ভানুরেখা: সিনেদুনিয়ার প্রখর আলোর এক মায়াবি কুহেলিকা

বুধবার, অক্টোবর ১০, ২০১৮ ১:২৪ PM | বিভাগ : সীমানা পেরিয়ে


“মুম্বাই ছিলো আমার কাছে একটা জঙ্গলের মতন! চারপাশে থাকতো হিংস্র বাঘ-ভাল্লুকের মতো কিছু মানুষ, তারা ছিলো সুযোগসন্ধানী। আমাকে গ্রাস করতে চাইতো। আমি নিজে কেবল ভাবতাম, কি করছি আমি! আমার তো স্কুলে থাকার কথা এখন! বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবার কথা, আইসক্রিম খাওয়ার কথা! অথচ আমাকে বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি খাবার খেতে হচ্ছে শরীর ঠিক রাখার জন্য! আমাকে সুন্দর দেখানোর জন্য একগাদা গয়না, পোশাক পরান হচ্ছে। এক স্টুডিও থেকে আরেক স্টুডিও দৌড়ে যাচ্ছি কেবল, ১৩ বছর বালিকার জন্য এর চাইতে ভয়াবহ জীবন কি হতে পারে?”

১৩ বছরের কথা বলছি কেনো! জন্ম থেকেই কি জীবনের ভয়াবহতা দেখেন নি তিনি? ভানুরেখা গনেশন জন্মেছিলেন জনপ্রিয় তামিল অভিনেতা জেমিনি গনেশন এবং তেলেগু অভিনেত্রী পুস্পাভ্যাল্লীর ঘরে। জেমিনি আর পুস্পা পরস্পরকে বিয়ে করেন নি কোনোদিন।

জেমেনির ছিলো বিশাল নারীপ্রীতির ইতিহাস। মাত্র ১৯ বয়সে বিয়ে করেন অ্যালামেলুকে। অ্যালামেলুই জেমিনির একমাত্র ‘বিয়ে করা বউ”, যার ঘরে জন্মেছিলো চারজন কন্যা। বিয়ের পর তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো পুস্পাভ্যাল্লী এবং সাবিত্রীর সঙ্গে। পুস্পাভ্যাল্লীর সঙ্গে জন্ম হয় ভানুরেখা আর রাধার। সাবিত্রীর সঙ্গেও জন্ম নেয় দুই কন্যা আর এক পুত্র! ৭৮ বছর বয়সে গিয়ে আবার বিয়ে করেন জেমেনি ৩৬ বছরের জুলিয়ানাকে। এত নারীর সঙ্গে সম্পর্কগুলো খুব চুপিসারে রাখতেই ভালোবাসতেন তিনি। তাই ভানুরেখা গনেশন জন্ম নিলে অস্বীকার করেন তাকে। ১৩ বছরে নয়, জন্মের পরেই বিশাল ধাক্কা পেলো ভানুরেখার ছোট্ট জীবনটা।

বিনুনি ঝুলিয়ে স্কুলে যেতেন। চেন্নাইয়ের চার্চ পার্ক কনভেন্টে পড়তেন। নামী স্কুল। কিন্তু পড়া বেশীদিন সইলো না। পরিবারের আর্থিক অবস্থার জন্য, মা আর বোনের দিকে তাকিয়েই অল্প বয়সে ভানুরেখাকে নামিয়ে দেওয়া হলো বলিউডের কঠিন রাস্তায়! যে রাস্তায় তিনি হারিয়ে যেতেই পারতেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে কানাড়া মুভি “অপারেশন জ্যাকপট নেইল” এ নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন। আর এভাবেই সিনেমায় আসেন বলিউড ডিভা রেখা।

১৯৬৯ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বলিউডে যাত্রা শুরু হয় রেখার। ‘আনজানা সফর’ নামে একটি মুভিতে অভিনয় করেন রেখা। এই মুভিতেই অনস্ক্রিন প্রথম চুমু খায় বাঙালি অভিনেতা বিশ্বজিৎকে। এই চুমুর ছবিটা ক্যাপচার করে কিছু ম্যাগাজিনে ছাপিয়ে দেওয়া হয়! যা হলো আর কি! এই সময়ে চুমু টুমু নিয়ে যে কথা হয়! ঐ সময় একটা নিস্পাপ চুমু সিনের জন্য সিনেমাটি সেন্সর বোর্ডে আটকে গেলো। কিন্তু তারপরও কাহিনি রয়ে যায়! বলছি সে কথা!

