ভারতে ৪৯৭ ধারা বাতিল: লিবার্টির পথে আরেক ধাপ

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৮ ১:১৮ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


এক.

এই আইনটা এর আগেও আমি কয়েকটা পোস্টে উল্লেখ করেছি। যেসব পোস্টে নারীও যে পূর্ণাঙ্গ মানুষ এই কথাটি বলেছি, সেইসব পোষ্টের কোনো কোনো জায়গায় আইনটার উল্লেখ পাবেন। আইনটা উল্লেখ করেছি উদাহরণ হিসাবে দেখানোর জন্যে যে আমাদের আইনেও নারীকে পুরুষের মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসাবেই বিবেচনা করা হয়, পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসাবে নয়।

আইনটা হচ্ছে আমাদের পিনাল কোড বা দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা- এডাল্টারি। এডাল্টারির বাংলা করা হয় ব্যাভিচার হিসাবে। একই বিধান ভারতের দণ্ডবিধিতেও ছিলো, কেননা আমরা দুই দেশই এটা কলোনিয়াল উত্তরাধিকার হিসাবে পেয়েছি। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই আইনটা আজকে বাতিল ঘোষণা করেছে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আজকের এই রায়ের খবরটা একেক জায়াগায় একেকরকম শিরোনামে এসেছে। ফেসবুকে টুইটারেও দেখলাম বিভিন্নজন রায়টাকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। প্রায় সর্বত্রই ব্যাভিচার বা পরকীয়া ব্যাপারটা যে আর অপরাধ হিসাবেই বিবেচিত হবে না এই দিকটার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে সকলেই। না, এটাও ঠিক আছে, এটা ভুল কথা না। কিন্তু এই আইনটা বাতিলের ফলে মানুষ হিসাবে নারীর মর্যাদার ব্যাপারটা যে এক ধাপ এগিয়েছে এই ব্যাপারটা খুব বেশী কাউকে গুরুত্ব দিতে দেখলাম না। সেই কথাটা বলার জন্যেই এই ছোট লেখাটা।

ইন্ডিয়ান সুপ্রিম কোর্টের রায়টা আমি পড়ি নি। সুতরাং কি যুক্তিতে ওরা আইনটা বাতিল করেছে আর রায়ে কি কি বলেছে সেগুলি নিয়ে আমার এখানে কিছু বলছি না। আমি কেবল এই আইনটা কেনো একটা মন্দ আইন সেইটা আপনাদেরকে বলার চেষ্টা করছি। তার আগে চলেন মূল আইনটাতে কি বলা আছে সেটা দেখি। দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা, Adultery:

"Whoever has sexual intercourse with a person who is and whom he knows or has reason to believe to be the wife of another man, without the consent or connivance of that man, such sexual intercourse not amounting to the offence of rape, is guilty of the offence of adultery, and shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to five years, or with fine, or with both. In such case the wife shall not be punished as an abettor."

দুই. 

মানে কি? মানে হচ্ছে যদি কেউ কোনো বিবাহিতা নারীর সাথে তার স্বামীর সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, সেটা যদি নারীটির সম্মতিতেও হয়, তাইলে সে ব্যাভিচারের অপরাধে অপরাধী হবে। ব্যাভিচারের শাস্তি হবে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা বা দুইই। তবে অপরাধের সহযোগী হিসাবে নারীটিকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। মোটামুটিভাবে এইটাই হচ্ছে আইন।

এই আইনে খারাপ কি আছে সে কি ব্যাখ্যা করে বুঝাতে হবে? চলেন তাই করি।

অপরাধটা কি? স্বামীর অনুমতি ছাড়া বিবাহিতা নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন। অনুমতি লাগবে কার? স্বামীটির। নারীর অনুমতি থাকলেও হবে না। আইনেই বলছে, such sexual intercourse not amounting to the offence of rape, মানে নারীর সম্মতি যদি থাকে তাইলেই এই অপরাধটা হবে। নারীটির সম্মতি না থাকলে সে তো ধর্ষণই হবে, কিন্তু এই আইনের অপরাধটা তখনই হবে যখন শারীরিক সম্পর্কটি ধর্ষণ বিবেচিত হবে না। মানে যখন নারীটির সম্মতি থাকবে, কিন্তু তার স্বামীর সম্মতি নাই। আইনটি মূল ভিত্তিটা তাইলে কি? মূল ভিত্তিটা হচ্ছে যে বিবাহিতা নারীর মালিক হচ্ছে তার স্বামী।

