উপসংহারে অন্য সকাল

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৬, ২০১৮ ৪:৩০ PM | বিভাগ : সাহিত্য


একটা তারামাছ

ঘরময় সিগারেটের ছাই উড়িয়ে মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে গিটারে নতুন গানের সুর তোলায় মগ্ন রূপম। রূপমের পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসে মিলি। চুলগুলো অবিন্যস্ত, প্রসাধনবিহীন মুখে অনিশ্চিতের ছায়া তবু ওর ভাবতে ভালো লাগছে একটু আগেও যে মিলি পরাগকে প্রাণপণে মুছে ফেলতে নিজেকেই নিশ্চিহ্ন করার কথা ভাবছিলো সেই এখন রূপমের সুরের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে। মিলির ফ্ল্যাট থেকে রূপমের ফ্ল্যাটের দূরত্ব এমন কিছু কম নয়। ঢাকার যানজট পেরিয়ে খুব একটা আসাও হয় না ওর কাছে। তবু আশৈশব বন্ধু রূপমের এই ব্যাচেলর ডেনে যখনই সে আসে সঙ্কোচহীন আসে। আজ খুব ভোরের দিকে একা শুয়ে থাকতে থাকতে কিছুক্ষণের জন্য মিলি ঢুকে পড়েছিলো একঝাঁক মাছদের মাঝে। ছোট্ট একটা তারা মাছ হয়ে খেলে বেড়াচ্ছিলো বড় এ্যাকুরিয়ম ভর্তি মাছদের সাথে। তারপর উঠে পড়ে কিছুক্ষণ এ ঘর ও ঘর করে হঠাৎই প্রয়োজনীয় দু’একটা জামা ছোট একটা ব্যাগে তুলে হাউসকোট ছেড়ে কোনোরকম একটা শাড়ি জড়িয়ে অটো ধরে সোজা রূপমের কাছে।

রূপম এখন গিটারে টুংটাং। ঘরের কোণে একটা রকিং হর্স মৃদু মৃদু দুলে যাচ্ছে।

একজন চন্দ্রা অথবা..

ল্যাচ আটকে যাবার শব্দ মিলিয়ে গেলে মিলি ধীরে সুস্থে গ্যাসে চায়ের জল চাপায়। ফ্রিজ খুলে ক্যপসিকাম, বিনস, গার্লিক আর লঙ্কা বের করে কুচিয়ে নেয়। ফুটন্ত জলে চা পাতা ফেলে। জলের বাষ্প ক্লান্তিহরা চা পাতার গন্ধ নিয়ে জানলা দিয়ে পাশের ফ্ল্যাট অভিমুখী হলে মিলির স্নায়ু আরেকবার চায়ের জন্ম উন্মুখ হয়ে ওঠে।  কিচেনের সাথে লাগোয়া স্টোররুমের ফ্লোরে বিছানা পেতে ঘুমিয়ে চন্দ্রা। তার নাকে সে সুঘ্রাণটি পৌঁছায় না, কেনো না মিলি ঘুরে তার ঘুমন্ত মুখে দেখে, অতল ঘুমের গভীরতা। মেয়েটার মুখে অদ্ভুত এক লাবণ্য। মাস খানেক হলো এসেছে, বলা ভালো মিলিই ওকে এনেছে। শীতের এক সন্ধ্যায় মিলি মানিকগঞ্জে ওদের নিজেদের বাড়িতে চন্দ্রার দেখা পেয়েছিলো। চন্দ্রার মা তার মায়ের ফুটফরমাস খাটতো। হঠাৎই দু’দিনের জ্বরে পড়ে শীতের এক রাতে পৃথিবী ছেড়ে সে চলে গেলে মাতৃহীন চন্দ্রা আশ্রয়প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়েছিলো মিলির বাপের বাড়ির দরজায়। সে দরজা থেকেই মিলি তাকে নিয়ে এসেছিলো নিজের ফ্ল্যাটে।

