ভয় মুক্ত জীবন আমার মানবাধিকার

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৩০, ২০১৭ ৯:৩৯ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


১৯৯৮ সালে শাজনীন রহমান নবম শ্রেণীতে পড়তো। আমি পড়তাম ক্লাস ফোর এ। শাজনীন সারাজীবন ক্লাস নাইনেই থাকবে। সে ক্লাস নাইন পেরিয়ে ক্লাস টেন, তারপর এসএস সি তার পর কলেজ, তারপর ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পারতো। হয়তো শাজনীন এর একটা বয়ফ্রেন্ড হতো, হয়তো সে বিয়ের আগেই সেক্স করতো, নিজের আনন্দে, নিজের সম্মতিতে। কিংবা করতো না। হয়তো সে ক্লাস নাইন, টেন,কলেজ ইউনিভার্সিটিতে হিজাব ছাড়া চলে, ইউনিভার্সিটির শেষের দিকে এসেই হঠাৎ করে মাথায় হিজাব পরা শুরু করতো, কিংবা বিয়ের পর হিজাব করা শুরু করতো। হয়তো শাজনীন এর বিয়ের পর দুইটা বাচ্চা হতো। কিংবা হয়তো শাজনীন দেশের বাইরে পড়তে যেতো। হয়তো দেশের বাইরে নানান জায়গায় সে বেড়াতো।

 

শাজনীন সেইসব কিছুই জানলো না। শাজনীন তো এটাও জানলো না যে ফেসবুক নামের একটা বস্তু পৃথিবীতে এসেছে, যেখানে আমার মতো কিছু লেখক, কিছু হলেই ভ্যাড়ভ্যাড় করে লেখালিখি করে। শাজনীন তার ছবি ইন্সটাগ্রামে যে দেয়া যায় জানলো না। শাজনীন জানলো না আমরা অভ্র তে বাংলা লিখি। শাজনীন তো জানলোই না আমরা থ্রি জি পেরিয়ে ফোর জি, ফাইভ জি তে আছি, ভিডিও কল করি, সেলফি তুলি, ফেসবুকিং করি। 

এন্ড্রয়েড ফোন হাতে আছে, হাতে আছে আইফোন( এলিটদের জন্য)। শাজনীন তো এলিট ছিলো, শাজনীন হয়তো এলিটদের নানান অনুষ্ঠানে যেতো, আইফোন হাতে নিয়ে। হয়তো যেতো না। ১৯৯৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিশাল পরিবর্তন শাজনীন দেখে যেতে পারলো না। অথচ সে যেমন ছিলো, যেমনই হতো, যেমনই হতো তার মানসিকতা তার বেঁচে থাকার অধিকার ছিলো। 

বেঁচে থাকার অধিকার ছিলো, তৃষা, সীমা, সিমি, তানিয়া, ইয়াসমিন, ফাহিমার, বেঁচে থাকার অধিকার ছিলো তনুর, বেঁচে থাকার অধিকার ছিলো রূপার।  তারা বেঁচে থাকতে পারতো, কিন্তু তারা তা পারে নি।

রূপা যে কিনা দরিদ্র একটি পরিবার থেকে এসেছিলো, সেই রূপার জীবনের মূল্য, উচ্চবিত্ত পরিবারের শাজনীনের জীবনের মূল্য, আদিবাসী নারীদের জীবনে মূল্য, সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান নারীদের মূল্য, রোহিঙ্গা মুসলিম নারীর জীবনের মূল্য, ডিস্কোতে যাওয়া নারীর জীবনের মূল্য, গার্মেন্টস এ কাজ করা নারী শ্রমিকের মূল্য, ইট ভাটায় কাজ করা নারী শ্রমিকের জীবনের মূল্য, বাংলাদেশ ব্যাংক এ কাজ করা নারীর জীবনের মূল্য, পিংক স্যাম বাইক চালানো নারীর জীবনের মূল্য, আমার জীবনের মূল্য একই। আমাদের প্রত্যেকের রয়েছে নির্ভয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। আমাদের রয়েছে বিচার পাবার অধিকার। 
আর সেই অধিকার নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। 

কিন্তু আমরা সেই নিশ্চয়তা পাই না। আমরা ভয়ে থাকি। আমরা যেকোনো সময় ভয়ে ভয়ে থাকি। আমরা ভয়ে থাকি যখন আমাদের যৌনাঙ্গও ভালো মতো তৈরি হয় নি তখন। আমরা ভয়ে থাকি বাড়ির বাইরে, বাড়ির ভিতরে। আমরা ভয়ে থাকি দিনে, দুপুরে, বিকেলে, সন্ধ্যায়, রাতে। আমরা ভয়ে থাকি ঘুমে, স্বপ্নে, জাগরণে, আমরা ভয়ে থাকি বাস্তবে, আমরা ভয়ে থাকি ভার্চুয়াল এ।

আমরা ভয়ে থাকি। 
আর এইভাবেই প্রতিনিয়ত আমার, আমাদের মানবাধিকার লংঘিত হয়।

ভয় মুক্ত জীবন আমার মানবাধিকার।


  • ১২৪৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

প্রমা ইসরাত

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

ফেসবুকে আমরা