ভারতীয় বা আরব্য পুরাণের সাদা-কালো দেবীরা: শ্বেতকায় ও কালো জনজাতির প্রতীক?

সোমবার, আগস্ট ২০, ২০১৮ ১:৫৯ AM | বিভাগ : পাঁচমিশালী


আইনের মতো নীরস বিষয়ে পড়লেও মূলতঃ সমাজতত্ত্ব বা নৃ-তত্ত্বই পড়া উচিত ছিলো আমার। প্রায় বছর তিনেক আগে প্রাক-ইসলামী আরবের পৌত্তলিক যুগের দেবী উপাসনাভিত্তিক ধর্ম বিষয়ে খানিকটা পড়া হয়েছিলো আর তখনি একটি ঘটনা মাথায় কিছু চিন্তার জন্ম দেয়। এঙ্গেলস বা মর্গ্যান দু’জনেই খোদ গ্রিক পুরাণের বিশ্লেষণ করেই দেখিয়েছেন যে কিভাবে গ্রিক পুরাণে ‘ফিউরি’ বা মাতৃহত্যার প্রশ্নে কঠোর দন্ডপ্রদানকারী শাস্তির দেবীদের ধীরে ধীরে পরাভব ঘটে, নারী দেবতারা পুরুষ দেবতাদের স্ত্রী/প্রেমিকা বা যৌন সঙ্গীনী হিসেবে পরিগণিত হতে থাকেন এবং পুরুষ দেবতার প্রাধান্য বিস্তার লাভ হতে থাকে।

আদিম সাম্যবাদী সমাজ, পশুপালন ভিত্তিক সভ্যতা ও কৃষিভিত্তিক সভ্যতার পরে উদ্বৃত্ত মূল্যের সৃষ্টির সাথে সাথে পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতার যতই বিস্তার ঘটছিলো, ততই পুরুষ দেবতার প্রাধান্য বিস্তার পাচ্ছিলো সব সভ্যতাতেই। ভারতের মতো দেবী উপাসনাকারী সমাজেও ‘যোনী’ পূজার পরিবর্তে ‘লিঙ্গ’ পূজা একটা সময় প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদি-খ্রিষ্টান-ইসলাম ধর্মে একেশ্বরবাদ ও সেই নতুন ধর্মত্রয়ীকে মানুষের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে আসেন তিন মহা‘পুরুষ’- মোজেস-যিশু-মুহাম্মদ। একেশ্বরবাদ পুরনো দেব-দেবী বা বহুল পরিমাণে নারী দেবতারও অংশগ্রহণমূলক সভ্যতাকে হঠিয়ে পিতৃতান্ত্রিক সিস্টেমের প্রসারের ইঙ্গিত যেখানে ‘জিহোভা’, ‘গড’ বা ‘আল্লাহ’ নিরাকার হলেও সদা সর্বদা ‘হি।’ কখনোই ‘শী’ নয়। তাঁদের ব্যখ্যাতারাও পুরুষ (মোজেস-যিশু-মুহাম্মদ)।

আরবে প্রাচীনতম যুগ থেকে আজকের হিন্দুর ভগবানের মতো ‘আল্লাহ’ নামে এক নিরাকার সর্বশক্তিমানের অস্তিত্ব থাকলেও ‘আল্লাহ্’র অনেক বিভাজন ছিলোই। অসংখ্য পৌত্তলিক দেব-দেবীও ছিলো। আরবের তিন মহা শক্তিমতী দেবী ‘লাত-মানত-উজ্জা’কে ‘আল্লাহর তিন কন্যা’ হিসেবেও ভাবা হতো। ইসলাম সেসবেরই কঠোর সংস্কার করে। তবে, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, যুক্তি-অযুক্তির বাইরে গিয়ে নিছকই সমাজতাত্ত্বিক/নৃ-তাত্ত্বিক এবং খানিকটা নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা যদি বিভিন্ন সভ্যতার এবং বিভিন্ন সময়পর্বের ধর্মগুলো (যার অনেকগুলোই আজ বিলুপ্ত) পাঠ করি, তবে সমাজতত্ত্ব-নৃ-তত্ত্ব-নারীবাদের অনেক অজানা দিক আমাদের সামনে উন্মোচিত হতে বাধ্য।

এমনি একটি ঘটনা ঘটে ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে ইসলামের পরিপূর্ণ বিজয়ের পরে।

