প্রসঙ্গ: ঈশ্বর ও প্রেম

সোমবার, অক্টোবর ১, ২০১৮ ২:০৭ AM | বিভাগ : ওলো সই


এইযে আমার ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রতি অসম্ভব টান দেখে যেসব লোকজন চিরকাল "করলেই হয়, আবার শিখলেই হয়" করতে থাকতো, তারা জানে না এইসব সম্পূর্ণ গুরুমুখী বিদ্যা চাইলেই ওমনি শিখলেই হয় না যার তার কাছে। খুব খুঁতখুঁতে মানুষ। চার বছর বয়েস থেকে টানা তেরো বছর খুব ভালো তালিম পেয়েছিলাম বলে ওরিজিনালিটি বুঝি এবং সেদিকে নজর কড়া। এর ক্রেডিট মা কে দিতে হয় কারণ ওই গণ্ডগ্রামে সঠিক শিক্ষক বুঝতে পেরেছিলেন।

মা নিজে কোনদিন কিচ্ছু শেখার সুযোগ না পেয়েও (রবিতীর্থে বোধ হয় কিছুদিন গান শিখেছিলেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত) শিল্পের উৎকর্ষ খুব ভালো করেই বুঝতেন/বোঝেন চিরকালই। তাই সেই চব্বিশ বছর আগে এম এ করতে থাকা একজন "ছেলে"র কাছে নাচটা শিখতে দিয়ে দিলেন।

অগণ্য শুভাকাঙ্খীর "নাচ আর কতদিন করবে, বিয়ে হয়ে গেলে, বয়েস হয়ে গেলে, বরং গানটা শেখালে..." শুনে আর আমার অতুলনীয় হেঁড়ে বেসুরো গলার দিকে কর্ণপাত করে মা প্রমাদ গুণতেন। 
আমি তৃতীয় ছাত্রী ছিলাম মাস্টারমশাই এর। নিজের মেয়ে/বোন জ্ঞান করতেন। আমাকে শেখানো একটা ভয়ানক ব্যাপার ছিলো। কারণ সাড়ে চারটেয় শেখাতে আসার সময় হলে চারটে কুড়িতে ঘুঙুর প্রণাম করে, পরে, বসে থাকতাম। চারটে পঁয়ত্রিশ বেজে গেলেই সাইকেলটি না দেখা গেলে কেঁদে ভাসাতাম। একটা একলেয়ার্স চকলেটের আধখানা খেয়ে বাকিটা গুরুর জন্য রেখে দেওয়া হতো। যা কিছু রেখে দেওয়া হতো তা খেতে বাধ্য করা হতো। না খেলেই চোখ ছলছল। একটা যেকোনো কিছু শেখানো মাত্রই পেরে যেতেই হবে। না পারলেই আবার হাঁউমাউ। মা মাস্টারমশাই দু’জনে মিলে বুঝিয়ে পারতেন না যে প্র্যাকটিস করলেই পারবো। সুতরাং বরাদ্দ একঘন্টার সময় অনেক সময়ই পেরিয়ে যেতো।

আমি ছিঁচকাঁদুনে ছিলাম বলতে লজ্জা নেই। পারফেকশনিস্ট ও। "ওই হলো" তে শান্তি হয় না কিছুতেই। তাই কালবৈশাখী উপেক্ষা করে ভিজে জুব্বুড় হয়েও আসতেই হতো।
নাচটা ছেড়ে দিলাম কলেজে ভর্তি হয়ে হস্টেলে গিয়ে।
সবাই জানলো সময় পাই না, সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়ি এসে ক্লান্তি...
নাচ এ ক্লান্তি?
নাঃ। 

সবাই জানলো না যে ততদিনে কী ভয়ানক ক্ষতি ও ক্ষত তৈরি হয়েছিলো প্রাণপণ ভালোবাসা মানুষের থেকে। শুধু আমার মুখ চেয়ে মা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে গেছেন কত বছর। 
নিজের শিষ্যা কেউ হারায়? কেউ ক্ষতি করে? কেউ চায় তাকে আটকে রাখা? ঈর্ষা হয় নিজের শিষ্যার ওপর? 
এই অদ্ভুত জগতে হয়। সব হয়। আরও অনেক কিছু হয়। 
তখন সতেরো বছর বয়েস হয়েছে, অনেক কিছু বুঝতে শিখেছি। আর যাই নিই মা'র অপমান এক কণা নিই না বলেই জেদ করে ছেড়ে দিলাম। 

সেই প্রথম আমার হৃদয় ভাঙা। শিখতে চাইলেই শেখা যায়? যাযাবর জীবন হয়ে গেলো। গুরু পছন্দ হয় না, শিক্ষক খুঁজেও পাই না। নাচ হারিয়ে গেলো শুধু কলেজ ফেস্ট এর খিচুড়িতে। মজা কম করি নি যদিও সেখানে। অনেক সুখস্মৃতি জড়িয়ে সেসব লেট নাইট রিহার্সাল ঘিরে। কিন্তু আমার যে সবেতেই বড় "আসল" পাবার লোভ!

আজ এত বছর পরে অবশেষে আবার শেখার সুযোগ পাচ্ছি। যদিও সম্পূর্ণ অন্য শৈলী। শিক্ষিকা আমার বয়েসী বা আমার চেয়ে ছোটই হবেন। তার নিপুণতায়, তার গ্রেস এ, তার নিখুঁত হবার চেষ্টায় মুগ্ধ হয়েই শিখতে চেয়েছিলাম। শেখানোয় ও তার নিষ্ঠা ও অসাধারণ। তবে বেশীদিন তো শেখা হবে না। এদিক ওদিক চলে যাবো। 

দিনের শেষে বুঝতে পারি এসব রিসার্চ টিসার্চ না, যদি নাচতে পারতাম, লিখতে পারতাম, আর কুঁচেকাঁচাদের পড়াতে পারতাম তবে বড্ড সুখী হতাম। 
আমার আর ওপরে ওঠা হয় না। চারপাশ থেকে গুঁতোয় একটু একটু এগোই মুখ ব্যাজার করে। ঠোক্কর খাই অন্যমনস্কতায়...
বাকি সময়টা...