ভাষাটাই ছিলো রেখার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা। শুরু হলো হিন্দি শেখা। এরপরই রেখা উপহার দিতে থাকেন কিছু ব্যবসাসফল কমার্শিয়াল ছবি। রামপুর কা লক্ষণ, প্রাণ যায়ে পার ভাচান না যায়ে, কাহানি কিসমত কি। তবে সমস্যা থেকে গেলো! বলিউড ইন্ডাস্ট্রি তাজ্জব হয়ে দেখতে লাগলো “Ugly Ducking” ফেস নিয়ে কি করে সিনেমায় নাম করে মেয়ে? রেখার নিজে কষ্ট লাগতো অনেক, যখন তাকে সবার সামনে আর দশটা হিরোইনের সঙ্গে তুলনা করে বোঝান হতো “সে আসলে কিছুই না”।

বিচ্ছিরি খাওয়া আর ব্যায়ামের সঙ্গে নিজের জীবনকে মানিয়ে নিলো রেখা। আর তারপর উপহার দিলো এক আশ্চর্য ফিগার আর রুপ! যে রুপের সন্ধানে আজও কত যুবক ডুব দেয় অরুপরতনে! যে রুপের এক ফোটা পেলেই বর্তে যায় তরুণীরা!

রেখার সিনেমা জীবন আর ব্যাক্তিজীবন- এই দুই জীবনের ব্রেকথ্রুই অমিতাভের সঙ্গে “দো আনজানে” সিনেমায় অভিনয়। একে একে এই জুটি উপহার দেয় সুহাগ, মুকাদ্দার কি সিকান্দার, রাম বলরাম, নটবর নটলাল এর মতো জনপ্রিয় ছবি। তাদের লিপে ডুয়েট গান মানেই এক একটা ইতিহাস!


রেখা প্রথম ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের মুখ দেখেন অভিনয় জীবনের নয় বছর পর। ১৯৭৮ সালে “ঘর” ছবিতে এক ধর্ষিত গৃহবধূর চরিত্রে। সেই প্রথম গ্ল্যামার অভিনয়ের বাইরে গিয়ে রেখা প্রমাণ করলেন নিজের অভিনয়সত্তাকে।

রেখা অভিমান করে একবার বলেছিলেন, “সব মুভিতেই আমি নিজেকে ঢেলে দিতে চাই! কিন্তু যখন আমি ‘খুবসুরুত’ করি লোকে বলে আমি ফিরে এসেছি, ‘সিলসিলা’ করি তখনও বলে আমি ফিরে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি ‘উমরাও জান’ এর সময়! কিন্তু কথা হলো আমি গিয়েছিটা কবে?”

রেখা অমিতাভের শেষ ছবি ছিলো ‘সিলসিলা’। রেখা-অমিতাভ-জয়ার বাস্তব ট্রায়াংগাল সম্পর্ককে পর্দায় এনেছিলেন যশ চোপড়া। ততদিনে চারদিকে চাউর হয়ে গিয়েছিলো রেখার বাংলোতে অমিতাভের যাওয়া কিংবা রেখার জন্য সহকর্মীর গায়ে হাত তোলার গল্প। কিন্তু তবুও এই সিনেমার সময় জয়া রেখাকে ডাকেন বাড়ির দাওয়াতে। দাওয়াত শেষে যাবার সময় রেখাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন জয়া, “অমিতাভকে ছাড়ছেন না তিনি”।

এভাবেই সিলসিলা ভালোবাসা শেষ হয়ে যায় ছবির শুটিংয়ের সাথে সাথেই। কিন্তু সিনেমায় তাদের স্বতঃস্ফূর্ত রোমান্টিক সিনগুলো দেখে কেউ ভাবতেই পারছিলো না, 'এই সম্পর্ক আর থাকছে না'। আদতেই যোগ্য অভিনেত্রীর আচরণই করেছিলেন রেখা। তাই আজও স্পষ্ট করে অমিতাভের সঙ্গে তার প্রেমের গল্প বলেন না। অমিতাভকে বরাবর “শুভাকাঙ্ক্ষী” বলেই পরিচয় দিয়ে এসেছেন।

অমিতাভ ছাড়াও বিটাউন মুখর থাকতো জিতেন্দ্র, কিরণ কুমার, বিনোদ মেহরার সঙ্গে তার সম্পর্কের গল্প নিয়ে। এমনকি বিনোদ মেহরাকে তিনি বিয়ে করেছেন এমন কথাও চাউড় হয়েছিলো সেইসময়। বহু পরে সিমি গারওয়ালের এক অনুষ্ঠানে উড়িয়ে দেন সেই কথা।

১৯৯০ সালে বিয়ে করেন ব্যবসায়ী মুকেশ আগারওয়ালকে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মুকেশ সুইসাইড করেন। এরপর আর বিয়ে করেন নি রেখা। তবে প্রায় অনুষ্ঠানে সিঁদুর পরে যান! সে কি কেবলই ফ্যাশন? এক অনুষ্ঠানে তিনি স্বীকার করেন, ‘তার দুইবার বিয়ে হয়েছে। সেকেন্ড হাজব্যান্ড মুকেশ”। তাহলে প্রথমজন কে? না চাইতেও আঙ্গুল চলে যায় অমিতাভের দিকে। তবে সে গল্পের আর গুজবের কখনই শেষ নেই।