মুসলিমদের হাতে মক্কা জয়ের পর ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (দ:) প্রাক-ইসলামী যুগের সব দেব-দেবীর যাবতীয় বিগ্রহ ধ্বংসে প্রয়াস পেলেন। ৬৩০ অব্দে সেনাপতি খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদকে ইসলামের নবী পাঠালেন নাখলাহয় দেবী আল-উজ্জার মন্দির বা বেদী ধ্বংসের জন্য। দেবী আল-উজ্জার মন্দির তথা বেদীকে পূজা করতেন কুরাইশ ও কিনানাহ গোত্রের পূজারীরা এবং এই মন্দিরের সেবায়েত ছিলো বানু শৈবান গোত্রের পূজারী।

যাহোক, সেনাপতি খালিদ উজ্জার মন্দিরা বা বেদী ধ্বংস করতে ৩০ জন মাত্র ঘোড়সওয়ার নিয়ে একাই চললেন। তবে, উজ্জার কিন্ত দু’টো বিগ্রহ ছিলো। একটি আসল উজ্জার মন্দির তথা বিগ্রহ আর একটি ছিলো নকল মন্দির বা বিগ্রহ। খালিদ প্রথমে নকল মন্দিরটিই ধ্বংস করলেন। তারপর তুষ্ট চিত্তে ইসলামের নবীর কাছে ফিরে এসে বিগ্রহ ভঙ্গের সাফল্য বয়ান করতে গেলে নবী তাঁকে বললেন, ‘তুমি কি সেখানে অস্বাভাবিক কিছু দেখেছো?’

‘না,’ খালিদ উত্তর করলেন।

‘তবে তুমি আল-উজ্জাকে ধ্বংস করো নি,’ নবী বললেন, ‘আবার যাও।’

নিজের ভুলে নিজের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে, খালিদ আবার চললেন নাখলাহয় এবং এবার তিনি আল-উজ্জার আসল মন্দির বা বেদীটি খুঁজে পেলেন। মন্দিরটির সেবায়েত বা পুরোহিত ইতোমধ্যে প্রাণ ভয়ে পলায়ন করেছে তবে সরল বিশ্বাস থেকেই দেবীর গলায় ঝুলিয়ে গেছে একটি তলোয়ার যে বিপদে পড়লে দেবী সেই তলোয়ার দিয়ে আত্মরক্ষা করবেন। অদ্ভুত বিষয় হলো মন্দিরের ভেতর প্রবেশ করতে না করতে খালিদ দেখতে পেলেন যে এক অস্বাভাবিক কালো ও নগ্ন নারী তাঁর পথরোধ করে সামনে দাঁড়িয়ে এবং নারীটি হাহাকার করে কাঁদছিলেন। খালিদ এবং তাঁর সাথিরা তখন তাদের তলোয়ার বের করে সেই নারীটিকে আক্রমণ করলেন। কিন্ত নারীটি খুবই সাহসিকতার সাথে লড়াই করলেন এবং খালিদের নয় জন সহযোদ্ধাকে নারীটি একাই হত্যা করলেন। এবার খালিদ নারীটিকে পেছন দিক থেকে আক্রমণ করলেন এবং খালিদ ও তাঁর বাকি একুশ জন সহযোগী মিলে নারীটিকে সহজেই দুই টুকরো করে ফেললেন। এবার খালিদ উজ্জার বিগ্রহ ভেঙ্গে মক্কায় ফিরলেন এবং ইসলামের নবীকে গোটা ঘটনা খুলে বললে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, এই নারীই ছিলেন আল-উজ্জা এবং আর কখনোই তিনি তোমার ভূমিতে আর পূজিতা হবেন না।’