দু’জন মানুষের ঘরে তেমন কিছু কাজ তো নেই, আঁকাআঁকির বাইরে যেটুকু সময় তাতে এত একঘেঁয়েমি ভর করে যে কিছুটা একাকিত্ব কাটাতেই যেন ও চন্দ্রাকে এনেছে। মনের কোনে খেলে গেছিলো চন্দ্রাকে দেখতেও মন্দ নয়, কাজেই চাইলে তার আঁকার মডেলও করা যাবে। একহাজার স্কোয়ার ফুটের এই ফ্ল্যাটে মিলির আঁকার ঘর বাদ দিলে বাড়তি ঘর বলতে এই স্টোর রুমটাই। মিলি স্টোররুমে কিছুই রাখে নি বলে বহুদিন ফাঁকা পড়ে আছে। বছর ষোলো’র মেয়েকে এক চিলতে হা করা ড্রইংরুমে শুতে দেওয়া যায় না, আঁকার রুমটা নিজের ঘুমোনোর জন্যও মিলি ব্যবহার করে। সব দেখেশুনে চন্দ্রা নিজেই কিচেন লাগোয়া স্টোররুমটা বেছে নিয়েছে।

 

অন্য এক সকাল

ঘুম হলো মেমসাহেব? আধঘুম থেকে চমকে তাকায় মিলি। রূপম দরজায় দাঁড়িয়ে। হাতে ধোঁয়া ওড়ানো গরম কফির মগ। কখনও কি এক কাপ চা করে মিলিকে পরাগ খাইয়েছিলো? মনে পড়ে না। ঘরের মেঝেতে শুয়ে থাকা মিলিকে দেখতে মেমসাহেবের মতোই। যদিও ওর এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা চুল কিছু মেঝেতে কিছু মুখে। রোদ এসে ওর পায়ের পাতা ছুঁয়ে দিলে সামান্য নড়ে ওঠে মিলি। চোখ মেলেই আবার চোখ বুজে ফেলে সে। গভীর শূন্যতাবোধেরও আগে এসে দাঁড়ায় অন্য এক বোধ। আমি এখানে কেনো, এ-ভাবনায় তাড়িত মিলি আবার চোখ খোলে আবার বোজে আবার খুলে টের পায়, শরীর চাদরে ঢাকা হলেও তার পিঠ আড়ষ্ট হয়ে আছে মেঝের শীতলতায়।

শোন্! অর্ধেক রাত তো বরের শোকে আকুল হয়ে কাঁদলি। দু’পেগ হুইস্কি খেয়ে সারারাত প্রচুর ভুলভাল বকে মেঝেতেই ঘুমিয়ে গেলি, তোর পাশে সারা রাত কিন্তু আমি জেগে বসেছিলাম।

কাজে বেরিয়ে গেলে ফিরতে ফিরতে আমার সেই রাত্তির। একা থাকতে পারবি তো? লক্ষ্মী মেয়ের মতো শাওয়ার নিয়ে আমার বিছানাতেই টানা ঘুম দিবি। মনে থাকবে?

 

ক্যানভাসের রাত

একটা জীবনের যেটুকু দেখা তারও বহু বেশী যে অদেখা সেকথা মনে হলেই মিলির মনে হয় আসলে কারো কারো কাছে বিশেষ এক আয়না থাকে যেখানে একবার চোখ রাখলেই অন্য ভুবন। তেমন আয়না পেলে মিলিও হয়তো ক্যানভাসের বদলে যাত্রা শুরু করতো আলো-আঁধারির হাতছানি মেশা অন্য সেসব অজানা জগতে। যা কিছু অজানা, অদেখা তা এখনকার মিলির ছবির মতো রঙচঙে না হোক মিলির জন্য খুলে যেতো নতুন জগত..

আপাতত ক্যানভাস। আপাতত রঙ-তুলি, আর একমুখী নিরবতায় সেদিকেই তাকিয়ে মিলি হয়তো ভেবে চলেছে এখনও রোমাঞ্চ ভরা সেই অজানা ভুবনের কথা। তার পলকহীন চোখ ক্যানভাসে নিবদ্ধ অথচ নিজেকে হারিয়ে ফেলছে সে ক্যানভাস ছেড়ে দূরে, বহুদূরে কোথাও।