রেখার ভীষণ নামডাক হবার পর, বাবা জেমিনি পিতৃপরিচয় দিতে এসেছিলেন। রেখা প্রত্যাখ্যান করে তার স্বীকৃতি। শুধু তাই নয়। যে চুমু খাওয়ার অপরাধে আটকে গিয়েছিলো প্রথম সিনেমা, সেই সিনেমাও “দো শিকারি” নাম দিয়ে বের হয় ১৯৭৮ সালে। একেই বলে “তেলের মাথায় তেল দেওয়া”।

এসবে রেখার কিছুই যায়ে আসে না। নিজের আনন্দে কাজ করে গিয়েছেন তিনি। উমরাও জান ছবিতে অভিনয় করে অর্জন করেছেন জাতীয় পুরস্কার। পেয়েছেন পদ্মশ্রীও।

এত বয়সেও দিব্যি অভিনয় করে যাচ্ছেন। অভিনয় ছাড়া তিনি থাকতেই পারবেন না। এই বয়সেও তার রুপের কমতি ঘটে নি এতটুকু।

বলিউডের মাসলা দুনিয়ার গসিপ হলেও, রেখার জীবন থেকে পাওয়া যায় এক সংগ্রামী নারীর গল্প। মেয়েদের জন্য শ্বাপদসংকুল কদর্যতায় ভরা বলিউডে একাই উড়িয়েছেন জয়ের কেতন। আজ এত নায়িকার ভীড়েও, রূপে-গুণে-অভিনয়ে রেখার সমকক্ষ কারো দেখা পাওয়া যায় না। বলিউডে রেখা যে একজনই!

তিনি বরাবরই 'রহস্যময়ী' এক নারী। বড় পর্দাকে বিদায় জানিয়েছেন বেশ কিছু দিন আগেই। তবু আজও তার মতোই হতে চান যে কোনও উঠতি নায়িকা। তিনি বলিউডের পর্দা কাঁপানো, দর্শক হৃদয় ভোলানো নায়িকা রেখা। তার পুরো নাম ‘ভানুরেখা গণেশন’ তবে বলিউডে তিনি ‘রেখা’ নামেই পরিচিত। আপাত পক্ষে দেখে বোঝার উপায় নেই যে বয়স বাড়ছে না কমছে। দেখতে দেখতে ৬৪ বছর কাটিয়ে ফেললেন তিনি। আজ রেখা-র ৬৪তম জন্মদিন।(১০ অক্টোবর ১৯৫৪) তার জন্মদিনে রইলো শুভকামনা। শুভ জন্মদিন রেখা।

তিনি ‘খুবসুরৎ’, বলিপাড়ার অদ্বিতীয় ‘উমরাও জান’৷ তার ‘আঁখো কি মস্তিমে’ ডুব দিয়েছে ভারতীয় সিনেমার রুপোলি ইতিহাস৷ কেননা সেই ডুবসাঁতারের শেষে তার দৃষ্টিতেই যে ‘সাহিল মিলতা হ্যায়’৷ তিনি ভানুরেখা গণেশন, বলিউডের রেখা৷ তবে কে না জানে বলিউডের এ বিদ্যুৎ‘রেখা’র সামনে সময়ও হার মানে৷ আজও যেকোনো নায়িকাকে জিজ্ঞাসা করা হোক অথবা এই কিংবদন্তি নায়িকার কোনো চরিত্রে অভিনয়ের কথা বলা হোক এক কথায় রাজি হয়ে যান তারা।

ভানুরেখা গণেশন থেকে বলিউডের এভারগ্রিন ডিভা হয়ে ওঠার পথটি সোজা ছিলো না। এ এক আশ্চর্য সমাপতন যে সংগ্রামে-সাফল্যে যিনি হিন্দি সিনেমার দুনিয়ায় নারী শক্তির ক্ষমতায়নের প্রতিভূ হয়ে উঠেছেন, তাঁর জন্মদিনও দেবীপক্ষেই।

গসিপ, সম্পর্কের ভাঙা-গড়া সব মিলিয়ে ছবির মতোই তার জীবন বর্ণময়। বলতে কি, রেখা নিজেই এক প্রতিষ্ঠান। পুরস্কার বা সিনেমার সংখ্যায় তাই তার পরিমাপ হয় না। সংগ্রামের যে সৌন্দর্য, লালিত্যা-কমনীয়তার সঙ্গে ব্যক্তিত্বের কাঠিন্য মিশলে যে অনমনীয় আভিজাত্য ফুটে ওঠে তার নামই রেখা।

বলিউডের চিরসবুজ এই নন্দিত অভিনেত্রী। দেবীপক্ষে যখন নারীশক্তির আরাধনা তখন তার জন্মদিনে সেই নারীশক্তির অন্য সৌন্দর্যকেই কুর্নিশ জানিয়েছে কোটি কোটি ভক্ত।

শুভ জন্মদিন সুবর্ণরেখা


  • ২৩৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

ফেসবুকে আমরা