এইটাই হচ্ছে আইনটার মন্দ দিক। এই আইনে ধরে নেয়া হয়েছে যে নারীরই শরীরের মালিক নারী নিজে নয়। নারীর সম্মতি প্রদানের কোনো দাম নাই। নারীর শরীরের মালিক হচ্ছে পুরুষ, আর নারীর শরীরের মালিকের অনুমতি নিয়ে অপর একজন পুরুষ তাঁকে ভোগ করতে পারে। নারীর ইচ্ছার কোনো মূল্য নাই। কেনো? কেননা নারী তো মানুষ না, নারী হচ্ছে ভোগের পণ্য মাত্র, ভোগের বস্তু মাত্র। নারীর শরীর হচ্ছে কেবল পুরুষের ভোগের জন্যে, আর যৌন মিলন হচ্ছে কেবল পুরুষের জন্যে একটা আনন্দের কাজ, নারীর শরীরটি সেই কাজে ব্যাবহৃত হবে বটে, কিন্তু নারীর তাতে আনন্দ বা পুলক পাওয়ার কিছু নাই।

এইটাই হচ্ছে এই আইনটার নগ্ন খারাপ দিক। আমাদের দেশে আজকে এই দুই হাজার আঠারো সনেও আইনের বিধান হচ্ছে এইরকম। যে, নারীর মালিক হচ্ছে তার স্বামী। অন্য কোনো পুরুষ নারীটিকে ভোগ করতে পারবে, তবে তার জন্যে তাকে নারীর স্বামীর অনুমতি নিতে হবে অথবা স্বামীটির সাথে যোগসাজশ করে নিতে হবে। আর যদি নারীটির স্বামীর অনুমতি না থাকে তাইলে সেটা হবে একটা অপরাধ। যেন অনেকটা আপনি যদি আমার পোষা ছাগল খেয়ে ফেলেন তাইলে যেরকম অপরাধ হবে, সেইরকম অপরাধ।

পরকীয়ার সাথে এই আইনটা মিলিয়ে ফেলবেন না। পরকীয়া ভিন্ন জিনিস। পরকীয়ায় নারীটি বিবাহিতা নাও হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে এই আইনের প্রয়োগ নাই। পরকীয়ার ইস্যুটা ভিন্ন।

তিন.

এইটা বরং নারীর অধিকারের প্রশ্ন আর নারীর নিজের শরীরের উপর তার নিজের উপর নিজের মালিকানার প্রশ্ন। একজন নারী কার সাথে মিলিত হবে বা না হবে সেটার সিদ্ধান নারীটি নিজে নিজেই নিবে। নারীটি তো মানুষ, নাকি? মানুষই যদি হয়, তাইলে সে কি তার নিজের শরীরের মালিক নয়? অবশ্যই সে তার নিজের শরীরের মালিক। সুতরাং তার সিদ্ধান্দ সে নিজেই নেবে। তার স্বামী বা তার পিতা বা তার ভাই বা পরিবার নয়।

এইখানে একদল লাফিয়ে উঠবেন। বলবেন তাই বলে মেয়েরা একজনকে বিয়ে করে যার তার সাথে শুয়ে বেড়াবে? তাইলে সমাজের আর থাকলোটা কি? সমাজ তো উচ্ছন্নে যাবে ইত্যাদি।

থামেন। নারী বা পুরুষ বলে কথা নয়, প্রতিটা মানুষেরই অধিকার আছে সে তার নিজের সাথী পছন্দ করবে, নিজের ইচ্ছা মতো নিজের পছন্দের মানুষের সাথে মিলিত হবে। এখন, একজন নারী তিনি যদি বিবাহিতা হন বা একজনের সাথে সম্পর্ক থাকে, আর সেই সম্পর্ক থাকা অবস্থায়ই আরেকজনের সাথে প্রেম করেন, মিলিত হন, তাইলে সেটা তো ভাই সমাজের সমস্যা না বা রাষ্ট্রের সমস্যা না। এটা হচ্ছে নারীটির সাথে যার সম্পর্ক তার সমস্যা।