এই গোটা ঘটনাটিই পরবর্তী যুগের আরব পন্ডিত হিশাম ইবন আল-কালবির (৭৩৭-৮১৯) রচনায় ‘দ্য বুক অফ আইডলস’ গ্রন্থে বিধৃত হয়েছে। আবার ইতিহাসে কোথাও কোথাও বলা হয় ঐ নগ্ন নারীটি ছিলেন এক ইথিওপীয় কালো নারী। মনে হয় নারীটির পক্ষে এক ইথিওপীয় কালো নারী হওয়াই স্বাভাবিক। একটি বিষয় এই গোটা ঘটনায় কৌতূহলোদ্দীপক। ‘মূর্তি পূজা’র অসাড়তা যিনি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তিনিও কি কোনো ভুল অবচেতন থেকে বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন যে পাথরের দেবী উজ্জার প্রাণ আছে যিনি নগ্ন নারীদেহ ধারণ করে ইসলামের সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করবেন? এমনকি যদি অপ-দেবতা বা দানবী হিসেবেও দেখা হয়, তবু ত’ সেই কোনো না কোনো ‘ইভিল স্পিরিটে’ হলেও বিশ্বাস। সহস্রারাব্দ আগের এই সব কিংবদন্তী আজকের দিনে সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করা কঠিন। তবে, আজকের যুগের যুক্তিবোধ থেকে যদি আমরা বিবেচনা করি তবে দেবী উজ্জার মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঐ কালো, নগ্ন নারী কোনো ইথিওপীয় নারী হওয়াই স্বাভাবিক। আরবে আজো শ্বেতকায় আরবের পাশাপাশি হাবশি বা কালো মানুষের সংখ্যাও কম নয়। ঐ ইথিওপীয় নারীটি কি ভারতের কালো/অসুর/অনার্য নারীদের প্রতীক কালীর মতোই কোন মাতৃতান্ত্রিক, দেবীপূজারী গোত্রের শেষ যোদ্ধাদের একজন যিনি মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও দেবীপূজারী ধর্মের অবসান বুঝতে পেরে হাহাকার করে কাঁদতে কাঁদতে একাই লড়ে যান? লড়তে লড়তে যার গায়ে কাপড় থাকে না? কেনো শ্বেতকায় আরব কালো দেবী উজ্জাকেও ‘শক্তিময়ী’ হিসেবে স্থান দিয়েছিলো তার পূজিতা দেবীদের তালিকায় যেমনটি ভারতে বিজয়ী আর্যরাও শ্বেতকায়া দুর্গার পাশে ঠাঁই দিয়েছিলো কালীকে? শ্বেতকায়া, সিংহবাহিনী দুর্গার আর এক রূপ যেমন বলা হচ্ছে কালীকে, তেমনি আরবেও শ্বেতকায়া, সিংহবাহিনী আল-লাতের আর এক রূপ বলা হচ্ছে উজ্জাকে? না- ভাই- আমি ‘সব ব্যাদে আছে’ স্টাইলে ভারত থেকে ধর্ম আরবে পাচার হয়েছিলো জাতীয় আপ্তবাক্যে বিশ্বাসী না। হয়তো বণিকদের দীর্ঘ ক্যারাভান পথে, প্রাচীন পৃথিবীর নানা অঞ্চলের ভেতরকার আদান-প্রদানে ব্যাবিলনের দেবী আরবে বা ভারতের কোনো দেবী জাপানে বা এমনকি আরব ও ভারতের পরষ্পরকে খুব সামান্য হলেও জানাটা অস্বাভাবিক ছিলো না। তবে, মূল বিষয়টি বোধ করি ভারত হোক বা আরবে হোক- বিভিন্ন বর্ণের বা নৃ-তত্ত্বের অধিবাসীদের ভেতর একটি ব্যালান্স বা সমতার জন্যই ‘দুর্গা কালী’কে এক করা বা ‘আল-লাত’ ও ‘আল-উজ্জা’কে এক করা হয়েছিলো।

আরব পন্ডিত হিশাম ইবন আল-কালবির (৭৩৭-৮১৯) ‘দ্য বুক অফ আইডলস’ বইটি প্রাক-ইসলামী যুগের আরব ধর্ম কত ভুল ছিলো সেই আঙ্গিক থেকে লেখা হলেও প্রাক-ইসলামী আরব ধর্মের সব দেব-দেবী এবং নানা পূজা বা আচার-অনুষ্ঠানের এক জীবন্ত দলিল। আহমাদ জাকি পাশা নামে এক মিশরীয় ভাষাতত্ত্ববিদ দামাস্কাসে এক নিলামে এই পান্ডুলিপিটি ক্রয় করেন এবং ১৯৩৪ তাঁর মৃত্যুও পর পান্ডুলিপিটি রাষ্ট্রকে দান করা হয়। ‘ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ ওরিয়েন্ট্যালিস্টস’-দের ১৪ তম অধিবেশনে এই আকর গ্রন্থটির আবিষ্কার বিষয়ে পাশা সূধীজনকে অবগত করেছিলেন। হিশাম ইবন আল-কালবির বই ‘দ্য বুক অফ আইডলসে’ই বলা হয়েছে:

‘আরব বিশেষত: কুরাইশরা অনেকেই তাদের সন্তানের নাম রাখতেন আবদ্ উল উজ্জা বা উজ্জার দাস। কুরাইশদের ভেতর তিনিই ছিলেন সর্বাধিক পূজিতা দেবী। তাঁর নামে দীর্ঘ তীর্থযাত্রা, তাঁর নামে নানা দান-ধ্যান বা পশু বলির মাধ্যমে তাঁর অনুকম্পা লাভ করতে তারা (আরবেরা) ভালোবাসতো।

