিত্তে নয়, জীবনের লম্বা সময় উনার মোর‍্যাল সাপোর্টে ছিলাম, গোটা পরিবার। কিছু খালাতো চাচাতো পুরুষ ভাইগুলো, ওদের গুণ বলে শেষ করা যাচ্ছে না, ভুলে মানুষ হয়ে জন্মেছিলো। বাকিটা ইতিহাস।

পাড়ার রিকশাওয়ালা, গাড়ির টিকিট করতে গেছি, ভোর ৪টায় গাড়ি।
-আপা, টেনশন নিয়েন না, আমি দিয়ে আসবো আপনারে।
পুরুষ।

রাতের পৌনে এগারোটা। আম্মুর কোমরে ব্যথা। কে যাবে ওষুধের জন্য?
- মাশহুদ ভাইয়া, আমারে কয়টা ন্যাপ্রোক্সেন আনি দে, আম্মু অসুস্থ।
ওষুধ এসেছে।

এসএসসি এক্সাম, সময় যত যাচ্ছে, হায়ার ম্যাথ গুলিয়ে ফেলছি। সুজিত স্যার ডেকেছেন, রোজ পড়তে আসবে, ফিজিক্স ও পড়েছি। জসিম স্যার ডেকে নিয়েছেন, এই ব্যাচে পড়তে আসবে, ইংরেজিটা ঝালাই করে নাও। গাধা ছিলাম, কেমিস্ট্রিতে কাঁচা, মধু স্যার কোনদিন ফেরান নি। এদের কাউকেই আমি ফি দিয়ে পড়তে পারি নি, কিন্তু যত্ন করে পড়িয়েছেন। আমি এ প্লাস পেয়েছি। এরা পুরুষ। এইচএসসি দিয়েছি। প্রাণেশ স্যার, সালাউদ্দিন স্যার, শওকত স্যার, হানিফ স্যার জানেন তারা আমার পড়াশোনার কতোটা টেইক কেয়ার করেছেন। আমার শিক্ষক। পুরুষ শিক্ষক। অনার্স মাস্টার্স শেষ করিয়েছেন শফিউল স্যার। পুরুষ, আমি কৃতজ্ঞ।

অফিসে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি। মাসুদ ভাই বুঝেছেন মা বাসায় একা। বলেছেন- চলে যান, বাসায় বসেই কাজটা শেষ করে পাঠিয়ে দেবেন।
জ্যোতির্ময় স্যার, মে বি একবার দেখা হয়েছিলো জীবনে। কথাও হয় নি। ফোন করেছি
-স্যার, ঘটনা এই। কী করবো?
হাসিমুখে এগিয়ে এসেছেন। আমাকে চেনেন না জানেন না। পুরুষ।

এবার বলি অন্য পুরুষ।
ডঃ আফতাব উদ্দিন। নোয়াখালী সায়েন্স অ্যান্ড কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ। সম্মানিত মানুষ, এদিকে বান্ধবীরও ফ্যামিলির খুব ক্লোজ আংকেল। ওই ফ্রেন্ড এর সাথে গিয়েছিলাম সেখানে। ক্যাজুয়াল কিছু কথা বললেন ফ্রেন্ড এর সাথে, ফ্রেন্ড এর বোন তার ছাত্রী, ছাত্রীর বেবী হয়েছে, শুনলেন। খোঁজ খবর নিলেন। আমার পড়াশোনা কোথা থেকে তা জানতে চাইলেন। একটু পর বললেন উনি এখন উঠবেন, ব্যস্ততা আছে।  বললেন মাগরিবের পর উনাকে কল দিতে, দিলাম। উনি জানালেন আমার ফ্রেন্ড এর কাছ থেকে আমার ব্যাপারে অল্পবিস্তর জেনেছেন। খুব সুন্দর করে আমার এইম ইন লাইফ জানতে চাইলেন, কম্পিউটার লিটারেসি কেমন, রেজালট কি জানতে চাইলেন। বললেন আমাদের এই অল্প স্যালারিতে তুমি পারবে না, তোমার ভাড়াতেই অর্ধেক টাকা যাবে। ভালো কোনো সুযোগ হলে অবশ্যই জানাবো তোমাকে।
আচ্ছা। আমার মনে হলো- পুরুষ, ভালো পুরুষ।

বেশ অনেকদিন পর আবার কল দিলেন, রাত ১০টায় ধরি নি। পরেরদিন সকাল দশটায় কল দিলেন। জব এর আপডেট জানতে চাইলেন। সরল বিশ্বাসে সব বলতে থাকলাম, কোথায় জব হয়েছে, স্যালারি কত। খুব ভালো জব, অনেক স্যালারি। ডক্টরেট করা মানুষ, খুশি হবেন, নিশ্চয়ই ভালো কোনো পরামর্শ তো দেবেনই। তার উপর বেস্ট ফ্রেন্ড ফ্যামিলির ক্লোজ আংকেল, এটা আরো বড় সার্টিফিকেট। তারপর উনি আমাকে সরল বিশ্বাসের সার্টিফিকেট দিলেন। আমাকে দেহব্যবসার সুযোগ করে দিতে চাইলেন।

পথে হেঁটে যাবার সময়, মোবাইলে, অনেকেই অনেক রকম উত্যক্ত করেছে, এখানে ওখানে অচেনা পথচারি সহযাত্রী হাত লাগিয়ে আলগোছে চলে গেছে, এসব ফেইস করেছি, কখনো প্রতিবাদ করেছি, কখনো পারি নি। কিন্তু বাবার বয়সী একজন লোক যাকে আমি এতো শ্রদ্ধায় অকপটে কথা বলেছি, তিনি কি করে আমাকে এসব বলতে পারেন? এটা কখনো ভাবিনি। ইন্সট্যান্ট যদি ব্রেইনটা কাজ করতো, বলতাম হ্যাঁ, আমি যাবো। তারপর উনাকে জায়গামতো এক্সপোজ করতাম।
আপনার বলবেন উনি অপরাধী নন?
উনি যদি অপরাধী না হন, উনি কেনো বললেন

-তুমি কথা গোপন রাখতে পারো? (- জ্বী পারি স্যার। আমি সেইফ। আপনি বলুন)
-একটা কথা বলো, আর ইউ ভার্জিন? ( আমি স্তম্ভিত। ওয়েল, আপনি বলে যান, দেখি কতদুর গড়ান) ( -জ্বী স্যার। আমি ভার্জিন। আমার একটা রিলেশন ছিলো, এজন্যেই তো ভেঙেছে) 
-এভাবে কতদিন আর স্ট্রাগল করবে। আমার সাথে অনেক ফরেন ডেলিগেটদের জানাশোনা আছে। তোমার ফ্যামিলি স্ট্রং না, এজ্যুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো না, তুমি টাকা পয়সা দিতে পারবে না, সো ফিজিক্যাল নেগসিয়েশন সবচে ইফেক্টিভ উপায়। আমি তোমাকে অ্যারেঞ্জ করে দিতে পারি।

আমি আমার মোরালিটি ক্লিয়ার করলাম-
আমি আমার জীবনে কোনোদিন সততা নিয়ে কারো সাথে আপোষে যাই নি। কোনদিনই যাবো না।
-আচ্ছা আমাকে আর বলতে হবে না। আমি বুঝতে পেরেছি। এসব কাউকে শেয়ার কোরো না। কিন্তু যদি কখনো মনে করো ক্যারিয়ারের লং রানে তুমি টায়ার্ড, আমাকে বোলো। আমি সব ব্যবস্থা করে দিবো।

হুম, তিনি জানতেন তিনি অপরাধ করতে যাচ্ছেন, তাই ‘তুমি কথা গোপন রাখতে পারো?’ দিয়ে শুরু করেছেন। আর ‘কাউকে বোলো না’ দিয়ে শেষ করেছেন।

কই, বন্ধু মাশহুদের সাথেও ঘন্টার পর ঘন্টা সিলি বিষয় নিয়ে আলাপ করেছি। সে তো কোনোদিন বলে নি এসব!
সুজিত স্যার, জসিম স্যার, হানিফ স্যার ওনাদের কেউ তো বলেন নি।
মাসুদ ভাইয়ের সাথে আড়াই বছর কাজ করি, কোনোদিন তিনি বলেন নি আসুন আপনাকে মানুষ ধরিয়ে দিই, ক্যারিয়ারে ভাল করতে পারবেন।
এনাদের সাথেও আমি কাজে অকাজে নানা গল্প করি। কিন্তু ওনারা তো কী কোনোদিন এই এপ্রোচ করেন নি!

ওনার কি হয়েছিলো? আমি আপনাকে বিশ্বাস করেছি, অন্যায় হয়েছে? ফোন ধরেছি অন্যায় হয়েছে? শিক্ষক বলে অনর্গল সব বলেছি তাতে সাহস পেয়ে গেছেন? আমি শেষ কথাটি পর্যন্ত নরম্যাল থেকেছি। খুবই নরম্যাল কথা বলার চেষ্টা করেছি শেষ শব্দ পর্যন্ত। এতেও আপনার মনে হলো না কেনো মেয়েটা আমাকে গালি দিলো না? ফোন রেখেও আপনার লজ্জা লাগে নি? আচ্ছা আফতাব স্যার, আপনার মতোন একজন ডক্টরেটধারীর সাথেও কথা বলতে গেলে এসব প্রপোজ পাই, কাকে বলবো, দেখিয়ে দিন।

আপনাকে দায়িত্বশীল ভেবেছিলাম পুরুষ, শিক্ষিত ভেবেছিলাম। জব নাহয় না-ই দিলেন, ব্রোথেলে চালান করতে চাচ্ছিলেন কেনো আমাকে? আপনার এত ছাত্রী কেনো আমাকে আপনার নামে এসব লিখছে? আপনার স্টুডেন্টরা আপনাকে সমর্থন দেবার কথা। আমাকে কেনো দিচ্ছে? বলতে পারেন? কেনো আজ পর্যন্ত আপনি একটা কথা বলার প্রয়োজন মনে করেন নি? দরকার নেই? ক্ষমা চাইতে কষ্ট? একটা বড় ডিগ্রী আছে বলে, সামাজিক মর্যাদা আছে বলে?
আমার তো কিছুই নেই স্যার, ডিগনিটি ছাড়া। এই অল্প জিনিসটাই টান দিলেন কেনো?
আপনিই বলুন আমার কি করা উচিত? আমি কি আর কোনোদিন কাওকে বিশ্বাস করবো না? আর কোনো শিক্ষকের সাথে কথা বলবো না?
আপনি বলুন, আমি সেদিন মন দিয়ে শুনেছি। আজও শুনবো।


  • ৯০৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

ফেসবুকে আমরা