সারা পৃথিবীতে কোথায় কী খারাপ জিনিস ঘটলো তা নিয়ে মনখারাপ করে কাঁচকলা হয়। করবিই বা কেনো উপাসনা? সমাজসেবা হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। ইউটোপিয়া? স্বপ্ন! পৃথিবী এমনই নিষ্ঠুর। আগে নিজেরটা গোছা। তা গোছাই বটে, তবে পাটপাট ভাঁজ করে নয়, ওই ঠুসে দিই খুসে দিই দলা পাকিয়ে। ঢাকনাখানা বন্ধ করে ঝপ করে ঠিকানাবদল ই তো। 

ওদিকে স্বপ্ন দেখা মানুষ দেখে, আশা না হারানো মানুষ দেখে, বন্ধু ভেবে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে দেখি ও বাবা সেই ফেসবুকের দলবাজিটুকুই সার! আসলে ফেরবার নেই তাদের, স্বপ্নও নেই আসলে। সবটুকু মিথ্যে। প্রায় সবটুকু মিথ্যে।

অদ্ভুত এক অস্থিরতা তৈরি হয়। সবাই খালি বলে প্রেম করো। কী মুশকিল! ডাক্তার ফাকতার ও সারাতে পারে না এখানে। ওরা জানে না, ওরা বোঝে না। ওরা জানে না সেই এককামরার ভাড়া বাড়িটার মেঝে ড্যাম্পে ফুলে ফুলে ফেটে থাকতো। আমার পাঁচ বছরের কোমল পা এ তৎকার করতে কিন্তু ব্যথা লাগতো না। একটুও না। পায়ের নীচ টা লাল হয়ে যেতো, জ্বালা করতো। মা'র কষ্ট হতো, আমার সুখ। এই সুখী দেশের সুখী মানুষরা এসব বোঝে না। বোঝে না তারাও যারা সুখ খুঁজতে এসেছে। তারা বারবার লেটেস্ট আইফোন মডেল এর আলোচনায়, ব্ল্যাক লেবেল এ ডুবে যেতে চায়। তেত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস এ এসির জন্য তাদের প্রাণ হাঁফিয়ে ওঠে। আমার ফেসবুকে লেখা ছাড়া উপায় কী? বিদ্রূপে বিচলিত হতে হতে ছেড়ে দিলাম শেষে। 

এখন আমার পুরনো ওষুধটা পেয়েছি আবার। টপিক চেঞ্জ করতে দেখলেই মনে মনে নাচ প্র্যাকটিস করি। মুদ্রায় আঙ্গুলগুলো নরম হয়ে আসছে না তো? শক্ত টানটান থাকছে তো?

যত্ন করে আজকাল কিছু আর লেখা হয় না। অথচ আমি ভার্জিনিয়া উলফ এর মত লিখতে চেয়েছিলাম। নিজের ঘরে বসে। একার ঘরে বসে। নিজের ঘরে। হয় না। 

আমার কেরিয়ার গড়াও হয় না। 
উচ্ছন্নে যায় সব। 

মাঝে মাঝে খুব জোরে চিৎকার করে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করে। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর অন্ততঃ তিন, চাই চাই চাইই? 

পেতেই হবে উপাসনাকে? নইলে চারপাশে বড্ড মেঘ জমে। 

এমন নয় যে কাজটি ভালোবাসি না। বাসি। বিয়ে হয়েছে তার সাথে, সংসার চট করে ভাঙা যায়?
ভাঙতে চাইলে চারপাশে বড্ড মেঘ জমে।

আকুল হয়ে কখনো কখনো কোনো উদ্ধারকারী বন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছি "আমি একা নই বলো? তোমরাও ফিরে যাবে তো? যাবে বলো? চলো চলে যাই"। 

আকুলতা "দেখি দাঁড়া" এ ভেসে যায়। কিংবা মিথ্যা, অহংকার, ক্ষুদ্র দলবাজি। সমাজসংস্কার! 
হাঁসফাঁস লাগলেই সেসময়টা আজকাল আবার মনে মনে নাচটা ঝালিয়ে নিই। চক্কর এ ভারসাম্য হারালে চলে না। একটা একফুট ব্যাসার্ধের বৃত্তের মধ্যেই থাকতে হয়। গোড়ালিটা শক্ত করতে হয় সবখানেই। সমস্ত শৈলী ও ধারায়।

হাতের আঙ্গুলগুলো নরম হয়ে আসছে না তো?
চারপাশে বড্ড মেঘ জমে। কিন্তু কাঠের মেঝের পলকা বাড়িতে নাচা যায়?
পয়সা দিয়ে টিকিট কাটিয়ে লোককে দেখানোর জন্য নাচা যায় পাথরটুকুর প'রে?
টাকাপয়সা টিকিট মিকিট বৃষ্টি হয়ে ঝরে ধুয়ে মিসিসিপি মিসৌরিতে একদিন মিশে যাবে ঠিক। 
হাতের আঙুলগুলো নরম হয়ে আসে নাতো? 
পা ও কাঁপে না যেন। জেনো। এই সার জেনো।


  • ২৩৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

উপাসনা

পোস্ট ডক্টরেট রিসার্চ স্কলার, নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি।

ফেসবুকে আমরা