ইসলামের প্রচারের আগে আরবেরা কাবার চারপাশ প্রদক্ষিণ করে বলতো,

আল-লাত এবং আল-উজ্জার নামে,

এবং তাদের পাশেই তৃতীয় দেবী আল-মানাত

সত্যই তাঁরা আল-ঘারানিক, সর্বোত্তম বন্দিতা তিন নারী

যাদের আশীর্ব্বাদ চাইতেই হয়।’

তবে আরবি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের সময় অনুবাদক ফারিস ‘আল-ঘারানিক’কে বলেছেন ‘নুমিদীয় সারস’ বা ‘তিন সারস পাখি’ আর এই শেষ পংক্তিটিই সালমান রুশদির বিতর্কিত ‘স্যাটানিক ভার্সেস’-এর সূচনা। মক্কার আশপাশে এই তিন দেবীরই ছিলো স্বতন্ত্র মন্দির ও বেদী। তাইফের কাছে আল-উজ্জার মন্দিরের পাশে ছিল তিনটি বাবলা গাছ যা পবিত্র বিবেচনা করা হতো। উজ্জাকে ‘উজ্জয়ণ’-ও বলা হতো যাকে এক দক্ষিণ আরবীয় তাঁর পীড়িত কন্যার সুস্থতার জন্য এক সোনার বিগ্রহ দান করেন। অসুস্থ কন্যাটির নাম ছিলো আমাত-উজ্জয়ন (উজ্জয়নের কুমারী)। আরব কবিতার অন্ত্য-পৌত্তলিক যুগে আল-উজ্জাকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুসান ক্রোনের মতে, মধ্য বা কেন্দ্রীয় আরবে আল-উজ্জা এবং আল-লাতকে প্রায়ই মিলিয়ে ফেলা হতো যেমন আমরা দুর্গা বা কালীকে মিলিয়ে ফেলি। ‘আল-উজ্জা’ শব্দটি ‘আল-আজিজ’ বা আল্লাহ্র সুন্দরতম ৯৯ টি নামের একটি থেকে গৃহীত বলে মনে করা হয়।

হিশামের বই থেকে আরো জানা যায় যে প্রাক-ইসলামী যুগের আরবেরা তাদের ধর্মকে বলতো ‘দ্বীন-আল-আবাইকা।’ পিতৃ পুরুষের ধর্ম। সেই ধর্মে নাবাতীয় পের্ট্রা থেকে দক্ষিণে আরব, ওদিকে বাইবেলে কথিত ‘সেবা’ বা ইথিওপীয়া আর পূর্বে ইরাণ ও সিরিয়ার পালমিরা পর্যন্ত প্রাক-ইসলামী মক্কার তিন দেবী আল-লাত, আল-উজ্জা ও আল-মানাত ছিলেন পরম পূজিতা। দেবী আল-উজ্জা বা ‘শক্তিময়ী’, একইসাথে তিনি ছিলেন ভোরের তারা বা শুকতারার দেবীও বটে। আল-লাত বা ‘মাতৃকা’ যাঁর নামের সোজা-সাদা অর্থ হলো ‘দেবী’ আর মানাত বা নিয়তি তথা সময়কে বোঝানোর দেবী ‘মানাত।’

আল-উজ্জা বা ‘শক্তিময়ী’ শুকতারা এবং সন্ধ্যাতারার দেবী। পের্ট্রায় তাঁর নামে ছিলো একটি মন্দির এবং তিনি ছিলেন সেই নগরীর প্রধানা দেবী। বিস্তীর্ণ সেমিটিক ভূভাগে কেউ কেউ (যেমন, আন্টিয়োকের আইজ্যাক) তাঁকে ডাকতো ‘বেল্টিস’ বা ‘নারী’ নামে- আল-উজ্জার মতো অধিকাংশ সেমিটিক দেবীকেই ‘বেল্টিস’ ডাকা হতো। অনেকেই আল-উজ্জাকে ডাকতেন ‘কাউকবাতা’ বা ‘তারা/নক্ষত্র’ নামে। প্রাক-ইসলামী যুগে আরবের নারীরা ছাদে উঠে ভোররাত ও সন্ধ্যায় এই নক্ষত্রের দেবীকে আবাহণ করতেন। ৪র্থ শতকে সন্ত এপিফেনিয়াস আল-উজ্জাকেই আরবের স্থানীয় পর্বত দেবতা দুসারেসের মা হিসেবে আখ্যায়িত করেন যদিও আল-উজ্জাকে অনেকে ‘শামু’ বা ‘শালমুস’ নামেও ডাকতো। ‘শামু’ বা ‘শালমুস’ শব্দের অর্থ ‘তরুণী বা কুমারী।’