আর কী অদ্ভুত, সারারাত ধরে ক্যানভাসের উজ্জ্বল খয়েরিতে আঁকা এক বুনো ঘোড়া প্রায়জীবন্ত হয়ে ক্যানভাস ছিঁড়েফুঁড়ে ঢুকে পড়তে চাইছে ঘরের ভেতর। আর অন্ধকারের মাঝে হঠাৎই ছড়াতে শুরু করেছে আলো যেন উদীচী ঊষা। মনের সাথে চোখের হঠাৎ সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে এক ঘোর থেকে আরেক ঘোরের ভেতর নিজেকে আবার হারিয়ে ফেলে। ঘোর কাটাতে চমকে এদিক ওদিক তাকায়। অবাক হয়ে দেখে পর্দার ফাঁক গলে, কাচের শার্সি অগ্রাহ্য করে ভোরের প্রথম আলো ডানা ঝাপটে মুখ রাখছে মিলির ঘরে। ধীরে ধীরে প্রসন্ন হয়ে ওঠে মিলির চোখ। ভ্রূকুঞ্চন স্বাভাবিক হয়ে আসে। জানলা থেকে চোখ সরিয়ে সারা রাত ধরে এঁকে চলা বুনো ঘোড়াটার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকে মিলি। তারপর ঘরের আলো নেভায়। জানলার পর্দাগুলো সরিয়ে আলোর আসা যাওয়ার পথ অবারিত করে ইজেলকে টেনে আনে জানলার কাছে। তেলরঙের কাজ শুকোতে দেরি হয় বলে আজকাল ও তেলরঙে বেশি আঁকতে চায় না। এক একটা ছবি শেষ করতে এত সময় লেগে যায় যে মিলির ধৈর্যশক্তি কমতে থাকে তুলনায় এ্যাক্রেলিকের ছবি কত দ্রুত শেষ হয়, কাজ গুটিয়ে তুলিগুলো তারপিন তেলে ভিজিয়ে রাখতে গিয়ে খেয়াল হয় পেটে ছুঁচো ডন মারছে। জানলার কাছে গিয়ে সে আরেকবার দাঁড়ায়। দূর থেকে ভেসে আসছে প্রার্থনা-সঙ্গীত। ডায়নিং রুমে হালকা পায়ের শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে মর্নিং ওয়াকে যাবার জন্য তৈরি পরাগ। আড়চোখে মিলিকে দেখে নিতে নিতে স্নিকারের ফিতে বাঁধে। দাঁড়িয়ে জল খায়। আবার আড়চোখে মিলিকে দেখে।

-কিছু বলবে?

-কী হবে বলে?

পরাগের ইঙ্গিত মিলি বুঝতে পারে। ঘুরে ফিরে প্রতিদিন বহুবারই সে মিলির রাত জাগার কথা বলে সে। উত্তর দেবে না ভেবেও মিলি বলে,

-রাতেই আসে যে..

-কে?

প্রশ্ন করেই নিজেকে সামলে নেয় পরাগ। কিচেনের দিকে হেঁটে যাওয়া মিলির নির্লিপ্ততা বলে দেয় উত্তর পাবে না আর।

 

এবং রূপম

আহ রূপম.. কই স্কুল ছেড়ে কলেজ, চারুকলার দিনগুলোতে একজন ভালো ও প্রিয় বন্ধুর বাইরে তেমন করে তো কখনও রূপমের জন্য আলাদা কোনো টান ও টের পায় নি, রূপমও সেরকম কিছু মিলির প্রতি কখনই প্রকাশ করে নি। ওরা দু’জন আজন্ম যেন একইরকম সুরে বাঁধা ভালো বন্ধু। স্টুডেন্ট লাইফ শেষে রূপম পাড়ি জমিয়েছিলো জার্মানিতে। বহুদিন পর সেই আবার যখন ওদের যোগাযোগ হলো, রূপম ততদিনে কেবল আঁকা নয়, সখের গাইয়েও। সমাবর্তনে দেখা আবার দুই বন্ধুর। তারপর মিলি মাঝে মধ্যে রূপমের ফ্ল্যাটে আসতে শুরু করে। আজ ওই মেমসাহেব ডাকটা মিলির ভিত যেন নাড়িয়ে দেয়। প্রাচীনদিনের গন্ধভরা আগুনের চেয়ে স্নিগ্ধ এক আলোর রূপটানে নিজেকে ভরিয়ে নিতে নিতে দূর থেকেই রূপমকে দেখে মোমের তরলের মতে গলতে থাকে মিলি। রূপম মিলির সেই বন্ধু যে তাকে জীবনের গল্প শোনায়, যে তাকে পূর্ণতার কথা শোনায়। মিলিকে ঘিরে রূপমের গোপন ভালোবাসা মিলি টের পায় কিন্তু কখনোই সেই পূর্ণতার খোঁজে রূপম বা মিলি কেউই কারো কাছে নিজেদের সমর্পণ করে নি। আজ টের পায় বহুদিনের আটকে পড়া সমস্ত গ্লানি আর নেমে আসা সেই সুতীব্র অন্ধকার ওর কাঠিন্য সব সপাটে সরিয়ে বেরিয়ে আসছে স্রোতের মতো আবেগ। ফিরে ফিরে আসছে নিজস্ব কোমলতাগুলো। রূপমের বুকে হঠাৎই ঝাঁপিয়ে পড়ে মিলি কাঁদতে শুরু করে। পিঠের ওপর হালকা হাত রাখে রূপম। প্রশ্ন করে না। ধীরে, খুব শান্তস্বরে বলে -কাঁদ।

অনেকটা সময় পেরুলে রূপম ওকে শক্ত করে দাঁড় করায়। বন্ধুর উষ্ণতা দিয়ে বুকে জড়িয়ে বলে, সামলে নে। তুই একা নোস কখনও। আমি তো আছি না কি! কথা দে আজ থেকে আবার তুই আঁকবি আমার সাথে। দু’জনের আঁকাগুলো নিয়ে এ বছরই একটা এক্সিবিশন হবে দেখিস কীরকম সাড়া পড়ে। নিজেকে সামলে নিয়ে মিলি সোজা হয়ে দাঁড়ায়। চোখের জল মুছে বলে, কী খাবি বল রূপম, ব্রেকফাস্ট বানাই তোর জন্য। রূপম মিলির ঠোঁটে আঙ্গুল ছুঁইয়ে বলে, উঁহু আমার না, আমাদের জন্য।

 

সকাল যেমন করে হতো

দু’টো ডিমের স্প্যানিশ ওমলেট আর ব্ল্যাক টি বানিয়ে মগ হাতে নিয়ে মিলি বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। তিনতলা ফ্ল্যাটের দক্ষিণমুখী বারান্দাটা থেকে বড় রাস্তাটা দেখা যায়। গ্রিল ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আলোর ঢেউ লেগেছে চারদিকে। দূরে প্রাতঃভ্রমণকারীদের একটা দল ক্রমেই বিন্দুর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ওই মানুষগুলোর মাঝে হয়তো পরাগও আছে। কেমন এক অবসাদের ভেতর মনে হয় মিলির জীবনেও এক বিন্দু হয়ে গেছে পরাগ। অভ্যাসের বশবর্তী হয়ে এখনও সে কেবল পরাগ নামটিকে নিজের যাপনে বহন করে চলেছে। একটু একটু করে আজকের এই ক্যানভাসে রঙে নিজেকে সঁপে দেওয়া, তার পিছনে খুব সহজতা নেই, আছে অন্ধকার। অন্ধকার সেই সময়ের কাছে মিলি ফিরতেও চায় না। কিন্তু স্মৃতি নামক ঝড়ে প্রায়ই যখন সে আক্রান্ত হয় তখন তার মনে হয় দু’জন মানুষ তুমুল ভালোবাসাবাসির পরই তো এক ছাদের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলো। তবু কেনো বদলে যায় জীবনের রেখচিত্র। মিলি থাকার পরও পরাগের জীবনে কেনো অফিসে কলিগের মতো অন্য কারও উপস্থিতি প্রয়োজন হয়ে পড়ে, আর এসমস্ত যখন স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে, তখন অফিস ফেরত পরাগকে তার নিজের পুরুষ বলে আর মনে হতো না। যৌথতার প্রশ্নে সে ক্রমে ক্ষত বিক্ষত হতে হতে বেছে নিয়েছিলো গাদা গুচ্ছের ঘুমের ওষুধ এবং মাদক। আজকের এই ক্যানভাস, দেখা অদেখার আয়োজন, যাদের কাছে আজ তার সমর্পণের চেষ্টা এ তো মিলির জন্য নয়। কবেই তো সে বৃন্তচ্যুত দাম্পত্য নামক বিশাল বৃক্ষের ছায়া থেকে।

চা বিস্বাদ লাগে মুখে। কিচেনে ঢুকে চায়ের মগ, কেতলি, প্যান আর প্লেট সিঙ্কে ধুয়ে মুছে জায়গায় তুলে রাখে। চন্দ্রাকে ডেকে পরাগের ব্রেকফাস্টে কী হবে বলে দিয়ে সে গরম জলে একটা শাওয়ার নেয়। তারপর নিজের বিছানায় ঘুমোতে যায়।

 

একটা দুপুর

কেটে গেছে বেশ ক’টা দিন। এবার মিলি একটু একটু করে গুছিয়ে নিতে চাইছে নিজেকে। রূপমের কাছে আর কতদিন। এভাবে থাকার মানেও যেমন নেই, ভালোও দেখায় না অহেতুক কিছু কথা বাতাসে ছড়াবে যার তেমন কোনো ভিত্তি নিজের দিক থেকে এখন অবধি নেই। আপাতত কাজ চাই তার। তারপর কোনো লেডিজ হোস্টেলে জায়গা করে নেওয়া যাবে। ক’দিন ধরে রুটিন পালটে ঘরদোর গুছিয়ে দুপুরের দিকে মিলি জব সাইটগুলো সার্চ করে। পেয়েও যাবে শিগগির এমনই ভাবে। আজ তিনটে জায়গায় সিভি ড্রপ করে হঠাৎ ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুকলো মিলি। ফেসবুকে ও কদাচিৎ আসে। ফেসবুককে কেমন একটা চিড়িয়াখানার মতো লাগে। এই তো নিউজফিডের ওপর নিচ ভর্তি কেবল আত্মপ্রচারের খবর। স্ক্রোল করতে করতে হঠাৎই চোখে পড়লো হ্যাশ ট্যাগে মী টু লিখে স্কুল ফ্রেন্ড রিমির দেওয়া একটা পোস্ট। হ্যাশ ট্যাগের মী টু ব্যাপারটা আসলে কী বুঝতে সে একবার ওটাতেই ক্লিক করে বসলো। খুলে গেল #মী টু বা আমিও নামের যত ক্যাম্পেইন আছে তার অধীনে একে অন্যের সাথে ভাগ করে নেওয়া অভিজ্ঞতার ঝাঁপি।

গুগল করে মিলি জেনে নিলো ছোট দু’টি শব্দ দিয়ে, যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদে সামাজিক মাধ্যমে জোরালো আওয়াজ তুলতে হ্যাশট্যাগ ‘মি টু’ লেখার  প্রথম আহ্বান জানান আমেরিকান অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো। এরপর থেকেই টুইটার ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে এই হ্যাশ ট্যাগ আন্দোলন শুরু হয়েছে। আলিশা মিলানো নামের ওই অভিনেত্রী ফেসবুকে লিখেন, 'আপনি যদি যদি নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন তাহলে 'মী টু' লিখে টুইট করুন।' সাথে সাথেই ফেসবুক ও টুইটারে দ্রুত ছড়িয়ে যেতে থাকে এই প্রচারণা। মিলানোর টুইটে শুধু নারীরা নয়, সাড়া দিচ্ছেন পুরুষ এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাও।

সারাটা বিকেল, সন্ধ্যা কিভাবে পার হয়ে গেলো মিলির সে টেরও পেলো না। একের পর এক নিপীড়নের কথায় সোচ্চার হচ্ছে মানুষ। অথচ নিজে কিছু আগেও এ ব্যাপারে কিছুটি জানতো না। এমন অজ্ঞতার কাছে লজ্জ্বায় মিইয়ে গিয়ে যখন সে সামাজিক মাধ্যমগুলো একেবারেই অকাজের নয় বলে ভাবে তখুনি চোখ আটকে যায় একটি #মী টু পোস্টে। মুহূর্তে জগৎ সংসার আগামী দিনের ভাবনা সমস্ত থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

 

বিভ্রমের এক রাত

এক একটা ছায়ার দুপুর এখানে নৈঃশব্দ্য নিয়ে আসে। কেটেও তো যায় যদিও থেকে থেকে ধেয়ে আসে ঘূর্ণি। মনে পড়ে যায় সেই রাতের কথা। কীভাবে মুহূর্তে সব শেষ হয়ে যায়। এই কি জীবন! সে রাতে চুপচাপ ফাঁকা ক্যানভাসের সামনে যে বসে ছিলো আর আজ রূপমের ঘরে বসে আছে যে, সেই মিলি আর এই মিলি কি এক! মাথাটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। সেদিন রাতে না ওর আঁকতে ইচ্ছে করছিলো না ঘুমাতে। দীর্ঘসময় ক্যানভাসের সামনে স্থবির বসে যখন সে ভাবছিলো ঘুমোতে যাবে তখনই মনে পড়ে গেছিলো বিকেলে ল্যান্ডলাইনে জরুরি ফোনটা এসেছিলো। পরাগের কাছে সে খবরটা যে করেই হোক পৌঁছাতে হবে। ঘুমন্ত পরাগকে না জাগিয়ে সামান্য উসখুস করে স্থির করেছিলো একটা চিরকুট লিখে তার বেডসাইড টেবিলে রেখে আসা বরং ভালো। পরাগের দরজার হাতল ঘুরিয়েছিলো সে সন্তর্পণে। আলো নিভে যাওয়া ঘরে তখন ল্যাপটপের মিউট করা স্ক্রিন জুড়ে নগ্নতার আলো। আর সে আলোতেই চোখে পড়েছিলো দু্’টো ছায়ার শরীর কীভাবে একে অন্যতে লীন হয়ে যাচ্ছে। সে মুহূর্তে ঘন কুয়াশার ভেতর থেকে উঠে আসছিলো স্মাজড কোবাল্ট ব্লু। ঠিক ক্যানভাসের ঘোড়ার মতো কেশর ফুলিয়ে এক রিদমের ভেতর পরাগের ছায়া উঠছিলো, নামছিলো, উঠছিলো… প্রবল বিস্ময়ের ভেতর চন্দ্রার নগ্ন শরীরের উন্মত্ততা আর ওরই দিকে মুখ ফেরানো চন্দ্রার মুখ চাপা দিয়ে শীৎকার চাপা দেবার প্রয়াস স্বত্ত্বেও মিলিকে দেখে বিস্ফারিত ওই চোখ দেখতে দেখতে স্তব্ধতার মুখে টের পাচ্ছিলো নেমেছে কী প্রবল ভূমিধ্বস ..

 

আবার কোনো এক রাতে

কত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যেন কোথাও বেল বাজলো। শব্দে চমকে দেখে রাত দশটা বেজে পনের।

কে এলো রূপম কি?

দরজা খুলতেই চমক। লজ্জা পাওয়া মুখে এক বাঞ্চ হোয়াইট লিলি আর দু’একটা প্যাকেট হাতে নিয়ে রূপম দাঁড়িয়ে। মিলি সরে গিয়ে জায়গা করে দিলো।

ফুলগুলো মিলির হাতে দিয়ে রূপম বললো আয় আজ সারারাত আড্ডা দিই খুব ... কিন্তু তার আগে একটু ফ্রেস হয়ে নিই কী বলিস।

রূপম শাওয়ার নিতে গেলে মিলি ট্রে তে দু’টো গ্লাস রাখে, প্লেটে কাজু নাটস আর চানাচুর সাজায়। তারপর দক্ষিণের যে জানলাটা থেকে রাস্তা দেখা যায় সেখানে দাঁড়িয়ে রাত এগারটার ব্যস্ত নগরীর চলমানতা দেখে।

কতটা সময় যেন আজ পেরিয়ে গেলো? কথায় কথায় রাত বেড়েছে। মিলির জন্য অনেক আগেই প্যাকেট বেরিয়েছিলো শাড়ি, চুড়ি, টিপের পাতা, এ্যাক্রেলিক কালার। ভরা হুইস্কির বোতল ধীরে ধীরে খালি হয়েছে। মিলি বলছিলো কম। শুনছিলো বেশি। হাসছিলো মাঝে মাঝে। হঠাৎই প্রশ্ন করলো, আজ এত শপিং এর ঘটা!

রূপম উঠে ফ্রিজ থেকে জলের বোতল বের করতে করতে বললো, বিশেষ খবর দেবো তাই।

-আমি ভাবলাম প্রপোজ করবি

-পাগলা না কি!

-কেন?

মিলিকে গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে নিজের গ্লাস তুলতে তুলতে হঠাৎই বললো, এই বেশ আছি। খামোকা প্রপোজ করি আর তুমি ষাটের দশকের নায়িকার মতো বিনবিনিয়ে কাঁদতে বোসো ..ওসব চলে না বস!

মিলি স্থির রূপমের দিকে তাকিয়ে কিন্তু মিলির চোখ হাসছে। কতটা সময় গড়ালো কে জানে। বোতলের তরল প্রায় তলানীতে ঠেকেছে। আরেকটা পেগ ঢালতে মিলি বললো

-আর খাসনে রূপম। ডিনার করবি না?

-ওকে ডান কিন্তু মিলি তাহলে চুমু খেতে দিবি, বল!

-রূপম, খাবি চল

-তোকে একবার ছুঁতে দিবি? দিবি মিলি?

-রাত বাড়ছে। ঘুমোবি না?

-কখনও মুখ ফুটে কিচ্ছুটি দাবি করি নি। আজ যদি চাই, দিবি?

-আয়

মিলি উঠে দাঁড়ালো। রূপম চেয়ার ছেড়ে মিলির খুব কাছে এসে দাঁড়ায়। চোখে চোখ রেখে বুঝতে চায় মিলি আয় বলে কি খেতে ডাকছে না কি সত্যি চুমু চাইছে। পরক্ষণেই মিলিকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। মিলি মাথাটা রূপমের বুকে রাখে কিছুক্ষণ চুপ তারপর মুখ তুলে জিগ্যেস করে, রূপম... বর্ণালী রায় কে?

-বর্ণালী?

-ইয়েস, বর্ণালী রায়..

মিলির চোখ এখন শান্ত। স্পষ্ট স্বরে আবার মিলি বলে.. মী টু পোস্টে বর্ণালী রায়কে নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ হচ্ছে রূপম। বর্ণালী সুইসাইড করেছে গতরাতে।

রূপমকে উদভ্রান্ত দেখায়। এক ঝটকায় সরে যায় মিলির কাছ থেকে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়েই থাকে।

দেখতে দেখতে দেয়ালে সেঁটে থাকা আদিবাসী মুখোশের সাথে ঝুলে থাকে রূপমের ফ্যাকাশে মুখ আর ঘরের কোণে রূপমের সেই রকিং হর্স হঠাৎই নড়েচড়ে উঠে। বাইরে জোর হাওয়ার দাপট। রূপমের ফ্ল্যাটের দরজা জানলা হাওয়ার তোড়ে ভাসতে থাকে। দেখতে দেখতে প্রকাণ্ড হয়ে ওঠে সেই রকিং হর্স যেন ক্যানভাস ছিঁড়েখুঁড়ে বেরিয়ে আসছে কেশর ফোলানো মিলির আঁকা সেই ঘোড়া..  

আর সমস্ত অন্ধকার উপেক্ষা করে মিলি তখন রাস্তায়, হেঁটে চলেছে সোজা পুব দিকে। গলির মোড়ের কাছে গিয়ে একবার থমকে দাঁড়ায়। পেছন ফিরে দেখার কথা একবার মনে হয়, তারপর কি জানি কেনো চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে অসময়ে!

-না, থাক, কিছু মায়াকে মাড়িয়েই এগোতে হয়। সামনে সকাল মেলে দিচ্ছে আলো। আলোই হয়তো বা...


  • ১২৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মেঘ অদিতি

কবি, লেখক ও গ্রাফিক ডিজাইনার

ফেসবুকে আমরা