আর এটা কেবল নারীর ব্যপারও তো না। একজন পুরুষও তো একজনের সাথে বিবাহিত থাকা অবস্থায় আরেকজনের সাথে প্রেম করতে পারেন, মিলিত হতে পারেন। তাতে আপনারই বা কি করার আছে বা রাষ্ট্র বা সমাজেরই বা কি করার আছে। এইটা হচ্ছে ঐ দুইজন বিবাহিত নারী ও পুরুষের নিজেদের সমস্যা। একজনের সাথে বিবাহিত থাকা অবস্থায় একজন পুরুষ যদি আরেকজন নারি সাথে মিলিত হন, তিনি তো তার স্ত্রীর সাথে একটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ অবশ্যই করছেন। সেজন্যে কারো যদি কোনো প্রতিকারমূলক ব্যাবস্থা গ্রহণের অধিকার থাকে তাইলে সেটি হচ্ছে প্রতারিত স্ত্রীটি বা প্রতারিত স্বামীটি। সমাজের বা রাষ্ট্রের এখানে কি করার আছে? ঘোড়ার ডিম।

আইন কেনো নারীকে পুরুষের মালিকানায় একটি বস্তুর মতো বিবেচনা করবে? এটা তো অন্যায়।

চার. 

এইরকম আইন কি করে এসেছে আমাদের সমাজে? এসেছে কারণ নারীকে আমরা সবসময়ই পুরুষের অধীন পুরুষের সম্পদ বিবেচনা করেছি। এবং এখনো এই দেশে এইরকম মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম না যারা মনে করে নারীর আবার সম্মতি কী? নারীর আবার আনন্দ কী? নারীর আবার পুলক কী? পুরুষের অধিকার আছে যে কোনো সময় যে কোনো নারীর উপর উপগত হওয়া। এরা মনে করে যে নারীকে ঢেকেঢুকে চার দেয়ালের মধ্যে বা পর্দার মধ্যে রাখার দায়িত্ব হচ্ছে পুরুষের। কেননা পুরুষই হচ্ছে নারীর মালিক। পুরুষ নারীর জন্যে ভাত জোগাবে, কাপড় জোগাবে- নারীর কাজ হচ্ছে পুরুষের বিছানা গরম করা আর বাচ্চা ফুটানো আর পুরুষের ফুট ফরমাস খাটা।

নারীর সম্মতি বলে যে একটা ব্যাপার আছে সেই জিনিস এদের মগজের মধ্যেই নাই। আপনি হাজারটা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ওদের মাথায় এটা ঢুকাতে পারবেন না যে নারীকে স্পর্শ করতে হলে নারীটিরই সম্মতি নিতে হবে।

এরা দেখবেন যে বেপর্দা নারী দেখলেই মনে করে যে নারীটিকে ধর্ষণ করা জায়েজ আছে। কেনো? কারণ বেপর্দা মানে হচ্ছে এর তো কোনো মালিক নাই, ছাড়া গরু, ইচ্ছা করলেই খেয়ে দেওয়া যায়। এইটা যে গরু না, একটি মানুষ, এবং তার নিজের সম্মতি বলে যে একটা ব্যাপার আছে সেইটা ওদের মাথায় কখনোই ঢুকে না।

কিন্তু এইটা তো চলতে পারে না। নারীর অধিকারকে আপনি কতদিন অস্বীকার করবেন? নারীকে আপনি কতদিন ব্যাবহারের বস্তু হিসাবে বিবেচনা করবেন? এইটা তো ভাঙতেই হবে। প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যে নারীও মানুষ এবং নারীর সম্মতিটাই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তার স্বামী তার মালিক না। অন্য কেউই তার মালিক না। নারীর মালিক নারী নিজে। নারী তার মনের মালিক, তার দেশের মালিক আর তার ইচ্ছার মালিক। এইটা যদি মানেন, তাইলে এই আইনকে আপনি মন্দ না বলবেন কি করে?

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ৪৯৭ ধারা বাতিল করেছে মানে হচ্ছে এইটুকু প্রাথমিক স্বীকৃতি মাত্র। কিসের স্বীকৃতি? স্বীকৃতি এইটুকুই যে বিবাহিতা নারী যদি তার নিজের ইচ্ছায় স্বামী ব্যাতিত অপরের সাথে মিলিত হয়, তাতে রাষ্ট্রের বা সমাজের হস্তক্ষেপ করার কিছু নাই। এটা হচ্ছে পরস্পরের সাথে সম্পৃক্ত সেইসব নারী পুরুষের নিজস্ব ব্যাপার।

লিবার্টির আরেকটা ধাপ মাত্র।


  • ২২০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ইমতিয়াজ মাহমুদ

এডভোকেট, মানবাধিকারকর্মী

ফেসবুকে আমরা