আল-উজ্জাকে আবার বাবলা গাছের সাথেও সম্পর্কযুক্ত মনে করা হয় বা হতো। নাখলাহয় তাঁর আশ্রমে তিনটি বাবলা গাছ ছিলো যেখানে আকাশ বা নক্ষত্রলোক থেকে দেবী অবতরণ করতেন বলে বিশ্বাস করা হতো। মূলতঃ ব্যাবিলনের দেবী ইশতার এবং আস্ত্রাতের সাথে শুকতারা ও সন্ধ্যাতারার দেবী হিসেবে আরব ভূখন্ড থেকে আল-উজ্জাকে কল্পনা করা হতো। এই দেবীরা প্রত্যেকেই ছিলেন প্রেম ও যুদ্ধের দেবী। বড়সড় আকৃতির বিড়াল তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি দেয়া হতো। বাবলা গাছের সামনে, সাথে একটি বুনো বেড়াল নিয়ে এই দেবীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেতো। গ্রিকরা তাঁকে ‘এ্যাফ্রোদিতে ইউরেনিয়া’ বা ‘স্বর্গীয় এ্যাফ্রোদিতে’র সাথে মিলিয়ে ফেলতো।

দেবী আল-লাতের নামটি মূলতঃ ‘আল-ইলাহাতে’র একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ যার অর্থ ‘দেবী।’ হিরোডেটাস এই দেবীকে ডাকতেন ‘আলিলাত’ নামে যাঁকে তিনি আফ্রোদিতি এ্যাফ্রোদিতের সাথে মিলিয়ে ফেলতেন। দেবী আল-লাতকে কখনো কখনো গ্রিক দেবী আথেনার সাথেও মিলিয়ে ফেলা হতো। তাঁকে বলা হতো ‘সব দেব-দেবীর মা’ বা ‘সর্বশ্রেষ্ঠা।’ বসন্ত ও উর্বরতার দেবী ছিলেন তিনি। তিনি স্বয়ং পৃথিবীর দেবী যিনি সর্বত্র সমৃদ্ধি বয়ে নিয়ে আসেন।

আল-উজ্জাকে আবার অনেকেই আল-লাতেরই একটি রূপ বলে মনে করতো। যেমন, হিন্দু ধর্মে কালীকে দেবী দুর্গারই একটি রূপ বলে মনে করা হয়। আরবে সূর্যকে বলা হয় ‘শামস’ এবং আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এই ‘শামস’-কে কিন্ত ‘নারী’ বা স্ত্রী-বাচক মনে করা হয় যিনি আল-লাতের সত্তার আর একটি প্রকাশ। মক্কার পূর্বে তাইফ শহরে তাঁর নামে এক আশ্রম বা মন্দির ছিলো এবং আরব থেকে ইরান অবধি তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। আল-লাতের প্রতীক ছিলো অর্দ্ধ-চন্দ্র (যা আজো ইসলামের পতাকারও প্রতীক)। হাতে তাঁর একটি গমমঞ্জরী শোভা পায়। হাতে ধরা তাঁর খানিকটা আতরের স্তুপ যেহেতু আজো নানা ধূপদানে আল-লাতের প্রতিমা খোদিত।

দেবী আল-মানাতের নাম আরবি ‘মানিয়া’ শব্দ থেকে এসেছে। ভাগ্য, ধ্বংস, প্রলয় বা মৃত্যু তাঁর নামের অর্থ। দেবী মানাত সম্ভবতঃ আল-উজ্জা এবং আল-লাতেরও অনেক আগে থেকেই পূজিতা হয়ে এসেছেন। মক্কার কাছে কুইদাইদে একটি কালো পাথর হিসেবে প্রথমে তাঁর পূজার সূচনা। আরবের ‘হজ্ব’ বা তীর্থযাত্রার সাথে তিনি সম্পর্কিত। মৃত্যু ও ধ্বংসের এই দেবী ছিলেন সব কবরের রক্ষাকর্ত্রী। যে ব্যক্তি কোনো কবরকে ধ্বংস বা অসম্মান করতো, তাকে এই দেবী অভিশাপ দেবে বলে ধরে নেয়া হতো। এক বৃদ্ধা নারী হিসেবে তাঁকে দেখানো হয় যাঁর হাতে ধরা এক পেয়ালা। এই পেয়ালা যেন মৃত্যুরই পেয়ালা।


  • ২২৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী গায়েন

লেখক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা